জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব অন্তর্ভুক্তিকরণের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। গোপনীয়তা বজায় রেখে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা খসড়া তালিকা প্রস্তুত করছেন। অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে মহিলা দল ও ছাত্রদল করা সাবেক নারী নেত্রী এবং বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন এমন জনপ্রতিনিধিদের। আগামী সপ্তাহে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে খসড়া তালিকা পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। এরপর স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান খসড়া তালিকার চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন। গত শনিবার স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল বৈঠকে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিতের সিদ্ধান্ত হয়।
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, আরপিও অনুযায়ী ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোতে সর্বোচ্চ নারী নেতৃত্বের হার ছিল শতকরা ১০ ভাগ। আরপিওতে ১২ বছরে অর্থাৎ ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু ১২ বছর পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। এই অবস্থায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০ অনুচ্ছেদটি তুলে দিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক দলের জন্য নিবন্ধন আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। আইনের খসড়া ইতোমধ্যে ইসির ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি নেতারা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রাখার যে বিধান তা বলবৎ থাকা উচিত। এক্ষেত্রে ইসির ২০২০ সাল পর্যন্ত যে সময়সীমা দেওয়া আছে তা বাড়িয়ে যৌক্তিক সময় দিতে পারে কমিশন। বিধানটি চূড়ান্তভাবে শিথিল করা হলে রাজনীতিতে নারীরা পিছিয়ে পড়বে এবং আগ্রহও হারিয়ে ফেলবে। যেখানে নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে দলে তাদের ক্ষমতায়ন শিথিল করা যুক্তিসঙ্গত হবে না। তা ছাড়া বিধান শিথিল হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও খারাপ বার্তা যাবে।
নেতারা বলেন, সমাজের বড় অংশ এখন নারী, সেখানে তাদের বাদ দিয়ে রাজনীতি করা মানে বড় জনগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়া। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান আমাদের সময়কে বলেন, স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা আমাদের জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।
যদিও স্থায়ী কমিটির নেতাদের সূত্রে জানা যায়, প্রথমে এই দায়িত্ব বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানকে দেওয়া হয়েছিল। তারা এ দায়িত্ব তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তবে স্থায়ী কমিটির নেতারা এ কাজে তারেক রহমানকে সব ধরনের সহযোগিতা করবেন। সে অনুযায়ী কাজ চলছে। তারাও তাদের মতো করে ছাত্রদল, মহিলা দল করা যোগ্যতাসম্পন্ন সাবেক নেত্রীদের তালিকা করছেন। সব তালিকা একত্রে করে একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হবে।
দলের স্থায়ী কমিটি একাধিক নেতা ও নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তের পর নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বিগত সময়ে সারাদেশের দলীয় মনোনয়নে অথবা সমর্থনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়া জনপ্রতিনিধিদের নাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা ও মহানগর বিএনপি নেতাদের এ তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছে।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহে প্রিন্স আমাদের সময়কে বলেন, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু এ সংক্রান্ত একটি তালিকা চেয়েছেন। তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, দলের নির্দেশনা অনুযায়ী এ কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি।
স্থায়ী কমিটির একজন নেতা বলেন, খসড়া তালিকা প্রস্তুত করা গেলে শনিবার (আগামীকাল) স্থায়ী কমিটির বৈঠক হতে পারে। ওই বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হবে।
দলের নির্বাহী কমিটির একাধিক নেত্রী বলেন, তাদের সঙ্গে স্থায়ী কমিটির নেতা বেগম সেলিমা রহমানের কথা হয়েছে। তার মাধ্যমে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের কাছে বার্তা দেওয়া হয়েছে, যেন ‘পাপিয়া মার্কা’ কোনো নেত্রী এই তালিকায় না থাকে। এ ছাড়া যারা বিগত সময়ে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, ছাত্রদল ও মহিলা দলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন কিন্তু নানা কারণে কোনো কমিটিতে নেই অথবা যাদের পদোন্নতি হওয়া উচিত তাদেরই কেবল এই তালিকায় রাখা হয়।
বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানা বলেন, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন। দলের নীতিনির্ধারকদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফোরামে আমরা বলেছি, তারা যেন যোগ্যতার ভিত্তিতে নারী নেতৃত্ব মূল্যায়ন করেন। দীর্ঘদিন পর হলেও সে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাজটি সঠিকভাবে করা গেলে দেশের রাজনীতিতে যেমন সুফল আসবে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিএনপির ভাবমূর্র্তি উজ্জ্বল হবে। আমাদের দাবি হচ্ছে, যাদের চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হবে তারা যেন যোগ্যতাসম্পন্ন হয়। আবার যাদের যোগ্যতা আছে তাদের যেন পদোন্নতি দেওয়া হয়। এসব নিয়ে আজ (গতকাল) স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানের সঙ্গে কথা হয়েছে।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, প্রথমত এমন একটি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও স্থায়ী কমিটির নেতাদের ধন্যবাদ জানাই। এরপর বলব, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এই কমিটিতে কাউকে অন্তর্ভুক্তির আগে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে তার ভূমিকা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক অবস্থান ও চারিত্রিক বিষয়টিও ভালোভাবে খোঁজ নিয়ে দেখা উচিত। আওয়ামী লীগের মহিলা যুবলীগের শামিমা নূর পাপিয়া মার্কা নেত্রী দিয়ে দল ও সমাজে কোনো সুফল আসবে না বরং কুফলই ভোগ করতে হবে।

