|| আহমদ ময়েজ ||
মুক্তিযোদ্ধা হলেই কি তার “সাতখুন মাফ”। তিনি কি আইনের ঊর্ধ্বে? “তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা” বলে প্রশ্নাতীত ভাবা—এমন অর্বাচীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রজন্মের মানসিক গঠনকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলে।
একজন মুক্তিযোদ্ধা কি ভুল করতে পারেন না? আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এমনকি নিকট অতীতে দেশলুটপাটে তাদের অবদান কি আমরা অস্বীকার করতে পারি? মানুষ সম্মান করে এখনো লিস্ট তৈরী করেনি, কী পরিমান দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে আছেন এমন মুক্তিযোদ্ধা নামধারী অনেক ব্যক্তি। এমনকি যুদ্ধে অপরাধমুক্তও তারা নন। কাদের সিদ্দিকীর একটি ছবি লণ্ডনভিত্তিক সংবাদ মাধ্যমে গার্ডিয়ানে ছাপা হয়েছিলো। সাংবাদিক ওয়ারিয়ানা ফালাসি যুদ্ধপরবর্তী সময়ে এ ধরণের ছবি ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন অনেক। সেসব যুদ্ধ অপরাধকে আমরা কি আমলে নিয়েছি? কাদের সিদ্দিকী কি যুদ্ধ অপরাধ করেন নাই?
যুদ্ধ অপরাধের সজ্ঞাটাই ভুলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, আমাদের রাষ্ট্রে ও আমাদের সমাজে। সেটা করেছেন মতলবাজ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। তারা ধরেই নিয়েছেন যুদ্ধ অপরাধ কেবল বিরোধী পক্ষদ্বারাই সংগঠিত হয়। মূলতঃ যুদ্ধ অপরাধ যে কোনো পক্ষ থেকেই হতে পারে। ঘোষিত যুদ্ধ চলাকালিন অবস্থায় যারা যুদ্ধের নীতি বর্জন করবে, বিশেষ করে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা বা নির্যাতন, ধর্ষণ, শিশু ও বৃদ্ধ নারী শিশু হত্যা বা নির্যান, সম্পদ ধ্বংস ইত্যাদি অপরাধকে যুদ্ধ অপরাধ হিসেবে সজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আমরা কি সেভাবে যুদ্ধ অপরাধকে সজ্ঞায়িত করেছি? আমরা কি প্রত্যক্ষ সাক্ষীপ্রমাণকে মূল্যায়ন করতে পেরেছি।
আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা এখনও জাতীয় বীর হিসেবে জাতির কাছে সম্মানীত। এখনও যেসব মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে আছেন তারা অনেকেই তাদের অর্জিত সম্মান ধরে রাখতে পারছেন না। এর একটি অংশ ধরেই নিয়েছেন তারা আইনের ঊর্ধ্বে। সমালোচনারও ঊর্ধ্বে। অথচ কোনো কিছুই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। স্বাধীনতা, দেশ, রাষ্ট্র, সংবিধান, বিচারালয়, মুক্তিযুদ্ধ, গড, ভগবান কিছুই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। আমরা ব্যক্তিকে পূজার সামগ্রী বানিয়েছি। এর অন্তর্নিহিত ভাবনাই আমাদের বারবার ফেসিবাদের দিকে ঝুকতে প্ররোচিত করেছে। এই ভাবনাই আমাদের প্রশ্ন করার হিম্মতকে ভুলুণ্ঠিত করেছে। বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের স্বাধীনতা উত্তর তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই তাদের বিতর্কিত করেছে।
উল্লেখ্য, মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। ২৪ এর একটি বৃহৎ গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের নিয়ে তিনি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তার দল বিএনপি এ বিষয়ে তাকে সতর্কমূলক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। গণঅভ্যুত্থানকে ধারণ করেই বিএনপি রাজনীতি করছে। ফজলু সাহেব কোনো সাধারণ কর্মী নন যে তিনি বিষয়টি অবগত নন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানকে কীভাবে অপমান করেন, সেই বিবেকবোধ কি তার লুপ্ত হয়েছে? মুক্তি সংগ্রামকে যদি আমরা একটি চলমান প্রক্রিয়া ভাবি, তাহলে দেশের ক্রান্তিলগ্নে যারাই অবদান রেখেছেন তাদের প্রতি অপমান বা হেয়প্রতিপন্ন করে কথা বলা গর্হিত অপরাধ। ব্যক্তি তিনি যেই হোন, তাকে ছাড় দেয়া অনৈতিক।
জনাব ফজলু সাহেব কাদের দ্বারা প্রভাবিত সে বিশ্লেষণে আমরা যাচ্ছি না। বরং হঠাৎ করে তার এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্বারা কারা উৎসাহিত হচ্ছে সেটা দেখার বিষয়। কারা তার অপরাধকে উপেক্ষা করে “মুক্তিযোদ্ধা” শব্দটিকে মলাটবন্দী করতে উৎসাহী। “বীর মুক্তিযোদ্ধা”, “সাহসী” ইত্যাদি বলে গণঅভ্যুত্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছে, সেটা আমাদের বুঝতে হবে। পতিতশক্তি এসে যদি তাকে আত্মঘাতি করে তোলে, আমরা আশ্চর্য হবো না। পতিত শক্তি জানে না, প্রতিটি গণঅভ্যুত্থানই মুক্তিযুদ্ধের প্রাণস্পন্দন। ৯১ এর গণঅভ্যুত্থানের বীর প্রতীক নূর হোসেন ও ডাক্তার মিলন, এদেরকে কেউ অপমানের ভাষায় কথা বলার সাহস দেখায়নি। এমনকি স্বৈরাচার এরশাদের দল জাতীয় রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েও তাদের ব্যাপারে কূরুচিপূর্ণ বক্তব্য আমাদের নজরে আসেনি। তাহলে এবার কেন ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে হাসিনার ভাষায় ফজলু সাহেব বক্তব্য রাখার সাহস দেখান? নিশ্চয় এর গভীরে কোনো কিন্তু রয়েছে। তিনি যদি এখনো মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেন তাহলে তার এমন আচরণে লজ্জিত হওয়ার কথা। তিনি পতিত স্বৈরাচারের ভাষায় বক্তব্য দিয়ে কাদের খুশী করতে চান সেটা সাধারণ মানুষ জেনে গেছে। তার বিরুদ্ধে তার দল ব্যবস্থা নিয়েছে। সেটা তার আমলে নেয়া জরুরী নাকি যারা তাকে ব্যবহার করতে উৎসাহিত করছে সেটাকে তিনি আমলে নেবেন, সে সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে। এ জাতীয় অর্বাচীন মন্তব্য করে হাসিনা রেহাই পাননি। ফজলু সাহেব কি পাবেন?
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হাসিনার চে’ ভালো বাণিজ্য আর কেউ করতে পারবে না। এটা মাথায় রাখতে হবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তথাকথিত বয়ানকারীদের। কারণ, নতুন প্রজন্ম প্রশ্ন করা শিখে ফেলেছে। তারা এখন কোনো কিছুকেই আর সমালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করে না। অতএব চেতনা বণিকরা সাবধান।
লেখক: বিলেতে বাংলা ভাষার প্রধান কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।