শিরোনাম
শনি. জানু ৩, ২০২৬

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা বাস্তবায়নে মার খাচ্ছে বাংলাদেশ

২০০৫ সালে হংকংয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রীরা একমত হন, স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে একটি বিশেষ সুবিধার অধীনে ৯৭ শতাংশ পণ্য বিনাশুল্কে প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে। অন্যান্য দেশ এই সুবিধা দেওয়ার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এর ১৫ বছর পরে ২০২০ সালে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন বাংলাদেশকে এই সুবিধা দিলো। তবে বিশ্ব বাণিজ্য কাঠামোয় নতুন সুযোগ তৈরি করা এবং স্বাভাবিকভাবে প্রদেয় সুযোগগুলো গ্রহণ করা বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য কঠিন। এর বড় কারণ হচ্ছে এসব দেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশেষজ্ঞ ও সমন্বয়ের অভাব। এ কারণে যে সুবিধাগুলো চালু রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে মার খাচ্ছে বাংলাদেশ।

জেনেভায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং স্থায়ী প্রতিনিধি এম শামীম আহসান, ‘অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শর্তাবলি নির্ধারিত হয় বাণিজ্যে জড়িত দেশগুলো কতটুকু সুবিধা পেলো তার ওপর। এর সঙ্গে জড়িত হয় দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।’

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শর্তাবলি নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা এবং যেটুকু আদায় হয় পরবর্তী সময়ে সেটিকে বাস্তবায়ন করা উভয় ক্ষেত্রেই সক্ষমতার প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ এবং দেশের অভ্যন্তরে জড়িত প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও এজেন্সির মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয়।

শামীম বলেন, ‘কূটনীতিতে একটি কথা প্রচলিত আছে। সেটি হচ্ছে, “কোনও দেশ যদি দর কষাকষির টেবিলে বসতে না পারে, তবে সে একজন দর্শক।” ’

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শর্তাবলি নির্ধারণের ক্ষেত্রে দর কষাকষি কতিপয় দেশের মধ্যে হয়ে থাকে। সেখানে বাংলাদেশের জায়গা করে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশগুলো সাধারণত অন্য দেশগুলোকে কম সুবিধা দেয় এবং বেশি সুবিধা গ্রহণ করে। যেহেতু তারা গ্রহীতা, তারা বেশি উচ্চস্বরে কথা বলতে পারে না। এটিই বাস্তবতা।’

জেনেভাতে প্রায় ছয় বছর ধরে কর্মরত শামীম নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দর কষাকষি হয় “গ্রিন রুমে” এবং এককভাবে বাংলাদেশ ওই টেবিলে বসতে পারে না। কিন্তু যখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিল তখন আমি সেখানে দর কষাকষি করেছি।’

২০১৫ সালে বাংলাদেশসহ সব স্বল্পোন্নত দেশ ট্রিপস সুবিধা পায়। যার অধীনে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওই দেশগুলো কোনও রয়্যালটি ছাড়াই যেকোনও ওষুধ তৈরি করতে পারবে। রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আমি সাত সপ্তাহ দর কষাকষি করেছি। এরপর আমরা ১৭ বছরের জন্য ট্রিপস সুবিধা পেয়েছি।’

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থায় মৎস্য সম্পদ ভর্তুকির বিষয়ে দর কষাকষি চলছে, যা সামনের বছরে চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানান রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ মৎস্য সম্পদে চতুর্থ বৃহত্তম দেশ এবং এ কারণে এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

এই ধরনের দর কষাকষির সময়ে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বৃহত্তর সমন্বয় দরকার জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন রাষ্ট্রদূত যত ভালোই হোন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতির থেকে ভালো পারফরমেন্স তিনি করতে পারেন না।’

একটি দেশ যে গুরুত্বপূর্ণ সেটি একদিনের দর কষাকষি দিয়ে বোঝানো সম্ভব না। বরং এর জন্য জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে মনে করেন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের পথে। এ সময়ে সমন্বিতভাবে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি গ্রহণ করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সুবিধা আদায় করতে হবে।’

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *