আইন অধিকার ডেস্ক: সাধারণ ছাত্রদের বাঁচাতে চাইলেন যিনি, সেই আবু সাঈদের বুকেই বন্ধুকের নল। যে অস্ত্র আবু সাঈদের টাকায় কেনা হয়েছে শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য, সেই অস্ত্রই কেড়ে নিলো আবু সাইদের প্রাণ বলে ট্রাইব্যুনালে সূচনা বক্তব্য দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সূচনা বক্তব্য শেষ হয়েছে। আলোচিত এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বুধবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৩ বিচারকের প্যানেল সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য এই দিন ধার্য করেন।
এদিন সূচনা বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, এই মামলায় নিরপেক্ষ, নির্ভুল এবং দৃঢ় বিচার নিশ্চিত করুন। দোষীদের যথাযথ শান্তি দিন, যাতে জনগণের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে আসে। কারণ আমরা এমন একটি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ন্যায়বিচার কেবল একটি রায় নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বার্তা। অপরাধী যত বড়ই হোক, বিচার থেকে কেউ রেহাই পাবে না।’
তিনি বলেন, বিচারের হাত দীর্ঘ। অনুপস্থিতি ন্যায় প্রতিষ্ঠায় বাধা নয়। এই মামলায় কিছু আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম চললেও, তা ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুতি নয়। বরং, এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে অপরাধীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইন তার নিজস্ব গতিতে কাজ করছে। আইনের যথাযথ বিধান অনুসরণ করেই এই ট্রাইব্যুনাল অনুপস্থিত আসামিদের বিরুদ্ধেও রায় দেয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে।’
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শহীদ আবু সাঈদকে হত্যা এবং তৎপরবর্তী সময় সংঘটিত অপরাধগুলোর সঙ্গে জড়িত ২৪ জন আসামি দীর্ঘদিন ধরে আদালতে উপস্থিত না থেকে পলাতক রয়েছেন। তাদের এই ইচ্ছাকৃত অনুপস্থিতি কিংবা বিদেশে আশ্রয় নেওয়ার ফলে বিচারপ্রক্রিয়া থেমে থাকলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতো।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এবং আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার স্বীকৃত নীতি অনুসারে অপরাধের দায়মুক্তির সুযোগ নেই, যতদিন না অপরাধ প্রমাণিত হয় বা নির্দোষ প্রমাণিত হন। ন্যায়বিচারের হাত দীর্ঘ এবং দৃঢ়, অনুপস্থিতি তাকে থামাতে পারে না।
এটি শুধু বিচার নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার: একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার মাধ্যমে। বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই আন্দোলন ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন দেশের তরুণ সমাজ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের ন্যায্য দাবি ও অধিকারের পক্ষে রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় তাদের প্রতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তা ছিল আইন, সংবিধান এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রেক্ষাপটে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কেবল আইনগত কর্তব্য নয়, এটি একটি নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে অঙ্গীকার করছি, এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় আসামিদের প্রাসঙ্গিক অধিকার এবং সুষ্ঠু বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেয়া হবে। প্রতিটি ধাপ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, যাতে জনগণ নিজের চোখে দেখতে পারে। এই বিচার প্রতিহিংসা নয়, এটি ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। এই ট্রাইব্যুনাল কেবল একটি অপরাধের বিচারের স্থান নয়, এটি হোক আমাদের গণতান্ত্রিক চেতনা, আইনের শাসন এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রতি জাতির সম্মিলিত প্রতিজ্ঞার প্রতীক।’
২০২৪ সালের নিপীড়নের বিচার ও প্রতিরোধের স্বীকৃতি: এই বিচার বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়, যা কেবল একটি অপরাধের বিচারে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের ন্যায়সঙ্গত প্রতিরোধের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে, যখন দেশের তরুণ সমাজ গণতন্ত্র ও অধিকারের পক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নামে, তখন রাষ্ট্র প্রতিহত করে নির্মম সহিংসতা ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে। জনপথ, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, এমনকি চিকিৎসাকেন্দ্র পর্যন্ত নিরাপদ ছিল না, সর্বত্র নিরস্ত্র আন্দোলনকারীরা আহত কিংবা প্রাণ হারান।
এই বিচার প্রক্রিয়া সেই ঘটনার দায় নিরূপণের একটি পদক্ষেপ, যেখানে অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল জনগণের হৃদয়ে বোনা আশা, স্বপ্ন ও অধিকারের বিরুদ্ধে। এটি কেবল আইনের প্রয়োগ নয়; এটি একটি জাতির বিবেকের জবাবদিহি। বিচারকার্য প্রমাণ করবে যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদ ন্যায্য ছিল। এই ট্রাইব্যুনাল তাই শুধুই একটি আইনি মঞ্চ নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক সাক্ষ্য, যে বাংলাদেশ আর কোনো অন্যায় সহ্য করবে না, বরং ন্যায়বিচারই হবে তার অগ্রগতির পথনির্দেশক।
এ সময় তাজুল ইসলাম গত বছরের ১৪ জুলাই রাত ১১টা ২৮ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মাকসুদ কামালের কথোপকথনে প্রদত্ত নির্দেশনার বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেন। তাদের কথোপকথনটি ছিলো-
শেখ হাসিনা: হ্যালো
মাকসুদ কামাল: আপা, স্লামালাইকুম।
শেখ হাসিনা: হ্যাঁ, ওয়ালাইকুমল্লাম।
মাকসুদ কামাল: প্রত্যেক হল থেকে তো ছেলে-মেয়েরা তালা ভেঙে বের হয়ে গেছে। এখন তারা রাজু ভাস্কর্যে চার পাঁচ হাজার ছেলে-মেয়ে জমা হইছে। মল চত্ত্বরে জমা হয়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তে আমার বাসাও অ্যাটাক করতে পারে।
শেখ হাসিনা: তোমার বাসা প্রটেকশনের কথা বলে দিছি।
মাকসুদ কামাল: জি জি।
শেখ হাসিনা: আগে একবার করছে…
মাকসুদ কামাল: ঐ রকম একটা প্রস্তুতি… লাঠিসোঁটা নিয়ে বের হইছে।
শেখ হাসিনা: লাঠিসোটা নিয়ে বের হলে হবে না, আমি পুলিশ এবং বিডিআর হয়ে বিজিবি আর… বলছি খুব এলার্ট থাকতে এবং তারা রাজাকার হইতে চাইছে তো, তাদের সবাই রাজাকার। কী আশ্চর্য কোনো দেশে বসবাস করি।
মাকসুদ কামাল: জি জি… বলতেছে আমরা সবাই রাজাকার।
শেখ হাসিনা: তো রাজাকারের তো ফাঁসি দিছি, এবার তোদেরও তাই করবো। একটাও ছাড়বো না, আমি বলে দিছি। এই এতোদিন ধরে আমরা কিন্তু বলিনি, ধৈর্য ধরছি, তারা আবার বাড়ছে।
মাকসুদ কামাল: বেশি বেড়ে গেছে এবং অতিরিক্ত বেড়ে গেছে, অতিরিক্ত……. তো আপা একটু ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাটা আরেকটু বাড়ানো.. আর আমার বাসার ওইখানেও….
শেখ হাসিনা: ক্যাম্পাসের… ব্যবস্থা করছি, সমস্ত ক্যাম্পাসে…বিজিবি, র্যাব এবং পুলিশ, সব রকম ব্যবস্থা হইছে। তোমার বাসার ভেতরে লোক রাখতে বলছি। ভেতরে কিছু রাখা আছে… এতো বাড়াবাড়ি ভালো না।
মাকসুদ কামাল: অসম্ভব এবং বিজয় একাত্তর হলে ছাত্রলীগের ছেলেদেরকে মেরেছে। আরো দুই একটা হলে একই কাজ করেছে। ছাত্রলীগের ছেলে পেলে সাদ্দাম, ইনান, শয়ন ওরা আমার বাসায় ছিলো সন্ধ্যা থেকে। আমি খবর পাচ্ছিলাম, ওদেরকে আমি ডেকে নিয়ে আসছি, ওরাও আসছে। ওদের সাথে বসে ওদের হলে হলে যেন ছাত্রলীগকে সংঘবদ্ধ রাখে এবং ঢাকা উত্তর, দক্ষিণকে যেন খবর দেয়। এগুলা করতে করতেই হাজার হাজার ছেলেমেয়ে একত্র হয়ে গেছে।
শেখ হাসিনা: কোন দেশে বাস করি আমরা। এদেরকে বাড়তে বাড়তে তো… রাজাকারদের কী অবস্থা হয়েছে দেখিস নাই, সবগুলাকে ফাঁসি দিছি, এবার তোদেরও ছাড়বে না।
মাকসুদ কামাল: হ্যাঁ, এবার এই ঝামেলাটা যাক, এরপরে আমিও নিজে ধরে ধরে যারা এই অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, মেইন যারা আছে এদেরকে বহিষ্কার করবো ইউনিভার্সিটি থেকে।
শেখ হাসিনা: সব এইগুলাকে বাইর করে দিতে হবে… আমি বলে দিচ্ছি আজকে সহ্য করার পরে এরেস্ট করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেয়ার নেবে…
কারণ ইংল্যান্ডে এরকম ছাত্ররাজনীতির জন্য মাঠে নামলো, কতগুলি মেরে ফেলায় দিলো না?
মাকসুদ কামাল: জি জিজি।
শেখ হাসিনা: ঐ অ্যাকশন না নেয়া ছাড়া উপায় নাই। আমরা এতো বেশি সহনশীলতা দেখাই… আজ এতো দূর পর্যন্ত আসছে।
মাকসুদ কামাল: এটা তো…. আমরাও তো সহনশীলতা… আমি ছাত্রলীগকে বলছি যে তোমরা কোনো ধরনের ইয়ে করতে যাইও না। যেহেতু আদালতের বিষয়, আদালত নিষ্পত্তি করবে।
শেখ হাসিনা: না এ আদালত হবে না, আবার ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিছে।
মাকসুদ কামাল: আবার রাষ্ট্রপতিকে কেউ এইরকম বলে যে, ২৪ ঘণ্টার রাষ্ট্রপতিকে কেউ আল্টিমেটাম দেয় একটা দেশে।
শেখ হাসিনা: …. রাষ্ট্রপতিকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিচ্ছে… বেয়াদবির একটা সীমা থাকে…!
মাকসুদ কামাল: আপা, আমি আপনাকে যদি অন্য কোনো খারাপের দিকে যায়, আমি আবার একটু জানাবো। কিন্তু রাতের বেলা জানাবো না, হয়তোবা আধা ঘণ্টা এক ঘণ্টার মধ্যে হলে জানাবো।
শেখ হাসিনা: কোনো অসুবিধা নাই… আমি আমি সবসময়ই ফ্রি।
মাকসুদ কামাল: জি জি জি স্লামুআলাইকুম।
শেখ হাসিনা:…..
পরদিন ১৫ জুলাই যখন সাধারণ ছাত্ররা একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছিলেন, তখন সাধারণ ছাত্রদের প্রতিরোধ করার জন্য ছাত্রলীগ পাল্টা কর্মসূচি পালন করে। আন্দোলন বন্ধ করার জন্য, পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ, মহানগর ছাত্রলীগ এবং অস্ত্রধারী বহিরাগতরাসহ অনেক সন্ত্রাসী সাধারণ ছাত্র এবং ছাত্রদের মেসে আক্রমণ করে। অপরদিকে, আন্দোলন দমন করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা করেন যে, “আন্দোলনকারীদের দমন করার জন্য, আমাদের ছাত্রলীগই যথেষ্ট” বলে মন্তব্য করেন।