শিরোনাম
বৃহঃ. জানু ২২, ২০২৬

অর্থবিলে কালোটাকা সাদার সুযোগ দুর্নীতিসহায়ক ও সংবিধান পরিপন্থী: টিআইবির ক্ষোভ

অপ্রদর্শিত অর্থের মোড়কে কালোটাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ বহাল করে অর্থবিল ২০২১ পাশে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলছে, বাজেট প্রস্তাবনায় না থাকার পরও অর্থবিলে এই সুযোগ বহাল করা দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতার নামান্তর। এটি যেকোনো বিচারে নৈতিকতাবিরোধী, দুর্নীতিসহায়ক, বৈষম্যমূলক ও সংবিধান পরিপন্থী।

বাজেট ঘোষণায় কোনো ধরনের উল্লেখ না থাকার পরও কীভাবে তা পুনরায় অর্থবিলে যুক্ত হলো? সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বুধবার এক বিবৃতি দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকারের এই পদক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতার’ অঙ্গীকারকে পদদলিত করছে।

বিবৃতিতে ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, নগদ টাকা থেকে শুরু করে সঞ্চয়পত্র, ব্যাংকে রাখা টাকা, প্লট ও ফ্ল্যাট কিংবা নতুন বিনিয়োগের জন্য দেয়া সুযোগটিতে তথাকথিত বাড়তি কর ও নামমাত্র জরিমানা দেয়ার বিধান করা হলেও, চূড়ান্ত বিচারে এটি দুর্নীতিবাজ এবং এর পৃষ্ঠপোষকদেরকে মাল্যদানসম উপহার হিসেবে বিবেচনা করছে টিআইবি। কেননা বিনা প্রশ্নে দেয়া এ সুযোগ কালোটাকার মালিকদের আরো অবৈধ অর্থ উপার্জনের আইনগত গ্যারান্টি হয়ে উঠতে যাচ্ছে, যেটি যেকোনো বিচারে নৈতিকতাবিরোধী, দুর্নীতিসহায়ক, বৈষম্যমূলক ও সংবিধান পরিপন্থী।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখা নিয়ে সরকার এবার রীতিমতো অশুভ চালাকির আশ্রয় নিয়েছে। কেননা ন্যায্যতা ও ন্যায়নিষ্ঠতার নামে অর্থমন্ত্রী যে বিষয়টি প্রথমে বিবেচনা করেননি, তা কোন নৈতিকতার বিচারে চূড়ান্তভাবে রেখে দিলেন, সে ব্যাখ্যা তিনি অর্থবিল পাসের সময়ও দেননি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এক্ষেত্রে বিতর্ক ও সমালোচনা এড়াতেই সুযোগটি প্রাথমিকভাবে বাজেটে কোথাও রাখা হয়নি। যদিও এ বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় শুরু থেকেই ছিল।

তিনি বলেন, এটি শুধু বাজেট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেনি বরং সরকারের মাঝে জবাবদিহির সংস্কৃতি ক্রমেই বিলুপ্ত হওয়ার ইঙ্গিতও বহন করে। সরকারের এই পদক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতার’ অঙ্গীকারকে পদদলিত করছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, পাশ হওয়া অর্থবিলে তালিকাভুক্ত শেয়ার, বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটসহ পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ, নগদ টাকা, ব্যাংক ডিপোজিটের মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করতে ২৫ শতাংশ হারে কর এবং মোট করের ওপর ৫ শতাংশ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এই হার ছিল ১০ শতাংশ। এছাড়া, অঞ্চলভেদে জায়গা অনুপাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর ও জরিমানা দিয়ে জমি, ভবন, এপার্টমেন্ট কিনেও কালোটাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে। তিনি বলেন, কর ও জরিমানা ধার্য করে সরকার যে বার্তাই দিতে চাক না কেনো, এর ফলে যে অনৈতিকতা ও দুর্বৃত্তায়নের সুযোগ বর্ধিতমাত্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করলো তার বিনিময় মূল্য কোনোভাবেই তুলনীয় হতে পারে না। এতে সাময়িকভাবে কিঞ্চিৎ বেশি কর পাবার সুযোগ তৈরি হলেও, এর বিপরীতে দুর্নীতিগ্রস্ত স্বার্থান্বেষী শক্তির কাছে সরকারের যে নৈতিক পরাজয় ঘটলো, তা সত্যিই শঙ্কিত হবার মতো। সরকারের এই অবস্থান বৈষম্যমূলক, দুর্নীতিসহায়ক ও সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যা কখনো কাম্য হতে পারে না।

নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখা প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে এমন সুযোগ আগে থেকে রাখা হলেও এর মাধ্যমে কত অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে কিংবা আদৌ হয়েছে কী-না তার কোনো হিসাব সরকার কখনো প্রকাশ করেনি। সরকার একদিকে কালোটাকার মালিকদের নতুন করে কালোটাকা তৈরির আইনি গ্যারান্টি দিচ্ছে আর অন্যদিকে সৎ নাগরিকদের প্রলোভিত করছে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হতে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি বললেও অত্যুক্তি হবে না যে দেশে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ উচ্চতর মাত্রা পেতে যাচ্ছে, যা সত্যিই চরম হতাশার। তারপরও টিআইবি আশা করে, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শুদ্ধাচার নিশ্চিতে সরকার সদিচ্ছা দেখিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *