।। ফরীদ আহমেদ রেজা ।।
আমার জন্ম হয় দাদাজানের তৈরি করা বাড়িতে। সে বাড়িতে বড়ঘরে মাত্র দুটি শোবার কামরা ছিল। আর ছিল রান্নাঘর এবং ভাঁড়ার। রান্নাঘরকে আম্মা পাকঘর এবং ভাঁড়ারকে বারিন্দা বলতেন। বারিন্দা শব্দটি কোত্থেকে এসেছে সে তথ্য এখনো আমার অজ্ঞাত।
আমাদের বাড়িটি পূর্বমুখি। বাড়ির প্রস্থের তুলনায় দৈর্ঘ বেশি। পশ্চিম প্রান্তে থাকার ঘর, এটা আমাদের কাছে বড়ঘর। মধ্যখানে তিন কামরাবিশিষ্ট একটি ঘর, যার নাম মাঝের ঘর। এর দুটি কামরায় থাকার ব্যবস্থা ছিল। ওপরটিতে জ্বালানী কাঠ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা হয়। সবশেষে চৌচালা বাংলা ঘর।
বাংলাঘরে একটি টেবিল, কয়েকটি চেয়ার, একখানা চৌকি, একটা বেঞ্চ, কয়েকটা টুল আর একটা বইয়ের আলমারী ছিল। দু দিকে বড় বারান্দা এবং দুটো দরোজা। মেহমান এলে এখানে বসতেন। পথিক-মুসাফির এলে এখানেই রাত্রি যাপন করতেন। বাংলা ঘরে দাদাজানের চিহ্ন এখনো বর্তমান। বাংলাঘরের কাঠামো দাদার তৈরি কাঠামোর উপরই আছে। ঠিক ছাদের নিচে পূর্ব-পশ্চিমে আড়াআড়ি করে একটি কাঠের বড় ফ্রেমে খোদাই করে লেখা আছে, মালিক খোদাতালা খাদিম মজির উদ্দীন আহমদ পীর।
ছোটবেলা বাংলা ঘরের দেয়ালে কিছু পোস্টার সাঁটা ছিল। একটিতে লেখা ছিল, আদমশুমারী ১৯…। তখন আমি সবেমাত্র বানান করা শিখেছি। বাংলা লেখা শুরু হয় বাম দিক থেকে এবং আরবী লেখা শুরু হয় ডান দিক থেকে। আমি একদিন সেটা পড়তে গিয়ে আরবীর মতো করে ডান দিক থেকে পড়েছি, ‘রীমাশুমদআ’। বড়াপা পাশে ছিলেন, তিনি চট করে আমাকে সংশোধন করে দিয়ে বললেন, এটা হবে আদমশুমারী। কিন্তু আমি মানতে রাজি ছিলাম না। চলছে দু জনে বেদম বিতর্ক। এ সময় ‘মিয়ার নয়া বাড়ি’র (প্রচলিত – মেন্নুয়া বাড়ি) মাস্টার তবারক আলী এসে হাজির। শিক্ষকতা বাদ দিয়ে তিনি তখন সংসার বিরাগী ফকির। তাঁকে আমরা তবারক ভাই ডাকতাম এবং তিনি প্রায়ই আব্বার সাথে গল্প করার জন্যে আসতেন। আমরা দু জন তাঁকে সালিশ মানলাম। তিনি বড়াপার পক্ষে রায় দিলেন, আমি মাথা পেতে ভুল মেনে নিলাম।
আমি দাদাজানকে দেখিনি। আব্বার মুখে শুনেছি, আব্বার বয়স যখন ১২ বছর তখন দাদাজান ইন্তেকাল করেন। আমি দাদীকে পেয়েছি। এতো বছর পরও দাদীর চেহারা এখনো আমার মনে জ্বল জ্বল করছে। তাঁর শরীরের গঠন ছিল লম্বা, ছিপছিপে। গায়ের রঙ ছিল উজ্জল ফর্সা। নাক ছিল উঁচু, ধারালো, মুখের গড়ন লম্বাটে। তখন তাঁর দাঁত ছিল না। দাঁত না থাকায় গাল বসে গিয়েছিল। পান খেতেন কুটনি দিয়ে। তাঁর একটা বাঁশের কুটনি ছিল। পান খেলে ঠোঁট লাল হয়ে যেতো।
দাদীর নাম ছিল সাহেবুন নিসা, আব্বা লিখতেন ছাহেবুন্নিসা। দাদীকে আমরা বিবি বলে ডাকতাম। দাদীকে একদিন তাঁর নাম জিজ্ঞেস করলে বলেন তাঁর নাম ‘আসমান-তারা নয়ন-চোখ’। শুনে আমার অবাক লাগে। পরে আব্বার কাছে দাদীর নাম জেনেছি। দাদী মাঝে মাঝে আপন মনে অনুচ্চস্বরে গানের কলি আওড়াতেন। বড়ঘরের বারান্দায় আম্মা এবং আমার ফুফুর সাথে তিনি কাঁথা সেলাই করছেন, সে দৃশ্য এখনো আমার মনের চোখে ভাসে।

আব্বার মামার বাড়ি কাছেই ছিল। চৌধুরী বাড়ির উত্তরের বাড়ি, আমাদের বাড়ি থেকে বড় জোর পাঁচ মিনিটের পথ। তোতা চাচা, আকমল চাচা, নাজমুল চাচা আব্বার মামাতো ভাই। দাদী তাদের বাড়ি এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যেতেন। আমি দাদীর সাথে কারো বাড়িতে গিয়েছি বলে মনে পড়ছে না। বড়াপা দাদীর সাথে যেতেন। তাই হয়তো দাদীর আত্মীয়-স্বজনের সাথে আমার চেয়ে বড়াপা ঘনিষ্ট হয়ে পড়েন। আমি আর বড়াপা রাত্রে দাদীর কাছে ঘুমাতাম। দাদী কথা বলতেন, হয়তো বড়াপার সাথে অথবা আপন মনে। আমি ছোটবেলা খুব ঘুমকাতর ছিলাম। বিছানায় গেলেই ঘুমিয়ে পড়তাম।
আমরা ভাটির দেশের লোক। ভাটির দেশকে ধানের দেশ, গানের দেশ, মাছের দেশ বলা হয়। কখনো পাখির দেশও বলা হয়। শুনেছি, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ূব খান ভাটির দেশে এসেছিলেন পাখি শিকারে। এর সত্যাসত্য কখনো যাচাই করিনি। বর্ষাকালে, মানে আষাঢ়, শ্রাবন, ভাদ্র ও আশ্বিন – এ চার মাস নৌকা ছিল তখন সৈয়দপুরে চলাচলের একমাত্র বাহন। প্রত্যেক পরিবারে এক বা একাধিক নৌকা থাকতো। বয়স্ক পুরুষদের সবাই নৌকা চালাতে পারতেন। অন্যান্য বাড়িতে অনেক পরিবার এক সাথে থাকলেও আমাদের বাড়িতে আমরা ছিলাম একটি মাত্র পরিবার। বর্ষাকালে আমাদের বাড়িতে কেউ নৌকা ছাড়া আসতে পারতেন না। গরুর ঘাস কাটা, মাছধরা, বাজার-সওদা করা এবং বেড়ানো - সকল কাজের জন্যে নৌকার দরকার পড়তো।
ভর-বর্ষায় আমাদের সামনের দুটো পুকুর পাশের মাগুরা নদীর সাথে একাকার হয়ে যেতো। পূর্বদিকে তাকালে দেখা যেতো নদীর ওপারে সুদূর প্রসারিত ধানক্ষেত, ধানের সবুজ পাতা পানির উপর মাথা তুলে বাতাসের তালে তালে নৃত্য করছে। বাড়ির দক্ষিণ দিকে তাকালে গ্রামের তরুণদের নৌকাবিহার উপভোগ করা যেতো। পূবালী এবং দখিনা বাতাস আমাদের বাড়িতে বসে সব সময় পাওয়া যেতো। দক্ষিণের দিকে গ্রামের বাজার, পায়ে হেঁটে পাঁচ মিনিটের পথ। সোম এবং বৃহস্পতি বার হাট বসতো। তখন বাজারের চারিদিকে দেখা যেতো ছোটবড় নৌকা আর নৌকা।

আব্বা বাড়িতে থাকলে বাড়ি বর্ষা-হেমন্ত সব সময় জম-জমাট হয়ে থাকতো। আব্বা সকালে ফজরের নামাজ পড়ে কুরআন তেলাওত শেষ করার আগেই আশ-পাশের অনেকে এসে হাজির হতো। কেউ শিশিতে করে পানি অথবা তেল নিয়ে এসেছে আব্বা পড়ে দিবেন বলে। আবার কেউ এসেছে রোগ-বালাইয়ের জন্যে তাবিজ-কবজ নিতে। আব্বা মানুষকে বনজ ওষুধপত্রও বাতলে দিতেন। তাবিজ, পানি বা তেল পড়া অথবা বনজ ঔষধের জন্যে তিনি কারো নিকট থেকে টাকা-পয়সা নিতে দেখিনি।
সন্ধ্যার পর আব্বা বাড়িতে প্রায়ই বই পাঠের আসর বসাতেন। সেখানে আমার ফুফু, ফুফুতো বোন, আমরা ভাইবোন, বাড়ির অন্যান্য লোক থাকতেন। আশপাশ বাড়ি থেকে অনেকে আসতেন। আব্বার বই পড়ার পদ্ধতি খুব উপভোগ্য ছিল। যে বই পাঠ করতেন সেটা তিনি আগেই পড়ে নিতেন। তারপর বইয়ের দিকে চোখ রেখে সিলেটী ভাষায় গল্পের মতো বইটি পড়ে যেতেন। নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন, শরৎচন্দ্র, শাহেদ আলী, নসীম হিজাজী, আবুল ফজল, শওকত ওসমান প্রমুখ লেখকের নাম আমরা আব্বার মুখ থেকে জেনেছি এবং তাদের অনেক উপন্যাস তিনি আমাদের শিশুকালে এভাবে পাঠ করে শুনিয়েছেন। আব্বা মহররম মাস এলে দাদার লেখা পুঁথি শাহাদতে বুজুর্গান পাঠ করে শোনাতেন। সেখানে আমাদের বাড়ির বাইর থেকে অনেক লোক হাজির হতেন।
সাংসারিক কাজকর্মে আব্বার সার্বক্ষণিক সহযোগী ছিলেন ‘মস্তান ফুতি’। মস্তান অর্থ মাস্তান নয়। মাস্তান মানে সন্ত্রাসী এবং মস্তান মানে দেওয়ানা। পীরের ভালোবাসা বা খেদমতের জন্যে পাগল অর্থে তাঁকে মস্তান বলা হতো। ফুতি> পুত্র থেকে, চাচা অর্থে ব্যবহার করা হয়। আমাদের এলাকায় চাচা অর্থে ‘ফুতি’ শব্দের ব্যবহার আছে। তার আসল নাম ছিল মজহার আলী। কিন্তু গ্রামের কেউ এ নামে তাকে চিনতো না। কৃষিকাজ বা অন্যান্য কাজের জন্য বাড়িতে অন্য লোক থাকলেও তিনি সব সময় তাদের সাথে থাকতেন। আমাদের জমিজামা, হাল-গৃহস্থালী, বাড়ির সীমানা, কোথায় কখন সবজি খেত করতে হবে ইত্যাদি দেখাশোনা তিনিই করতেন। আব্বা হয়তো অনেক জমিতে গিয়ে পা-ই রাখেননি, কিন্তু মস্তান ফুতির নখদর্পনে সবকিছু ছিল। তাঁর বাড়ি আমাদের থানার সিদ্দরপাশা বা শ্রীধরপাশা গ্রামে। তরুণ বয়সে তিনি বাড়ি ছেড়ে আমার দাদার সাথে চলে এসেছিলেন, দাদার খেদমতের জন্যে। তিনি বিয়েশাদী করেননি। দাদার ইন্তেকালের পরও তিনি আমাদের বাড়ি থেকে চলে যাননি।
আমাদের দুটো নৌকা ছিল। একটি ঘাসকাটা, বাজার-সওদা বা সাধারণ যাতায়াতের জন্যে এবং ওপরটি আব্বার সফরের জন্য পানসী নাও। হেমন্ত মওসুমে পানসী নাও বাড়ির পাশের পুকুরে থাকতো। বর্ষাকালে আব্বা পানসী নৌকা দিয়ে সফরে যেতেন। পানসীতে চড়ে আব্বা পশ্চিম দিকে যাত্র করতেন। তিনি দিনের পর দিন জগন্নাথপুর, দিরাই, ধর্মপাশা হয়ে নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন থানায় ঘুরে বেড়াতেন। এ সকল এলাকায় আব্বা এবং দাদার ভক্ত বা অনুরাগী বহু পরিবার রয়েছে। কোথায় যাচ্ছেন, এ রকম প্রশ্ন করলে আব্বা বলতেন, ‘আমার বাবার ভক্তদের দেখতে যাচ্ছি।’ একবার সফরে বেরোলে কোনো কোনো সময় আব্বা তিন মাস পর ফিরে আসতেন। (চলবে…)