পাঁচগ্রাম (অসম): কেবল বাঁশ ও কয়লার যোগান দিয়ে কয়েক হাজার কোটি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বরাকের একমাত্র শিল্প প্রতিষ্ঠান পাঁচগ্রামের হিন্দুস্থান পেপার মিল থেকে। এভাবে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে এক শিল্প প্রতিষ্ঠানকে। হিন্দু্স্থান পেপার কর্পোরেশন (এইচপিসি)-এর কাছাড় কাগজ কলের উপর প্রায় তেত্রিশ হাজারের বেশি পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই কাগজ কলটি। এবার পেপার মিলের বিপর্যস্ত অবস্থা নিয়ে সরব হলেন মিলের জন্মলগ্ন থেকেই বিভিন্ন আন্দোলনে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত অন্যতম ব্যক্তিত্ব কাটিগড়ার প্রবীণ সমাজসেবী নবেন্দুশেখর নাথ।
বরাকের একমাত্র বড়মাপের শিল্প প্রতিষ্ঠান কাছাড় পেপার মিল বিগত ২০১৫ সালের অক্টোবর মাস থেকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩৩ হাজার পরিবারের লোকজন দৈনন্দিন জীবনে চরম সঙ্কটজনক পরিস্থিতির মোকাবিলা করছেন। তাই বরাক উপত্যকার সামগ্রিক স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্তান পেপার মিলের আওতাধীন পাঁচগ্রামের কাছাড় পেপার মিল পুনরায় চালু করার দাবি জানিয়েছেন কাটিগড়া ডেভেলপমেন্ট কমিটির সভাপতি নবেন্দুশেখর নাথ। তিনি এ মর্মে বরাক তথা দক্ষিণ অসমের জনগণের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ভারী শিল্পমন্ত্রী ও অসমের মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে মঙ্গলবার কাটিগড়া মহকুমা আধিকারিক তথা সার্কল অফিসার প্রাণজিত্ দেবের কাছে পৃথক পৃথক স্মারকপত্র প্রদান করেছেন।
স্মারকপত্রে নবেন্দুবাবু উপত্যকাবাসীর স্বার্থে পাঁচগ্রাম পেপার মিল পুনরায় চালু করার জোরালো দাবি জানানোর পাশাপাশি পেপার মিলের বর্তমান করুণ পরিণতির জন্য ব্যাপক দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন। বিশেষ করে বাঁশ ও কয়লা যোগানের নামে কোটি কোটি টাকার ভুয়ো বিলের মাধ্যমে পেপার মিলকে ধ্বংস করা হয়েছে। তাই পেপারমিলে বাঁশ ও কয়লা যোগান সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সংগঠিত লাগামহীন কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্তের মাধ্যমে কঠোররতর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সমাজসেবী তথা কাটিগড়া ডেভেলপমেন্ট কমিটির সভাপতি নবেন্দু শেখর নাথ।
নবেন্দু নাথ স্মারকপত্রে পাঁচগ্রাম পেপার মিল স্থাপনের কিছু প্রাসঙ্গিক ঘটনা তুলে ধরেছেন। লিখেছেন, মিলের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে বিস্তর সমস্যার মোকাবিলা করেছেন উপত্যকার জনগণ। নবেন্দুবাবু বলেন, তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালে তুষ্ণিয়াল পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য লাগাতার আন্দোলন করা হয়েছিল। এক সময় আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২,২৮৭ বিঘা ১০ ছটাক জমি তাদের কবজা থেকে উদ্ধার করে পেপার মিলকে সমৃদ্ধ করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন আন্দোলনকারী জনতা। জমির মালিক তুষ্ণিয়াল পরিবার অবশ্য ৪,৮৫,১১০ টাকা ৫২ পয়সা পেয়েছিলেন বলে স্মারকপত্রে উল্লেখ করেছেন নবেন্দু শেখর। এছাড়া নবেন্দুবাবুর নেতৃত্বে বিএসএফের ৮২ ব্যাটালিয়নের কমান্ডেন্ট আরসি নাটারিয়ারের উপর চাপ সৃষ্টি করে পাঁচগ্রাম থেকে আরও ২৮৬ বিঘা জমি পেপার মিলের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এছাড়া পাঁচগ্রাম পেপার মিলের সূচনলগ্নে তত্কালীন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী টিআর পাই এবং পাটনায় কদমকুয়াতে লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণের সঙ্গে ১৯৭৭ সালে দফায় দফায় সাক্ষাত্ করেছেন নবেন্দু শেখর নাথরা।
লাগাতার আন্দোলন ও দৌঁড়ঝাপ করার ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই উপত্যকার গুরুত্বপূর্ণ পেপার মিলটি বর্তমানে বন্ধ হয়ে পড়ায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নবেন্দু শেখর নাথ। এই পেপার মিলের উপর নির্ভরশীল কর্মচারীরা আজ তাঁদের পরিবারের লোকজনদের নিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বহু সংখ্যক কর্মচারীর ইতিমধ্যে অনাহার অর্ধাহারে বিনা চিকিত্সায় করুণ মৃত্যু ঘটেছে। বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে বরাক উপত্যকার সর্বশ্রেণির মানুষের কল্যাণার্থে পুনরায় পাঁচগ্রাম পেপার মিল চালু করার জরালো দাবিতে ফের বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্য জনগণের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন কাটিগড়া ডেভেলপমেন্ট কমিটির সভাপতি নবেন্দু।
তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, গণআন্দোলন ছাড়া মৃতপ্রায় পাঁচগ্রাম পেপার মিলকে উজ্জীবিত করা সম্ভবপর নয়। এছাড়া বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক নেতারা রহস্যজনক কারণে গুরুত্বপূর্ণ পেপার মিল নিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। তাই তিনি নেতাদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন। সূত্র: বিশু / এসকেডি / অরবিন্দ

