শিরোনাম
শুক্র. জানু ২, ২০২৬

আগুন যোদ্ধাদের এতগুলো লাশের দায়ভার কার?

‘প্রায় ২৫ বছর ধরে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কাজ করছি। আগুন নেভাতে ও উদ্ধারকাজে জীবন বাজি রেখে লড়েন আমাদের কর্মীরা। এরমধ্যে অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। তবে দু’যুগের পেশাগত জীবনে একসঙ্গে এতো সহকর্মীকে হারানোর ঘটনা ঘটেনি। এই ক্ষতি অপূরণীয়।’ সীতাকুন্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের পরদিন রোববার দুপুরে ঘটনাস্থলে এসে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে এই কথা বলেন।

বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। ১৯৪১ প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার কর্মীরা অগ্নিনির্বাপণ, অগ্নিপ্রতিরোধ, উদ্ধার, আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান, মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতালে নেয়ার কাজ করেন। এই কাজে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন তারা। তবে শনিবার সীতাকুণ্ড বিএম কনটেইনার ডিপোর মতো পরিস্থিতির শিকার হতে হবে, এই কথা চিন্তাও করেনি তারা। আগুন নেভাতে গিয়ে একসঙ্গেই ৯ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আর এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৩ জন।

তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও নেই তেমন। এই ঘটনায় মোট ১৫ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী আহত হয়েছেন। এরমধ্যে ১২ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ও ২ জন ঢাকায় চিকিৎসাধীন আছেন। আর একজন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন।

এই ঘটনায় যে আগুন যোদ্ধাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তারা হলেন- কুমিরা ফায়ার স্টেশনের লিডার লিডার মিঠু দেওয়ান, ইমরান হোসেন, নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট মনিরুজ্জামান, ফায়ার ফাইটার রানা মিয়া, আলাউদ্দিন, ফাইটার শাকিল তরফদার, সীতাকুণ্ড ফায়ার স্টেশনের লিডার নিপন চাকমা, ফায়ার ফাইটার রমজানুল ইসলাম, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আর এপর্যন্ত নিখোঁজ আছেন ফায়ার ফাইটার ফরিদুজ্জামান, শফিউল ইসলাম ও রবিউল হোসাইন।

বুধবার বিকেলে সরজমিনে যাওয়া হয় কুমিরা ফায়ার স্টেশনে। সেখানে গিয়ে একজন আয়া ছাড়া পাওয়া যায়নি কাউকেই। চারদিকে সুনসান নীরবতা। আগুনে এই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই ইউনিটে মোট কর্মী ছিলো ১৫ জন। আগুন লাগার খবরে ইউনিটের সব সদস্যরাই ছুটে গিয়েছিল সেখানে। গিয়ে সবাই বিস্ফোরণের মুখে পড়েন। এরমধ্যে ৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ৮ জন মারাত্মক দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আর একজন নিখোঁজ আছেন।

এদিকে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার জন্য ডিপো কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও তথ্য গোপনকে দায়ী করছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ডিপো কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই তাদের এতোগুলো কর্মী হতাহত হয়েছেন। আগুন নেভানোর কাজ শুরু করার পরও ডিপো কর্তৃপক্ষ জানায়নি যে কনটেইনারে রাসায়নিক আছে। ফলে বিস্ফোরণের সময় ডিপোর ভেতরে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা আর অক্ষত অবস্থায় ফিরতে পারেনি।

তবে ঘটনার পর ডিপো কর্তৃপক্ষ অনেকটা আড়ালে চলে গেলেও এবার সামনে এসেছেন তারা। এই ঘটনা নিয়ে পরিষ্কার করেছেন নিজেদের অবস্থান । তাদের দাবি- ঘটনার পরই তাদের অফিস থেকে ৯৯৯ এ ফোন দিয়ে আগুন লাগার কথা বলেছিল তারা। একইসঙ্গে কনটেইনারে ক্যামিকেল থাকার কথাও জানানো হয়েছিল। তবে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। যেকারণে এতগুলো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। যদিও আগুন নেভাতে এসে নিহত ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের জন্য নগদ ১৫ লাখ টাকা ও আহতদের জন্য ১০ লাখ টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে এই মালিকপক্ষ।

এদিকে ডিপো কর্তৃপক্ষের অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রামের উপ পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কেবল আগুন লেগেছে সেটা বলা হয়েছে। কনটেইনারে যে রাসায়নিক ছিলো সেটা বলা হয়নি। যে কারণে কুমিরা ও সীতাকুণ্ড থেকে যারা গিয়েছিল তারা সাধারণ অগ্নিনির্বাপণের পোশাক পরে গিয়েছিল। কনটেইনারে রাসায়নিক থাকার কথা বললে তারা ক্যামিকেল স্যুট পরে যেতো। এই বিশেষায়িত পোশাক পরে গেলে বিস্ফোরণের আগে দ্রুতই রাসায়নিকের আগুন নেভানো যেতো।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *