।। ফরীদ আহমেদ রেজা ।।
এক সময় আমাদের গ্রামের নাম ছিল কৃষ্ণপুর। দরবেশ শাহ জালাল (র)’র সফরসঙ্গী সৈয়দ শাহ শামসুদ্দিন (র) এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর নামের প্রথম অংশ ধারণ করে গ্রামটি সৈয়দপুর হিসেবে পরিচিতি পায়। বাইরের অনেকে মনে করেন সৈয়দপুরের সবাই সৈয়দ শাহ শামসুদ্দীনের বংশধর। আসলে তা নয়। খান, মল্লিক, শিকদার, কুরেশী প্রভৃতি বংশের আরো অনেকে এ গ্রামে এসেছেন। আমাদের পূর্বপুরুষ সিলেটের দাউদপুর থেকে সৈয়দপুর এসেছেন। গ্রামটির আয়তন খুব বড় না হলেও ছোট নয়। লোকসংখ্যা প্রচুর এবং খুব ঘনবসতি। লোকমুখে তা বড় সৈয়দপুর হিসেবে পরিচিত। আমাদের ছোটবেলা লোকসংখ্যা হয়তো সাত হাজারের মত ছিল। বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ত্রিশ-পয়ত্রিশ হাজার।
আমাদের গ্রামের সবাই ধর্মের দিক দিয়ে মুসলমান এবং হানাফি মজহাবের অনুসারী। আমি ছোটবেলা হিন্দুধর্মের কথা মায়ের মুখে এবং বইয়ে পড়েছি। হিন্দুধর্মের কোনো আচরণের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাইনি। আমাদের পাশের গ্রাম বুধরাইল থেকে একজন মাস্টার বাবু ধুতি পরে মডেল স্কুলে আসতেন। এক সময় তিনি জমি-বাড়ি বিক্রি করে ভারতে চলে যান। আমার মামার বাড়ির পাশে একটি হিন্দু পরিবার ছিল। ওদের একজনের কথা আমার আবছা মনে আছে। তাকে কালেমা তাইয়েবা এবং আজানের শব্দগুলো বলতে শুনেছি। এ পরিবারও এক সময় গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। লোকমুখে শুনেছি এক সময় গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত গয়গড় এবং হাড়িকোনায় আরো কয়েকটি হিন্দু পরিবার ছিল।
আমাদের গ্রামের কিছু বাড়ির বিশেষ নাম আছে। সেগুলো হচ্ছে চৌধুরী বাড়ি, বড় বাড়ি, কাজি বাড়ি, পীরের বাড়ি, বড় মৌলবী সাবের বাড়ি, পোস্ট অফিস বাড়ি ইত্যাদি। দুটো বাড়িতে বহু পরিবার একই সাথে বাস করেন বলে সে দুটির নাম লম্বা হাটি। বাড়িগুলো প্রথম যখন দেখি তখন এগুলোর দৈর্ঘ দেখে আমি সত্যি অবাক হয়েছি। একটা পশ্চিম পাড়ার লম্বা হাটি এবং আরেকটি পূর্ব পাড়ার লম্বা হাটি। গ্রামে ছোটবড় কয়েকটি পাড়া আছে। একটিকে বলা হয় পূর্বপাড়া বা পুবপাড়া। আরো আছে ইশান কোনা, মলিক পাড়া, পশ্চিম পাড়া, হাড়ি কোনা, গয়গড়, নোয়পাড়া, গোয়াল গাঁও ইত্যাদি। পুবপড়ার আরেক নাম আগুন কোনা এবং এখানেই আমার জন্ম।

আমাদের বাড়ির সংলগ্ন সৈয়দপুর আলীয়া মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটি ১৯০৩ ইংরেজিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমার ছোটবেলা এটা নিউস্কিম কারিকুলামে পরিচালিত হতো। ঠিক মাদ্রাসার জমির উপর ছিল মডেল প্রাইমারী স্কুল। এ প্রাইমারী স্কুলই ছিল আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে স্কুলটি একটু দূরে গ্রামের জমির উপর তৈরি নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়েছে।
আমাদের গ্রামের বাজার বাড়ি থেকে বড়জোর তিনচার মিনিটের পথ। বাড়ি থেকে হাঁক দিলে বাজার থেকে শোনা যায়। বাজারের হৈ চৈ আমরা বাড়ি থেকে পরিস্কার শুনতে পারি। তারপরও ছোটবেলা কোনোদিন আমি বাজারে গিয়েছি বলে মনে পড়ে না । হাটবারে আব্বাকেও বাজারে যেতে দেখিনি।
এক সময় এ বাজারের নাম ছিল ‘মিয়ার বাজার’। মিয়া আজমল আলী চৌধুরী তাঁর বাড়ির পাশে এ বাজার পত্তন করে বলেই এ ভাবে নামকরন হয়েছে। একই ভাবে তাঁর তৈরি নতুন বাড়ির নাম হয়েছে ‘মিয়ার নয়া বাড়ি’। মানুষের মুখে মুখে বহুল ব্যবহারের কারণে এর নাম পরিবর্তন হয়ে ‘মেন্নুয়া বাড়ি’ হয়ে গেছে।
বাজারে স্থায়ী দোকান ছিল হাতে গোনা। একটা কাপড়ের দোকান, দুটো মুদির দোকান, একটা মিস্টিঘর এবং একটি দরজির দোকান। কাপড় বা বড় কোনো কেনাকাটা থাকলে আব্বা বাজারে যেতেন, কিন্তু সেটা হাটবারে নয়। হাটবারে অন্যান্য গ্রাম থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন। তারা হাটের খোলা এলাকায় পসরা নিয়ে বসতেন। আব্বা কেনাকাটার জন্য বিশেষ করে একটি মুদির দোকানে যেতেন। সেটাতে বসতেন তবারক মাস্টার সাহেবের ছোট ভাই জবারক ভাই। তবারক মাস্টারের কথা ইতোপূর্বে আমি ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি, যিনি শিক্ষকতা ত্যাগ করে সংসার বিরাগী হয়ে যান। শুনেছি, এ দোকান তাঁরই ছিল। তিনি সাংসারিক কাজকর্ম পরিত্যাগ করায় তাঁর ছোটভাই এর হাল ধরেন।
গ্রামের সবাই হাটবারে হাটে এসে কয়েকদিনের বাজার-সওদা করতেন। মুদির দোকানে মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, তেল, চাপাতা, গুড়ো দুধ ইত্যাদি পাওয়া যেতো। কিন্তু সবজি, কাঁচামরিচ, মাছ, পান ইত্যাদি কাঁচামালের কোনো কিছু পাওয়া যেতো না। এগুলোর জন্যে গ্রামের সকলকে হাটবারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। বাজারে মাংসের কোনো দোকান ছিল না। চুলকাটার সেলুন ছিল না। আমাদের গ্রামের কিছু লোক ছিলেন যারা ভালো চুল কাটতে পারতেন। কারো চুল কাটার দরকার হলে তারা এ সকল মানুষের কাছে যেতেন। বিনা পয়সায় মানুষের চুল কেটে দিতেন।
সে সময় বাজারে কোনো লণ্ড্রি ছিল না। গ্রামের সবাই বাড়িতে কাপড় ধুইতেন। হাটবারে আশপাশের গ্রাম থেকে জেলেরা মাছ এবং সুটকি নিয়ে হাটে আসতেন। আমাদের গ্রামে জেলে সম্প্রদায়ের কেউ ছিলেন না। তবে কাঁচা মালের অনেক ব্যবসায়ী ছিলেন। তারা হাটের খোলা জায়গায় বসে মালপত্র বিক্রি করতেন। বাইরের কিছু ব্যবসায়ীও নানা প্রকার সামগ্রী নিয়ে গ্রামের হাটে আসতেন। বর্ষাকালে বড় বড় নৌকা নিয়ে দূরের ব্যবসায়ীরা আমাদের বাজারে আসতেন। বড় নৌকার ব্যবসায়ীরা ইট, কাঠ, মিস্টি আলু,কাঁঠাল, ফার্নিচার ইত্যাদি নিয়ে আসতেন।
হাটবার ছিল সোমবার এবং বৃহস্পতিবার। হাট জোহরের পর বসতো। হাটের দিন আব্বা কাগজ-কলম হাতে নিয়ে আম্মাকে ডাকতেন। কি কি কিনতে হবে তা আম্মা বলে দিতেন। আব্বা ছোটো একটা চিরকুটে তা লিখতেন। আব্বার মুরিদানের কেউ থাকলে তাকে বাজার-সওদা করতে পাঠানো হতো। কখনো যেতেন গৃহকর্মের জন্য নিয়োজিত কেউ। বাজারের ফর্দ তৈরি হলে যিনি বাজারে যাবেন তার ডাক পড়তো । আব্বা তাকে ফর্দ বুঝিয়ে দিতেন। বাজার-সওদা নিয়ে আসার পর তাকে আব্বার কাছে হিসাব বুঝিয়ে দিতে হতো।
আমি দেখেছি, আব্বা সব সময় আয়-ব্যয়ের হিসাব লিখে রাখতেন। আমি একটু বড় হওয়ার পর একদিন কেনাকোটার জন্য অন্য কেউ উপস্থিত না থাকায় আব্বা আমাকে সওদার ফর্দ দিয়ে বাজারে পাঠান। কেনাকাটা নিয়ে এসে আমি অন্যকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। রাতে আব্বা আমাকে ব্যয়ের হিসাব দিতে বললেন। আমি বললাম, সব টাকা খরচ হয়ে গেছে। কোনো পয়সা উদ্বৃত্ত নেই। জবাবে আব্বা বললেন, ‘খরচ হয়ে যাক। কিন্তু কোন খাতে কতো খরচ হলো সেটা তো বলবে।’ তখন আব্বার কথা মতো কোন খাতে কতো খরচ হয়েছে তা লেখে দিলাম। আব্বা সেটা সাথে সাথে তাঁর আয়-ব্যয়ের খাতায় তুলে নিলেন। খুব সামান্য পয়সা, এক পয়সা দু পয়সার হিসাবও সাথে সাথে লেখার অভ্যাস আব্বার ছিল। আব্বা যে দিন ইন্তেকাল করেন সে দিন ছিল শুক্রবার। আগের দিন বৃহস্পতিবার ছিল হাটবার। তাঁর ইন্তেকালের পর দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার দিনের খরচপাতির হিসাবও তাঁর খাতায় লেখা আছে।
গ্রামের ভেতর কয়েকটি খেলার মাঠ আছে এবং প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা নাম আছে। গ্রামের পশ্চিম অংশের বড় মাঠকে বড়গোল বলা হয়। দক্ষিণপাশে অবস্থিত বড় মাঠের নাম সাইয়াডুবি। পূর্বপ্রান্তে তিনটি মাঠ আছে, একটি আলিছারা, আরেকটি বড়দাড়া এবং তৃতীয়টি আমাদের বাড়ির পাশে বাঘ মারার বৈইঠ্যা। আমাদের এলাকায় ছোট মাঠকে বইঠ্যা বলা হয়। বাঘ মারার মাঠ হিসেবে নামকরন করার কারণ এখনো আমার কাছে রহস্যাবৃত্ত। এ সকল মাঠে হেমন্ত, শীত ও বসন্ত কালের বিকালে বড়রা বসে আড্ডা দেন এবং তরুণরা খেলাধূলা করে। সকাল বেলা এগুলোতে এলাকার সকল গৃহপালিত গরু জমায়েত করা হয়। যাদের গরু তারা পালা করে গরুগুলো দূরের মাঠে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যান। পালা করে গরু চরানোকে আমাদের এলাকায় ‘গরু-বারি’ বলা হয়। ঈদের দিন কোনো পরিবারের উপর গরু চরানোর পালা পড়লেও সে পরিবারকে এ দায়িত্ব পালন করার নিয়ম রয়েছে। এ থেকে ‘ঈদের দিন গরু-বারি’ প্রবাদটি চালু হয়েছে।

এক সময় আমি একাকী বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাই অথবা সাহস অর্জন করি। হতে পারে তখন আমি চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ি। সেটা কারো বাড়িতে নয়, আমাদের বাড়ির পাশের খেলার মাঠে, বাঘ মারার বৈঠ্যায়। শীতকালের বিকাল বেলা পাড়ার ছেলেরা সেখানে ফুটবল খেলতো। কখন কার সাথে প্রথম মাঠে খেলতে গিয়েছি সেটা মনে নেই। সেখানে গিয়ে দেখলাম যারা সেখানে আছে তারা সবাই আমার চেয়ে বড়। তাই সে সময় খেলার মাঠ আমাকে তেমন টানতে পারেনি। বাড়ির পাশে আরেকটি ছোট মাঠ ছিল, আমরা বলতাম চৌধুরী বাড়ির বৈঠ্যা। কয়েকদিন পর সেখানে দেখলাম আমি যাদের সাথে প্রাইমারী স্কুলে পড়ি তাদের কয়েকজন সেখানে খেলছে। তারা আমাকে তাদের সাথে খেলায় যোগ দিতে বলে। এরপর থেকে মাঝে মাঝে সেখানে যাওয়া শুরু করি। আমরা সেখানে বন্দি, ফুটবল, হাডুডু ইত্যাদি খেলতাম। কোনো সময় আমাদের মধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতাও হতো। ছোটবেলা আমার শরীর খুব হালকা ছিল। আমি ভালো দৌড়তে পারতাম। ফুটবল খেলায় গোল কিপার হিসেবে আমি ভালো ছিলাম। বন্দি খেলায়ও আমি ভালো ছিলাম। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে আমি সহজে আটকাতে পারতাম, আর আমার শরীর খুব হালকা থাকায় আমাকে আটকানো সহজ ছিল না। (চলবে…)