বিশ্বের অন্যতম উষ্ণতম স্থান হলো পূর্ব আফ্রিকার আফার অঞ্চল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঠিক এই অঞ্চলের নীচেই ভাগ হয়ে যাচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশ। শুধু তাই নয়, বিভক্ত সেই মহাদেশের মাঝখানে সৃষ্টি হচ্ছে এক নতুন সমুদ্রের।
আফার অঞ্চলের মাটির অনেক গভীরে রয়েছে তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল। আর এই তিনটি প্লেটই খুব ধীরে ধীরে পরস্পরের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। এটি যদিও খুব জটিল একটি প্রক্রিয়া, কিন্তু এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ বছর পর দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে আফ্রিকা। আর মাঝখানে তৈরি হবে নতুন সমুদ্র।
এই মুহুর্তে এর প্রমাণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইথিওপিয়ার মরুভূমির বুকে একটি ৩৫ মাইল লম্বা ফাটলের কথা।
আফ্রিকা মহাদেশের টেকটোনিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। তবে সম্প্রতি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভূমি পরিমাপের সুযোগ পাওয়ায় পরিবর্তনগুলো আরো পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ করে জিপিএসের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে ভূ-পৃষ্ঠের অভ্যন্তরে মাটির সরে যাওয়ার গতি এবং হার পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে। আর এরই ফলে ভূ-পৃষ্ঠের সবচেয়ে অসাধারণ এই অঞ্চলটিতে নতুন সমুদ্র সৃষ্টির বিষয়ে মূল্যবান তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক ক্রিস্টোফার মুর বলেন, এটিই পৃথিবীর একমাত্র স্থান যেখানে মহাদেশ ভেঙে কিভাবে সমুদ্র তৈরি হচ্ছে তার গবেষণা করা যায়।
স্যাটেলাইট রাডার ব্যবহার করে ক্রিস্টোফার মুর পূর্ব আফ্রিকার আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণ করেন। ধারণা করা হচ্ছে মহাদেশটি বিভক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর পেছনে এসব আগ্নেয়গিরির প্রভাব আছে।
ধারণা করা হচ্ছে, আফ্রিকার এই নতুন সমুদ্রটি তৈরি হতে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি বছর লেগে যাবে, তবে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত যে প্রক্রিয়াটি এরইমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তিনটি টেকটোনিক প্লেট অবশ্য আলাদা আলাদা গতিতে দূরে সরে যাচ্ছে। এর মধ্যে আরবীয় প্লেটটি আফ্রিকা থেকে প্রতিবছর প্রায় এক ইঞ্চি করে দূরে সরে যাচ্ছে বলে জানান বিজ্ঞানীরা। অন্য দুটি আফ্রিকান প্লেটের সরে যাওয়ার গতি অবশ্য অনেক কম, প্রতিবছর আধা ইঞ্চি থেকে ০.২ ইঞ্চি করে।
গত ৩০ মিলিয়ন বছর ধরেই অবশ্য আরবীয় প্লেটটি আফ্রিকা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে লোহিত সাগরের সৃষ্টিও হয়েছে একইভাবে।
তবে কেন এই বিভক্তিকরণ শুরু হয়, তার সঠিক কারণ এখনও জানাতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। সেজন্যেই এই অঞ্চলটিকে এখন তারা আস্ত একটি জীবন্ত গবেষণাগার বলে মনে করছেন। যদিও এখানকার পরিবেশের কারণে গবেষণা চালানো ভীষণই কঠিন।
নিউ অরলেন্সের টুলান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ সিনথিয়া এবিনজার বলছেন, এই অঞ্চলটিকে বলা হচ্ছে দান্তের ইনফার্নো। পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ শহর রয়েছে এই আফার অঞ্চলে। দিনের বেলায় এখানকার তাপমাত্রা গিয়ে ঠেকে ১৩০ ডিগ্রী ফারেনহাইটে, আর রাতে হয় ৯৫।
এবিনজার এই এলাকায় বহু গবেষণা করেছেন মাঠ পর্যায়ে। ২০০৫ সালে ইথিওপিয়ায় যে ৩৫ মাইল দীর্ঘ ফাটল তৈরি হয়, এবিনজারের মতে তা কয়েকশ বছরের টেকটোনিক প্লেটের পরিবর্তন কয়েক দিনে ঘটার মতোই একটি ঘটনা। তিনি এখন গবেষণা করছেন এই ফাটল সৃষ্টির কারণ নিয়ে। তার ধারণা, অতিরিক্ত ম্যাগমা থেকে সৃষ্ট চাপের কারণে এটি ঘটে থাকতে পারে। একে একটি বেলুনকে অতিরিক্ত বাতাস দিয়ে পূর্ণ করার সাথে তুলনা করেন তিনি। একসময়ে চাপ সহ্য করতে না পেরে বেলুনটি ফেটে যায়। ঠিক একই ভাবে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে তৈরি চাপ সহ্য করতে না পেরে ইথিওপিয়ায় ওই ফাটল তৈরি হয়। যা পরবর্তীতে গোটা মহাদেশটিকেই দুই টুকরো করে দেবে। সূত্র: এনবিসি নিউজ।

