পঙ্কজকুমার দেব, হাফলং: কোভিড পরিস্থিতির পর এই প্রথম মুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী। সোমবার সমগ্র দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জেলা সদর হাফলং ছাড়া জেলার অন্যত্র ক্রমে মাইবাং, হারাঙ্গাজাও, লাংটিং, হাতিখালি, উমরাংশুতে কবিগুরুর ১৬২তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত হয়।
শৈল শহর হাফলঙে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সন্মেলন হাফলং শাখা এবং হাফলং মিউজিক কলেজের যৌথ ব্যবস্থাপনায় মিউজিক কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় কবি প্রণাম। এদিন মিউজিক কলেজের কনফারেন্স হলে দীর্ঘ দুই বছরের বিরতির পর কবির গানে মুখরিত হয়ে ওঠে সামগ্রিক পরিবেশ।বিকেল পাঁচটায় বিশ্বকবির প্রতিকৃতির সম্মুখে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন তথা পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন আয়োজক সমিতি নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সন্মেলনের সভাপতি অধ্যাপক শ্যামানন্দ চৌধুরী এবং মিউজিক কলেজের কর্নধার তথা অধ্যক্ষা মঞ্জুশ্রী দে।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সম্মানীয় অতিথি হাফলং গভর্ণমেন্ট কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শাকিল আহমেদ, নিখিল বঙ্গের উপ সভাপতিদ্বয় ক্রমে বিক্রমজিত চৌধুরী, পঙ্কজকুমার দেব, বিশিষ্ট সাংবাদিক অনুপ বিশ্বাস,শাখা কর্মাধ্যক্ষ রজতকান্তি নাথ প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন শাখা কর্মাধ্যক্ষ রজতকান্তি নাথ। তিনি বলেন আমরা এক কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে আজ স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছি। তাই সম্ভব হয়েছে মুক্তভাবে কবি প্রণামের আয়োজন। তিনি বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিশ্বকবির উদার চিন্তা ভাবনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। বলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ সব জাতি জনগোষ্ঠী, ভিন্ন ভাষাভাষী, ধর্মাবলম্বী নির্বিশেষে এক মহান ভারত গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
এরপর বক্তব্য রাখেন শাখা সভাপতি অধ্যাপক শ্যামানন্দ চৌধুরী। তিনি কবির দীর্ঘ কর্মজীবনে আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন ‘ এশিয়া মহাদেশে প্রথম নোবেল পুরস্কার পাওয়া ব্যক্তি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যার একশো বছর আগের রচিত গান কবিতা নাটকের আজকের সমাজজীবনে সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। বক্তব্য রাখেন হাফলং গভর্ণমেন্ট কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শাকিল আহমেদ। এরপর কবিতা পাঠ করে শোনান শাখার উপ সভাপতি কবি বিক্রমজিৎ চৌধুরী। স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনান লোয়ার হাফলং হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক নারায়ণ চক্রবর্তী।মিউজিক কলেজের ছাত্রীদের দ্বারা পরিবেশিত ‘ হে নূতন ‘ সমবেত সঙ্গীতাঞ্জলির মধ্য দিয়ে এদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুভারম্ভ হয়। এরপর একক নৃত্য তথা সমবেত নৃত্যের পাশাপাশি আবৃত্তি পাঠে গোটা অনুষ্ঠান আলাদা প্রাণ পায়। আসলে কোভিড অতিমারি নাগরিক জীবনকে বিধ্বস্ত করে তুলেছিল। মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়েছিল।
আর তাই গত দুই বছর কবি প্রণাম ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এবার মুক্ত আকাশের নীচে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান বিশেষ পার্বত্য বেশ সাড়া মিলেছে। হাফলঙে রাত আটটায় শেষ হওয়ার অনুষ্ঠান ন’টা পর্যন্ত গড়ায়। হল ভর্তি দর্শকরা অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। এমনকি যতই রাত গড়িয়েছে ততই ভিড় বাড়তে থাকে। এতে স্থানীয় শিশু শিল্পীরা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পেরে বেশ উৎসাহিত পরিলক্ষিত হয়।পার্বত্য জেলার একটি ছোট্ট মফস্বল শহর হারাঙ্গাজাও, শান্তি সহাবস্থানের এই শহরে রয়েছে একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল।প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও হারাঙ্গাজাওয়ের একাংশ সংস্কৃতিমনস্কদের উদ্যোগে কবিপ্রণাম তথা ১৬২তম রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন করা হয় হারাঙ্গাজাও রাধামাধব ঠাকুরবাড়ি প্রাঙ্গনে।
অনুষ্ঠানে মূখ্য অতিথিরূপে উপস্থিত ছিলেন হারাঙ্গাজাওয়ে মৌজাদার অতুল ডাওলাগুপু। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন হারাঙ্গাজাও বিজেপি মন্ডল সভাপতি আর রাঙ্খল, বিশিষ্ট মৃৎ শিল্পী প্রদেশ ভট্টাচার্য এবং অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। কচিকাঁচাদের অঙ্কন প্রতিযোগিতা দিয়ে বিকেল বেলা অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সন্ধ্যা ছয়টায় মূখ্য অতিথির প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও কবি প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ দিয়ে কবিপ্রণাম অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। উদ্ধোধনী সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করে নীহারিকা ঘোষ ও তার দল। শিশু বেদান্তিকা নাথ ললিত ভাষায় সংক্ষেপে রবীন্দ্রজীবনী উপস্থাপন করে।
অনুষ্ঠানে শিশুশিক্ষায় রবীন্দ্রভাবনা নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন কবি সাহিত্যিক তথা শিক্ষাবিদ পঙ্কজকান্তি মালাকার। তারপর অঙ্কন প্রতিযোগিতা বিজয়ীদের হাতে অতিথিদের দ্বারা পুরস্কার দিয়ে তাদের উৎসাহিত করা হয়।বিভিন্ন রবীন্দ্ররচনার আবৃত্তি গান নৃত্যে নাট্যে কবিঅর্ঘ্য প্রদান করা হয়। কচিকাঁচাদের বিপুল অংশগ্রহণ ছিল।অনুষ্ঠানটি শুধু শিশুশিল্পীদের উপস্থাপন ছিল,প্রত্যেকটি উপস্থাপন ছিল মনোমুগ্ধকর।দুই বছরের শিশু কৃষ্ণেন্দু মালাকারের আবৃত্তি ‘আমাদের ছোট নদী’ সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে।সবার শেষে শিশুশিল্পীদের দ্বারা অভিনীত হয় ‘বিজয়িনী’ নৃত্যনাট্যের মাধ্যমে এদিনের কবি প্রণামের পরিসমাপ্তি হয়। নাতিশীতোষ্ণ গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় কচিকাঁচাদের নিয়ে এই সুন্দর মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন পঙ্কজ কান্তি মালাকার। অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তারা হলেন স্বাতী লাংথাসা, বিশাল বিশ্বাস,বেবি চক্রবর্তী,রুমা নাথ প্রমূ্খেরা।

