দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃত ইতালিয়ান সৈনিকদের দেহাবশেষ অ্যালবেনিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এক জেনারেলের সংগ্রাম নিয়ে লেখা এক অখ্যাত আলবেনিয়ান লেখকের উপন্যাস The General of the Dead Army ১৯৭০ সালে প্যারিসের সাহিত্য-আকাশে বজ্রের মত আঘাত করেছিলো। বর্তমানে বিশ্ব-সাহিত্যকে নেতৃত্বদানকারী জীবিত সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম এই অ্যালবেনিয়ান কবি এবং কথাসাহিত্যিক ইসমাইল কাদারে সম্ভবত অ্যালবেনিয়ায় জন্ম নেয়া সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক। ডাকবিভাগে কর্মরত পিতার সন্তান কাদারে অ্যালবেনিয়ার জিরোকাস্তার শহরে ১৯৩৬ সালের ২৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহন করেন। তিনি তিরানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন এবং পরবর্তীতে মস্কোর গোর্কি ইন্সটিটিউটে বিশ্ব সাহিত্যের উপর অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে দেশে ফিরে তিনি সংবাদকর্মী হিসাবে কাজ করতে থাকেন এবং পাশাপাশি লেখালেখি চালিয়ে যান। অ্যালবেনিয়াতে তিনি প্রথম দিকে কবি হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেন কিন্তু পরবর্তিতে তাঁর গদ্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়। অ্যালবেনিয়ার কমিউনিস্ট স্বৈরশাসক এনভার হোজ্জার বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল প্রতীকি লেখার মাধ্যমে ক্রমাগত সমালোচনা করে গেছেন এবং ১৯৯০ সালে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়ে ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। কাদারে ২০০৫ সালে প্রথম ম্যান বুকার পুরষ্কার পান এবং বহুদিন ধরে সাহিত্যে নোবেলের জন্য মনোনয়ন পেয়ে যাচ্ছেন। ১৯৯৬ সালে তাঁকে ফরাসী একাডেমী সদস্যপদ প্রদান করেন এবং ফরাসী সরকার লেজিয়ন অব অনার করেন। মস্কোতে থাকাকালীন ১৯৫৭ সালে তিনি তাঁর প্রথম কবিতার বই “ ড্রিমস” লিখেন। তারপর থেকে তাঁর অনেক কবিতার সঙ্কলন বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
নীচে ইসমাইল কাদারের কয়েকটি কবিতার ভাবানুবাদ দেয়া হলো, সবগুলো রবার্ট এলসি’র ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।)
ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা: সাইফুল ভুঁইয়া
কবিতা
কিভাবে খুঁজে পেলে আমার পথ?
ভালো আলবেনিয়ান জানতো না মা
অ্যারাগনের মতো লিখে যেতো যতিচিহ্নহীন
যৌবনে বাবা চলে গেছে সমুদ্রে
কিন্তু তুমি এলে হাঁটতে হাঁটতে
শহরের শান্ত পাথুরে ফুটপাথ ধরে
আর ত্রস্ত হাতে কড়া নাড়লে
তিনতলার ষোল নম্বর ফ্ল্যাটে।
জীবনে বহু কিছু ভালবেসেছি, ঘৃণা করেছি
বহু সমস্যায় ‘উন্মুক্ত নগরে’
কিন্তু যেভাবেই হোক…
যেনো মাঝরাতে বাড়ি ফিরেছে এক তরুণ
নৈশ-বিচরণ শেষে শ্রান্ত আর ভগ্ন দেহে
এখানে আমিও এসেছি ফিরে
সর্বস্বান্ত আরো একবার পলায়ন শেষে।
আর তুমি
নিজের প্রতি আমার বিশ্বাসঘাতকতাকে
না ছুঁয়ে
আলতো ছুঁয়েছো আমার মাথার চুল
আমার শেষ বিরতি
কবিতা।
শৈশব
আমার শৈশব
কালি-মাখা আঙুল
সকালের ঘন্টা
মাগরিবের আজান
জমানো সিগারেটের বক্স
আর পুরনো ডাকটিকেট
একটিতে সিংহল
দুটিতে লুগ্জেমবার্গ।।
এভাবে পেরিয়েছে
শৈশবের দিন
একটি ন্যাকড়ার বলের পেছনে
ধুলো আর কান্না নিয়ে।
ধূসর আলবেনিয়ান
ছেঁড়া ন্যাকড়ার বল।
আর যখন আমার স্মৃতি
আর যখন আমার বিবর্ণ স্মৃতি
শেষরাতের ট্রামের মতো
শুধু মেইন ষ্টেশনে দাঁড়াবে
ভুলতে পারবো না তোমাকে।
মনে পড়ে যাবে
তোমার চোখের সেই অনন্ত শান্ত বিকেল
আমার কাঁধের উপর দম-বন্ধ বিলাপ
যেনো শক্ত হয়ে জমে থাকা তুষার।
এলো বিচ্ছেদের সেই মুহূর্ত
আর আমরা চলে গেছি বহুদূরে।
কোনকিছুই অস্বাভাবিক ছিলো না
কিন্তু কোন কোন রাতে
একজনের আঙুল বিলি কাটবে তোমার চুলে;
আর বহুদূরে আমার আঙুলগুলো কাঁদবে ব্যথায়।
জলপ্রপাত
নেমে আসে দলে দলে জলপ্রপাত
যেনো টগবগে শাদা ঘোড়ার পাল
কেশরে ফেনা আর রংধনুর ছটা।
কিন্তু হঠাৎ গিরিখাতের ধারে
যেনো পড়ে গেছে সম্মুখ পা ভেঙে
আহ, ভেঙে গেছে তাদের সাদা পাগুলো।
আর মরে গেছে পাহাড়ের কোলে।
এখন তাদের প্রাণহীন চোখে
জমাট আকাশ ভাসে।
পাহাড়ের ভাবনা
(এক)
মহাসড়কের ওপাড়ের সূর্য ডুবে গেলে
উঁচু পাহাড়গুলো কী ভাবে?
রাত্রি নামলে বেরিয়ে পড়ে এক পাহাড়িয়া লোক
জমিনে পড়ে তাঁর লম্বা রাইফেলের
একশত মাইল দীর্ঘ ছায়া।
পাহাড়, জমিন আর গ্রাম পেরিয়ে
ব্যস্ত হয়ে ছোটে রাইফেলের ছায়া
তার নলের ছায়া দ্রুত ঢুকে পড়ে গোধুলির ভেতরে।
আমিও নেমে পড়ি পথে পাহাড়ের গায়ে
এক অজানা ভাবনায়।
ভাবনার ছায়া আর রাইফেলের ছায়া
নিজেদের পেরিয়ে গোধূলিতে খায় ধাক্কা।
(চার)
তোমার কাঁধ থেকে
কখনো নামেনি লম্বা রাইফেল।
ঘায়ে ঢাকা তোমার কাঁধ থেকে
ত্বক আর হাড়ের কাঁধ থেকে।
লবন-জলে ভিজিয়ে খেয়েছো রুটি
প্রতি রাতে ভূট্টা আর লবনজলে
জমিয়ে রেখেছিলে কিছুটা চর্বি
আহ্ সেই সামান্য চর্বি
কিছুটা বন্ধুর জন্যা
কিছুটা লম্বা রাইফেলের জন্য,
লম্বা রাইফেলে মাখানোর জন্য।
নারী জন্ম দেয় শিশু
কিন্তু এক লম্বা রাইফেল জন্ম দেয় ছোট বুলেট
আলবেনিয়ানদের কাছে দুটোই একই রকম পবিত্র:
শিশু আর বুলেট।
শিশুরা ধরবে ভবিষ্যতের লাঙল
রাইফেল রাতে বাঁচাবে তাদের
আলবেনিয়ার ঘাড়ে সময় ফোটাবে গুলি
যেনো নববধূকে ধান-দূর্বায় বরণ।
(পাঁচ)
ঘন্টার উচ্চনাদ
বেজে উঠে রাতে
ফিরে আসে প্রতিধ্বনি পাহাড়ের ঢালে।
কোন কথা বলছে ঘন্টা
অস্ফুট অচেনা কন্ঠে
বলছে কী পুরোহিত
সুউচ্চ গীর্জায়?
সুদীর্ঘ বাক্যে, ল্যাটিন যুক্তি
লম্বা রাইফেল ভেঙ্গে দেয়ার সংগ্রাম।