অমর সাহা, কলকাতা: কলকাতার শতবর্ষের ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে আজও কলকাতা শহরে টিকে আছে ট্রাম। শুধু ট্রাম নয়, টিকে আছে আরেক শতবর্ষের ঐতিহ্য হাতেটানা রিকশাও। এক দশকের বেশি সময় আগে ৩৭টি ট্রাম রুট ছিল কলকাতায়। এখন আর মাত্র একটি রুট টিকে আছে।
কলকাতায় প্রথম ট্রাম চালানো হয় ১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। সেদিনের ট্রাম ছিল ঘোড়ায় টানা ট্রাম। প্রথম চালু করা হয়েছিল কলকাতার শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়া ঘাট পর্যন্ত। দূরত্ব ছিল ৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার। এই ট্রাম চলার মাঝেই কলকাতা ট্রামওয়ে কোম্পানি লিমিটেড গঠিত হয়। এই কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন হয় লন্ডনে। তারপর ১৮৮০ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে নতুন রূপে আবার ট্রাম চালু হয়। তখন এই ট্রাম চালু হয় ছোট্ট একটি বগি নিয়ে। আর তা টেনে নিত দুটি ঘোড়া। এখন সেই ট্রাম হয়েছে আধুনিক। চলছে একসঙ্গে দুটি বড় বগি নিয়ে, বিদ্যুতে। যদিও কলকাতার ট্রাম প্রথম বিদ্যুতে চলাচল শুরু করে ১৯০২ সালের ২৭ মার্চ থেকে। সেই ট্রাম চলাচল শুরু করেছিল ধর্মতলা থেকে খিদিরপুর পর্যন্ত। এরপর ১৯০৩ সাল থেকে চালু হয় ধর্মতলা থেকে টালিগঞ্জ পর্যন্ত।
একই বছর আরও চালু হয় ধর্মতলা থেকে বেলগাছিয়া ও শিয়ালদহের মধ্যেও। ১৯০৫ সালে চালু হয় ধর্মতলা থেকে কলেজ স্ট্রিট পর্যন্ত। ইতিহাস বলছে, ২০১১ সালে কলকাতায় ট্রামরুট ছিল ৩৭টি। আর ট্রামের সংখ্যা ছিল ১৮০ থেকে ১৮৫টি। তখন ট্রামলাইনের দৈর্ঘ্য ছিল ৬১ কিলোমিটার। প্রতিদিন যাত্রীসংখ্যা ছিল ৭০ থেকে ৭৫ হাজার।
২০১৭ সালে এসে ট্রামরুট কমে দাঁড়ায় ১৫টিতে। ট্রামের সংখ্যা কমে হয় ৬৫ থেকে ৭০টি। আর ট্রামলাইনের দৈর্ঘ্য কমে দাঁড়ায় ২২ কিলোমিটারে। যাত্রীসংখ্যা গিয়ে ঠেকে ২০ থেকে ২১ হাজারে। এরপর ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোরেল চালুর জন্য বন্ধ করা হয় আরও দুটি রুট।
দিন দিন ক্ষীণ হতে থাকা অবস্থার মধ্যেও কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী ট্রামে চলার জন্য বিদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ছুটে আসেন পর্যটকেরা। অনুভব করতে চান ট্রামে চলার আনন্দ। সেই লক্ষ্যে কয়েকটি ট্রামকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে।
সেকাল থেকে একালেও ট্রামের গতি ছিল বা এখনো রয়েছে। তাই অনেকেই ট্রামে চড়তে আনন্দ পান বেশি। কলকাতায় এসে বহু পর্যটক এখনো ট্রামের খোঁজ করেন।
ট্রাম কোম্পানি ট্রাম বদল করে এখন অনেক রুটে চালু করেছে বাস চলাচলও। এর মধ্যেও টিমটিম করে চলছিল কলকাতার শ্যামবাজার-ধর্মতলা, গড়িয়াহাট-ধর্মতলা এবং টালিগঞ্জ-বালিগঞ্জ এই তিন রুটে। কিন্তু ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর লাইন নির্মাণের জন্য কয়েক মাসের জন্য বন্ধ করা হয়েছে শ্যামবাজার-ধর্মতলা ও গড়িয়াহাট ধর্মতলা রুটটি। তবে চালু রয়েছে একমাত্র টালিগঞ্জ-বালিগঞ্জ রুটটি।
ট্রামের গতি ধীর হলেও এর একটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি দূষণহীন একটি গণপরিবহন। তাই নতুন করে দাবি উঠেছে কলকাতার এই ঐতিহ্যকে মুছে না দেওয়ার। অনেকে বলছেন, পুরোনো কলকাতায় এখন রাস্তাঘাট সংকীর্ণ থাকায় ট্রামের কারণে যানজট তৈরি হয়। কলকাতার রাজারহাটের নিউ টাউনের বহু সড়ক এখন সুবিস্তৃত। তাই সেখানকার বিভিন্ন রাস্তার এক পাশ দিয়ে কলকাতার এই ঐতিহ্য ট্রামকে টিকিয়ে রাখার জন্য চালু করা হোক ট্রাম।

