।। মিনার রশীদ।।
এক স্বামীকে বেঁধে রেখে তাঁর স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে কয়েকজন সোনার ছেলে। অতি শোকে দেশবাসী অনেক আগেই পাথর হয়ে পড়েছে। আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগের চেয়েও ভয়ংকর এক জাহেলিয়াতে ছেয়ে গেছে দেশটি – যার নাম আওয়ামী জাহেলিয়াত। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই সোনার ছেলেরা ভাদ্র মাসের এক বিশেষ জন্তুর মত যেন হয়ে পড়ে। এই মানিকরা ধর্ষণে শুধু সেঞ্চুরিই করে না! সেই সেঞ্চুরি আবার বন্ধু বান্ধব নিয়ে সেলিব্রেইটও করে! কতটুকু বেপরোয়া হলে এই সব কাজ করতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। এই সব মানিকেরা জানে তাদের মূল প্রশ্রয়টি কোন জায়গা থেকে আসে।
সব জাহেলিয়াতের মত এই জাহেলিয়াতের অবসানও আসন্ন বলেই মনে হচ্ছে। আওয়ামী লীগ নিজের ছায়াকেও ভয় পেতে শুরু করেছে। শেখ হাসিনা বলেছেন, “সামরিক অভিধান থেকে ‘মার্শাল ল’ শব্দটি বাদ দেওয়া উচিত।” আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি অবৈধ পন্থায় ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করছে। যদি সেরকম কিছু ঘটেই যায় তবে বিএনপিকে দোষারোপের একটি রাস্তা তৈরি করে রাখা হচ্ছে।
এক মাতাল মদ খেয়ে প্রমাদ বকতেন, ‘আরে ব্যাটা আমি খাই বাংলা মদ আর তোরা খাস বিদেশী মদ। কিন্তু নেশা কি আমার তোদের থেকে কোনো অংশে কম হয় নাকি?’ অতি সঙ্গত কারণেই মাতালরা মদের অকল্যাণকর দিকটি টের পায় না। নিজেদের জগতে নিজ নিজ শ্রেণী ও ব্র্যান্ডের গুণগান চালিয়ে যায়। এই মাতালের মতই আওয়ামী জাহেলরা নিজেদেরকে মার্শাল ল এর চেয়ে শ্রেয় ও গণতান্ত্রিক ভাবে। দেশের প্রত্যেকটি সেক্টর ধ্বসে পড়লেও দেশটিকে সিঙ্গাপুর বা সুইজারল্যান্ডের মতই দেখতে পায়।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে অ্যালকোহল জীবন রক্ষাকারী হয়। ঠিক তেমনি কোনো কোনো পরিস্থিতিতে মার্শাল ল জাতির জন্যে জীবনরক্ষাকারী অ্যালকোহল হিসাবে কাজ করতে পারে। আওয়ামী মাতাল বা জাহেলদের ভয়টি সম্ভবত এখানেই।
মদ আর ক্ষমতা – দুটোই বোধহয় মানুষের মনোজগতে একই ভাবে কাজ করে। উপরে পাগলের এই ডায়লগটি শুনেও যারা আওয়ামী জাহেলিয়াত এবং সামরিক শাসনের পার্থক্যটি ধরতে পারেন না – তাদের জন্যে নিচের গল্পটি আরেকটু ভাবনার খোরাক জোগাতে পারে।
ইরানী একটি জাহাজ থাইল্যান্ডের একটি পোর্টে ভিড়েছে। জাতীয় পতাকাবাহী জাহাজ পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় থাকুক না কেন – জাহাজের ভেতরে সেই দেশের রাষ্ট্রীয় আইন বলবৎ থাকে। কাজেই ইরানী জাহাজে বাইরের কোনো মহিলা গেস্ট এলাউ করা হয় না। কিন্তু প্রেম কাতর এক ইরানী কাউয়া রাষ্ট্রীয় আইন ও জাহাজের ক্যাপ্টেনের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক মহিলা অতিথিকে রুমের মধ্যে নিয়ে আসে। অনুমিত হয় ট্রানজিট (ভালোবাসা) দিলেই বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর বনে যাবে, এই কিছিমের কিছু আশ্বাস দিয়েই খোমেনির রাজত্বে সেই বিশেষ অতিথিকে প্রলুব্ধ করা হয়। কিন্তু ট্রানজিট (ভালোবাসা) পাওয়ার পর সেই কাউয়ার চেহারা অর্থ উপদেষ্টা মশিউরের মত হয়ে পড়ে। ইরানী মশিউরের যুক্তি, ভালোবাসার জন্যেই ভালোবাসা বিনিময় হয়েছে। এখন প্রেমাস্পদের (প্রতিবেশীর) কাছ থেকে ট্রানজিটের ফি আদায় করা নেহায়েত অভদ্রতা, ছোটলোকি কাজ। নাছোড়বান্দা মেয়েটির দাবি, পাওনা না নিয়ে সে জাহাজ থেকে নামবে না।
এরকম দরকষাকষিতে জাহাজের সেইলিং এগিয়ে আসে। বন্দর থেকে জাহাজের রশি ছেড়ে দিয়েছে। মেয়েটিও টের পেল আর হুমকিতে কাজ হবে না। সে দৌড়ে গেল জাহাজের কাপ্তানের কাছে। জাহাজকে পোর্টে ভিড়ানো এবং পোর্ট থেকে নিরাপদে বের করার জন্যে যে পাইলট সহায়তা করে সেই পাইলটও নেমে গেছে। এখন গভীর সমুদ্রে যাওয়ার মুহূর্ত। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে মেয়েটি জাহাজের ব্রিজে ঢুকে। এমতাবস্থায় নাবিক ব্যতীত জাহাজে অন্য কাউকে দেখলে যে কোনো কাপ্তানের অবস্থা ভূত দেখার চেয়েও বেশি হয়। একে তো আন্তর্জাতিক আইনের জটিলতা, দ্বিতীয়ত মেয়ে মানুষ, তৃতীয়ত ইরানের রাষ্ট্রীয় আইনের স্পর্শকাতরতা। এই তিনটি ভাবনা ক্যাপ্টেনকে এক যোগে কাতর করে ফেলে।
চিৎকার করে কাপ্তান জানতে চায়, তুমি জাহাজের ভেতরে ঢুকলে কীভাবে? প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় মেয়েটির নেই। সে সরাসরি জানায়, ক্যাপ্টেন, তোমার ক্রু আমার পাওনা দিচ্ছে না! একথা শুনে কাপ্তানের মাথার চুলের ভেতরে মনে হয় রক্ত ঢুকে গেছে। দিক্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে, কোম্পানি আমাকে তোমার ক্যাশিয়ার বানায় নাই। তুমি জাহান্নামে যাও।
একথা শোনে মেয়েটি কেঁদে ফেলে। কাঁদতে কাঁদতেই বলে, লুক ক্যাপ্টেন! তোমার মা বোনকে কেউ যদি এমন ভাবে ব্যবহার করে টাকা না দিতো তাহলে কী তোমার খারাপ লাগতো না? বলো ক্যাপ্টেন, তোমার কি খারাপ লাগতো না?
এমন একটি উদ্ভট এবং উৎকট তুলনা শুনে ইরানী সেই ক্যাপ্টেনের অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল! এখানে দুটি সংস্কৃতি নিজ নিজ বৈধতা-অবৈধতা, নৈতিকতা-অনৈতিকতার প্রশ্নে মুখামুখি দাড়িয়ে পড়েছে! নৈতিকতার ইউনিভার্সাল স্ট্যান্ডার্ড মুখ থুবড়ে পড়েছে।
এভাবেই উৎকট আওয়ামী নৈতিকতা সমাজে প্রচলিত নৈতিক মানের সাথে টক্কর খাচ্ছে! সামরিক শাসনের চেয়েও শতগুণ ভয়াবহ শাসনকে শুধু গণতান্ত্রিক নাম দিলেই কি তা জায়েজ হয়ে যাবে? এই থাইবালা নৈতিকতার মূল জায়গাটিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভালোবাসার ব্যবসা শুরু করেছে। জাহাজের কাপ্তানের নির্দেশ অমান্য করে গোপনে জাহাজের কেবিনে প্রবেশ করেছে। নিজের এতবড় অপরাধকে অগ্রাহ্য করে এখন নাগরের প্রতারণা তার কাছে বড় হয়ে ঠেকছে। তেমনি বাকশাল পুরো সংবিধানকে চাপা দিয়ে এবং পুরো জাতির সাথে প্রতারণা করে ক্ষমতায় বসে আছে। অবিশ্বস্ত ইরানী নাগরের প্রতি থাইবালার নৈতিকতার সবক এবং সেনাবাহিনীর প্রতি আওয়ামী সরকারের সবক একই স্বাদ ও গন্ধের বলে মনে হয়। ইরানী নাগর যেমন জানে থাইবালার দুর্বলতা, তেমনি সামরিক বাহিনীও জানে এই সরকারের দুর্বলতা। কাজেই শেষ রক্ষা কতটুকু হয় তাই দেখার বিষয়।
এদিকে এক-এগারোর পুরনো মাতালের নতুন লেফট-রাইট দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম লিখেছেন, ‘মার্শাল ল’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য জনসাধারণের দৃঢ় বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।’ এই মাহফুজ আনামরা সাংবাদিকতাকে চাটুকারিতার কোন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন এই আর্টিকেলটি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। দুদিন আগে তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়েও বিরূপ মন্তব্য করেছেন। অর্থাৎ মাহফুজ আনাম শেখ হাসিনার কৃপা লাভের আশায় ইনু ও মতিয়া চৌধুরীর পথ ধরেছেন। জাসদ নেতা ইনু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে ট্যাংকে চড়ে নাচানাচি করেছিলেন। মতিয়া চৌধুরী শেখ মুজিবের গায়ের চামড়া খুলে ডুগডুগি বাজাতে চেয়েছিলেন। এই দুজন পরবর্তীতে যেকোনো আওয়ামী লীগারের চেয়েও বেশি আওয়ামী লীগার হয়ে পড়েন। তারা খেয়াল করেছেন শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে বিষোদগার করলে আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে গণ্য বড় বড় কবিরা গুনাহও মাফ হয়ে যায়।
মতিয়া চৌধুরী ও হাসানুল হক ইনুর তাগিদ বা পাপ প্রকাশ্য হলেও মাহফুজ আনামের পাপটি অবশ্য মালুম করা যাচ্ছে না। তিনি কেন হঠাৎ করে খালেদা বিদ্বেষী ও হাসিনা ভক্ত হয়ে পড়লেন? এটা কি আগাম কোনো পাপকে ঢাকতেই এই মহড়া শুরু হয়েছে? ১৫ই আগস্টের আগের দিন নাকি খন্দকার মোশতাক শেখ মুজিবকে কবুতরের মাংস রান্না করে খাইয়েছিলেন।
কারণ ১/১১ এর মইন ইউ আহমেদের জরুরি সরকারের মূল পরামর্শদাতা হিসাবে ক্রেডিট দাবি করেছিলেন এই মাহফুজ আনাম এবং প্রথম আলোর মতিউর রহমান। সেই মাহফুজ আনাম এখন শেখ হাসিনার সামরিক শাসনের বিরোধী কথায় জনগণের দৃঢ় বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন! ব্যাপারটি সত্যি ভেবে দেখার মত!
আওয়ামী লীগ এখন মার্শাল ল বিরোধী হয়ে পড়লেও এই ভূ-খণ্ডে প্রত্যেকটি সামরিক শাসনে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা ডকুমেন্টেড হয়ে আছে।
এই ভূ-খণ্ডের প্রথম সামরিক শাসন আসে পাকিস্তানি আমলে আওয়ামী লীগের গুণ্ডামির পরিণতিতে, স্পিকার শাহেদ আলীকে চেয়ার দিয়ে হত্যা করার পর। বাংলাদেশ জন্মের পর প্রথম সামরিক শাসন আসে বাকশাল নামক খাদে জাতিকে ফেলে দেয়ার পর। মজার ব্যাপার হলো, সেই সামরিক শাসন জারি করেছিল আওয়ামী লীগ নেতা মোশতাক আহমেদ। জেনারেল নাসিমের ব্যর্থ ক্যু এর পেছনেও ছিল এই আওয়ামী লীগ। মঈন-ফখরুদ্দীনদের সামরিক শাসনকে তো শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন তাদের আন্দোলনের ফসল।
বিচারপতি সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে বন্ধুকের নলের মুখে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। বাজিকর এরশাদ সাইকেল চালিয়ে অফিস করে জাতিকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। যিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদের ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন সেই এরশাদই এদেশে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। এরশাদের ক্ষমতা দখলের খবর শুনে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আই এম নট আন-হ্যাপি। আওয়ামী লীগের মুখপত্র বাংলার বাণী এরশাদের মার্শাল ল কে অভিনন্দন জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
এরশাদের আগমনে শেখ হাসিনা শুধুই ‘নট -আন-হ্যাপি’ থাকেন নাই, এরশাদকে বৈধতা দিতে এবং স্বৈরাচারকে দীর্ঘ সময় টিকিয়ে রাখতেও বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৮৬ সালে তিনি ঘোষণা দিলেন, এরশাদের অধীনে যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে সে জাতীয় বেঈমান হিসাবে পরিগণিত হবে। দুদিন পর আবার নিজেই এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেন। নিজের দেয়া পদবী “জাতীয় বেঈমান” নিজেই হয়ে থাকলেন। শেষ সময়ে অবশ্য দু’জনা ভাই-বোন সম্পর্ক পাতিয়েছিলেন। এই বোন সম্পর্কে ভাই বলে গেছেন, ও আমার চেয়েও বড় স্বৈরাচার। গুণধর ভাইয়ের আরেকটি উপাধি ছিল ‘বিশ্ব-বেহায়া’।
স্বভাব চরিত্রেও এই ভাই বোনের প্রচণ্ড মিল রয়েছে। এরশাদ প্রায় শুক্রবারে রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদে গিয়ে হাজির হতেন এবং জানাতেন গতরাতে স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে তিনি এখানে এসেছেন। অথচ তার ইন্টেলিজেন্স বাহিনী কয়েক সপ্তাহ আগেই সেই মসজিদে গিয়ে নিরাপত্তা চেক করে আসত। এরশাদের সেই বোন এখন ঘুম থেকে জেগেই জায়নামাজ খুঁজেন। সংসদে জায়নামাজের কথা জানালেও কিছুদিন আগে এক শিল্পীর জন্মদিনে ভিন্ন কথা জানিয়েছিলেন। যারা অহরহ মিথ্যে বলেন তারাই এই ধরণের সংকটে পড়েন। কারণ কখন কোন কথা বলেন সেটার খেয়াল রাখতে পারেন না।
বাংলাদেশে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলা যাবে না। কিন্তু জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা বললেও অসুবিধা নেই। নিজ দলের এক জরিনা সুন্দরীকে দিয়ে এদেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার চরিত্র হননের নিমিত্তে এক নাটক বানানো হয়েছে। মাকাল ফল এই জরিনা সুন্দরীরা এখন জাতিকে ইতিহাসের সবক দিচ্ছে। জিয়া এই জাতির রক্তের কোন জায়গায় মিশে আছে, তা বোঝার মত মনন ও মগজ এই জরিনা সুন্দরীদের নেই।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

