লণ্ডন, ০৪ জুন: ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার চিকিৎসার কথা বলে ভারত গিয়েছিলেন। গত ১৩ মে দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভাড়া করা গাড়িতে ওঠেন আজিম। তারপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এরপর থেকেই মূলত নিখোঁজ এই বিনা ভোটের এমপি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর উদ্ধার হয়নি তার মরদেহ।
কলকাতার নিউটাউন এলাকার সঞ্জিভা গার্ডেনে তাকে হত্যা করা হয় বলে ধারণা করা হয়। এ ঘটনায় দুজনকে আটকও করা হয়। কিন্তু মরদেহ উদ্ধার না হওয়ায় রহস্য দেখা দিয়েছে তার মৃত্যু ঘিরে। উঠছে নানা প্রশ্নও। ২২ মে কলকাতায় সাঞ্জিভা গার্ডেন্সে ভারতের সিআইডি আনুষ্ঠানিকভাবে এমপি আনারকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করে। এরপর ২৮ মে ওই ফ্ল্যাটের সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে চার কেজির মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাংস ও হাড়ের গুড়ো এবং চুল উদ্ধার হওয়ার একটা ভিডিও ক্লিপ গণমাধ্যমের সামনে আনা হয়। মাংস উদ্ধারের কথা সিআইডি-ডিবি আনুষ্ঠানিকভাবে জানালেও ওই মাংস যে এমপি আনারেরর সেটা ফরেনসিক না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করেনি কেউ।
কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ারুল আজিম আনার ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টানা তিনবার আওয়ামী লীগ থেকে বিনা ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এক সময়ের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ করতেন আনার। অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য পাচারের হোতা হিসেবেও পুলিশের খাতায় নাম ছিল তার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও চরমপন্থিদের গডফাদার হিসেবে পরিচিতি পান। আনারের বিরুদ্ধে অস্ত্র, বিস্ফোরক, মাদকদ্রব্য ও স্বর্ণ চোরাচালান, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এবং চরমপন্থিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে ৯টির বেশি মামলা ছিল। ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড আসামি হিসেবে পুলিশ একবার তাকে আটক করলেও তার ক্যাডাররা পুলিশের ওপর আক্রমণ করে তাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যৌথ বাহিনীর অপারেশনের সময় আত্মগোপনে ছিলেন আনার।
ঝিনাইদহে তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীরা বলছেন, ১৯৮৬ সালের দিকে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালে আনার মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। ভারতের বাগদা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের বাঘাভাঙ্গা সীমান্ত পথে চোরাচালান করতেন তিনি। ওই সময় কালীগঞ্জ থানাসহ মহেশপুর, কোটচাঁদপুর ও চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থানা পুলিশের সঙ্গে মাসিক চুক্তিতে ‘টোকেন’ তৈরি করে তার বাহিনী। ওই টোকেন দেখালেই প্রশাসনের লোকজন মাদকদ্রব্য বহনকারী গাড়ি ছেড়ে দিত। এই টোকেন বাণিজ্য থেকে আনার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ‘মাদক সম্রাট’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এই মাদক কারবারের মাধ্যমে বিপুল অর্থবিত্তের মালিকও বনে যান। ১৯৯১ সালে আনার ঝিনাইদহের আরেক চোরাকারবারি পরিতোষ ঠাকুরের সঙ্গে মিলে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। স্বর্ণের বড় বড় চালান রাজধানী থেকে বাঘাডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী দেশে পাচার করতেন তারা। ১৯৯৬ সালে আনার বিএনপি থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগ দেন। মাদক ও স্বর্ণ চোরাচালানের কারবারের সঙ্গে কালীগঞ্জ পৌরসভার এক কমিশনারের হাত ধরে অস্ত্র চোরাকারবারে জড়ান তিনি। তার অবৈধ অস্ত্রের চালান চরমপন্থি ক্যাডার সামসেল ওরফে রবিনের কাছে বিক্রি হতো। কথিত আছে, সরকারের পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রকাশ ভারতে আত্মগোপন করার পর তার মাধ্যমে অস্ত্র চোরাকারবার চালিয়ে যান আনার। বাগদা এলাকার মাদক সম্রাট জয়ন্ত কুমার, কার্তিক, গৌতম সাহা ও বনগাঁর দেবদাসের সঙ্গে আনারের মাদকের কারবার ছিল।
সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে চুয়াডাঙ্গার লোকনাথপুর এলাকা থেকে ১২ কেজি ৯৫০ গ্রাম স্বর্ণ আটক করে তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর। চোরাকারবারিরা নিশ্চিত হয় যে, দর্শনা শ্যামপুরের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম স্বর্ণগুলো ধরিয়ে দিয়েছে। ওই ঘটনায় টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন সাইফুল। তিনি নিজেও স্বর্ণ চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেটে যুক্ত ছিলেন। ওই হত্যা মামলায় আনারসহ আসামি করা হয় ২৫ জনকে। কুষ্টিয়ার চরমপন্থি নেতা মুকুল, শাহীন রুমী, ঝিনাইদহের চোরাকারবারি পরিতোষ ঠাকুর, আনারসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে পরের বছর আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০১২ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিতোষ, আনারসহ বেশ কয়েকজন মামলা থেকে অব্যাহতি পান। এ মামলায় আনারকে গ্রেপ্তারে ২০০৯ সালে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছিলেন চুয়াডাঙ্গার বিশেষ আদালত। এর দশ দিন পর ওই বছরের ২১ জানুয়ারি তাকে গ্রেপ্তারের জন্য নিশ্চিন্তপুর গ্রামে তার বাড়িতে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ধীরে ধীরে আনারের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো কমে যেতে শুরু করে। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হলে ক্ষমতার দাপটে বেশিরভাগ মামলা থেকে নিজেকে মুক্ত করেন আনার।
তদন্তকাজে নিয়োজিত বাংলাদেশ ও ভারতের পুলিশ সদস্যরা বলছেন, এখানে দুটি সমস্যা হলো খুনিরা আনোয়ারুল আজীমের দেহাবশেষ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। তারা খুনের আলামত মুছে ফেলতে মুম্বাই থেকে এক কসাইকে নিয়ে এসেছিল। পরে সেই কসাই এমপির লাশ টুকরা টুকরা করেছে, হাড় থেকে মাংস বের করে নিয়ে কিমা বানিয়ে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দিয়েছে। এ অবস্থায় লাশ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
গোয়েন্দা সংস্থাকে জনগণ নানান প্রশ্ন করছেন, এমপি আনারের ব্যবহৃত পাসপোর্ট, ঘড়ি, আংটি চশমাসহ অন্যান্য জিনিসপত্র এমনকি কথিত রক্তমাখা জামাপ্যান্ট ও ব্যাল্ট কোথায় গেল? এমপির ব্যবহৃত দুটো মোবাইলফোনের সর্বশেষ যেখানে অবস্থান দেখিয়েছিল, তার কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি কেন? খুনি জিহাদ মুম্বাইতে কসাইয়ের কাজ করতো বলে গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। তবে মুম্বাইয়ের কোথায় সে কসাইয়ের কাজ করতো, সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি কেউ। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। অথচ যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের গ্রেফতার করেছেন গোয়েন্দারা। কথিত মাংসপিণ্ড উদ্ধার হলেও, হত্যার কাজে ব্যবহৃত অস্ত্র এখনো কেন উদ্ধার হয়নি? একজন নির্বাচিত এমপি খুন হলেন বিদেশি গিয়ে, খুন হওয়ার পর তার পরিবারের কেউ ভিসা পাচ্ছেন না কেন? বেশ কিছু ফেসবুক আইডি এবং পেজ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের সমর্থন করে প্রচার প্রকার করা হচ্ছে প্রশাসন এদিকে কেন নজর দিচ্ছে না? যে সেপটিক ট্যাংকি থেকে সাড়ে চার কেজি মাংস উদ্ধার করা হলো, যদি ১৩ মে এমপি আনার খুন হয়েই থাকেন তবে সেই মাংসগুলো সেপটিক ট্যাংকের নোংরা-ময়লার মধ্যে মিশে যাওয়ার কথা সেগুলো একসঙ্গে কী করে উদ্ধার হল? এসব প্রশ্নের সুষ্ঠু জবাবেব আশায় এমপি আনারের এলাকাবাসী বিভিন্ন কর্মসূয়চি পালন করে আসছেন।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন,‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধের প্রচারণা যখন জোরালো হচ্ছে। ভারতীয় পণ্য বর্জন আন্দোলন যখন ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা যখন জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং বিভিন্ন দেশে ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও করছেন। তখন সেদিক থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেই ভারত সরকার ও বাংলাদেশে তাদের তাবেদার আওয়ামী লীগ সরকার যৌথভাবে এই নাটক সাজিয়েছে।’

