শিরোনাম
বুধ. ফেব্রু ১৮, ২০২৬

।। ফরীদ আহমেদ রেজা ।।

আমার জন্ম শহর থেকে দুরে, বাংলাদেশেরে এক গ্রামে। গ্রামের নাম সৈয়দপুর। থানার নাম জগন্নাথপুর। পূর্বে এ থানা ‎ছিল বৃহত্তর সিলেট জেলার অন্তর্গত, এখন তা সুনামগঞ্জ জেলার অধীনে। ‎

আমি মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। আমার বড় বোন আমার চেয়ে দু বছরের বড়। আমরা ভাইবোন এক সাথে স্কুলে ‎যেতাম। বড়াপা স্কুলে না গেলে আমিও স্কুলে যেতাম না। স্কুলটি আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল। শিশুদের কলরব এবং ‎শিক্ষকদের পাঠদান বাড়িতে বসেই শোনা যেতো। ক্লাসের সবাই আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন। আমার এক মামা ‎এবং এক খালাতো ভাই একই স্কুলে নিচের ক্লাসে পড়তেন। তারা দুজনই আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন। ‎

বাড়ির পাশের লুপ্তপ্রায় মাগুরা নদী

প্রাইমারী স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার দিন ছাড়া অন্য কোনো স্মৃতি খুব একটা আমার মনে নেই। অ আ ক খ, ‎১ ২ ৩ ৪, আলিফ বা তা ছা আমি আম্মার কাছে শিখেছি, মক্তবে বা স্কুলে যাওয়ার আগেই। একটু বড়ো হয়ে উর্দু ভাষার ‎প্রথম পাঠও আম্মার কাছে শিখেছি। মুফতি কেফায়েত উল্লাহ লিখিত তা’লিমুল ইসলাম চার খণ্ড আমি আম্মার ‎কাছে পড়েছি।

পাঠশালায় তৃতীয় শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার কথা হয়তো একটি কারণে মনে আছে। সে সময় অঙ্ক পরীক্ষার সাথে ‎মানসাঙ্ক পরীক্ষা দিতে হতো। শিক্ষক মুখে মুখে প্রশ্ন করতেন এবং ছাত্রদের খুব কম সময়ের মধ্যে নিজের মনে মনে ‎অঙ্ক করে উত্তর দিতে হতো। আমি মানসাঙ্কে একটি ছাড়া কোনো উত্তর লেখতে পারিনি। আসলে সে সময় আমি খুব ‎ছোটো ছিলাম, প্রশ্নগুলো বুঝতেই পারিনি। শেষ প্রশ্ন ছিল এ রকম, দেড় কুড়ি শেয়ালের ত্রিশটি লেজ, প্রত্যেকটি ‎শেয়ালের ভাগে কয়টা লেজ পড়বে? আমি ২০ সংখ্যা জানলেও কুড়ি-দেড়কুড়ি অর্থ কি তা আমার জানা ছিল না। শিক্ষক ‎এ প্রশ্ন করার সাথে সাথে এক ছাত্র চিৎকার করে বলে ওঠে, ১টি। আমি না বুঝেই এর উত্তরে ১টি লেখে দেই এবং ‎নম্বর পাই। ‎

দাদা পীর মজিরের নাগরি হরফে লেখা পুঁতির পাতা

আমাদের বাড়িতে নাগরি হরফের চর্চা ছিল। আব্বা আমার দাদার হাতের নাগরি হরফে লেখা পুঁথি পাঠ হরে আমাদের ‎শোনাতেন। নাগরি হরফে লেখা বই-পুস্তক পাঠ করলে যারা বাংলা বা সিলেটি জানেন তারা সহজেই বুঝতে পারেন। ‎দাদার নাগরি হরফে লেখা ৭টি মৌলিক গ্রন্থ ছিল। ‘শাহাদতে বুজুর্গান’ এবং ‘গুলরুখ’ ছিল পুঁথি। আব্বা বলেছেন, ‎গুলরুখে কাহিনী ছিল দাদার আত্মকথা। এক সময় আমার নাগরি হরফ শেখার আগ্রহ জাগে। আমার একমাত্র জীবিত ‎ফুফু আয়েশা খাতুন আমাকে নাগরি হরফ শিক্ষা দেন। ‎

আমার আব্বার কোনো ভাই ছিলেন না। আমার দুজন চাচা জন্মেছিলেন। তারা দু জনই ছোটবেলা ইন্তেকাল করেন। ‎আমার চার ফুফু ছিলেন। তাদের তিন জনই আমার জন্মের আগে ইন্তেকাল করেন। ‎

আমাদের পরিবার খুব ধনী না হলেও গরীব ছিল না। আমাদের ধানের জমি ছিল। কৃষিকাজ এবং অন্যান্য কাজের জন্য ‎বাড়িতে সব সময় দু জন মানুষ থাকতেন। জমিতে উৎপাদিত ধান দিয়ে আমাদের সারা বছরের খাবার হয়ে আরো ‎উদ্বৃত্ত থাকতো। বাড়িতে হালচাষের গরু ছিল। দুধের গাই ছিল। ছাগল-ভেড়া ছিল। হাঁস-মোরগ ছিল। সকালে রাতা ‎মোরগের ডাক শুনে ঘুম ভাঙতো। বাড়িতে ছোট ছোট তিনটি পুকুর ছিল। তিনটি পুকুরেই প্রচুর মাছ পাওয়া ‎যেতো।

শাহ জালালের সঙ্গী সৈয়দ শা শামসুদ্দিনের মাজার ও সংলগ্ন মসজিদ

আমরা যে বাড়িতে থাকতাম সেটা ছিল নতুন বাড়ি। আব্বার জন্মের পর আমার দাদা নতুন বাড়িটি করেন। নতুন ‎বাড়িতে আমা-কাঁঠাল ও অন্যান্য ফলের গাছ ছিল। দুটো পেয়ারা গাছ ছিল। তবে মাত্র একটা নারিকেল গাছ এবং ‎জলপাই গাছ ছিল। অনেক সুপারী গাছ ছিল। বাড়িতে উৎপন্ন গরু-ছাগলের দুধ, হাঁস-মোরগের ডিম, আম-কাঁঠাল এবং ‎মাছ-মাংস খেয়ে আমরা বড় হয়েছি।

সে সময় আমাদের জীবন ছিল খুব সাধারণ। আমরা খালি পায়ে লুঙ্গি এবং শার্ট পরে স্কুলে যেতাম। বাড়িতে কাঠের ‎তৈরি খড়ম পায়ে দিতাম। সকালে ঘুম থেকে ওঠে ফজরের নামাজের পর খড়ম খুলে রাখতাম। মাগরিবের সময় ওজু ‎করে খড়ম পায়ে দিতাম। দুটো শার্ট, দুটো লুঙ্গি, একটি গেঞ্জি, একখানা খড়ম ছিল আমাদের পরনের সম্পদ। শীতকালে ‎এক জোড়া জুতা, এক জোড়া মোজা, একটি সোয়েটার এবং একখানা চাদর থাকতো। তখন আরো বেশি পাওয়ার ‎আকাঙ্খা কখনো মনে জাগেনি। ‎

ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, আমাদের বাড়িতে একজন গৃহশিক্ষক আছেন। তারা সবাই ঠিক শিক্ষক ছিলেন না, তাদের প্রধান কাজ ছিল আব্বাকে সঙ্গ দেয়া। কৃষি ‎বিভাগে কাজ করতেন এমন একজনের কথা আম্মা প্রায়ই গল্প করতেন। তার বাড়ি ছিল বরিশাল। তিনি সপ্তাহ ‎দুয়েকের জন্য নিজ বাড়ি বরিশালে গিয়েছিলেন। বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই মারা যান। (চলবে…)

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *