শিরোনাম
বুধ. মার্চ ১১, ২০২৬

কেনাকাটায় পরামর্শকের বেতন ৩.৬ লাখ টাকা!

কারিগরি হোক বা পূর্ত কাজের হোক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে পরামর্শক যেন বাধ্যতামূলক। মনে হচ্ছে কেনাকাটা করার মতোও অভিজ্ঞ নন এ দেশের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা। প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণ প্রকল্পের কেনাকাটার জন্যও পরামর্শককে মাসে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা করে সম্মানী ধরা হয়েছে। পুরো প্রকল্প মেয়াদে তাকে দিতে হবে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা। আর জমি নির্বাচন না করেই জমির খরচ প্রাক্কলনও করা হয়েছে। কেনাকাটার ক্ষেত্রে প্রতিটি টিভি এক লাখ ৮০ হাজার টাকা, ফটোকপিয়ার প্রতিটি প্রায় পাঁচ লাখ টাকা, সাউন্ড সিস্টেম প্রতিটি ১৭ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। আর এসবের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ১৮টি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এটিআই) আছে। যেখানে তিন হাজার ৩৮০ জন শিক্ষার্থীর ভর্তির সুযোগ রয়েছে। গড়ে প্রতি বছর দেড় হাজার শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা সনদ অর্জন করছে। ডিপ্লোমা কৃষি শিক্ষা শেষে বিভিন্ন সংস্থায় তারা চাকরিতে নিয়োজিত। সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে আরো ত্বরান্বিত করতে ডিপ্লোমা কৃষিবিদদের প্রয়োজন অনেক। কিন্তু সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার কাছে কোনো কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নেই। অন্য দিকে নেত্রকোনা জেলা ও এর পার্শ্ববর্তী কিশোরগঞ্জে ও ময়মনসিংহ জেলায়ও কোনো প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নেই। এ অবস্থায় জগন্নাথপুর ও মোহনগঞ্জ উপজেলায় দু’টি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। এই দু’টি প্রতিষ্ঠান স্থাপনে খরচ প্রস্তাব করা হয়েছে ২৮৮ কোটি ৬৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা। যা সরকারের রাজস্ব খাত থেকে বহন করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় কাজগুলো হলো, প্রতিটিতে শিক্ষা ও প্রশাসনিক ভবন, ২০০ ছাত্রের জন্য ছাত্রাবাস, ২০০ ছাত্রীর জন্য ছাত্রীনিবাস, অধ্যক্ষের জন্য ডুপ্লেক্স বাসভবন, কর্মকর্তাদের জন্য ডরমিটরি, কর্মচারীদের জন্য ডরমিটরি, অডিটোরিয়াম, অতিথিশালাসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ। এ ছাড়া অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ, এটিআই অফিসার ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

খরচের হিসাবের তথ্য থেকে দেখা যায়, দোতলা ভিতে ২৬০ বর্গমিটারের অধ্যক্ষ ভবন নির্মাণে ব্যয় এক কোটি ২০ লাখ টাকা। অতিথি ভবনের খরচই বেশি। প্রায় এক হাজার ৪৮৫ বর্গমিটারের তিনতলা ভিতে তিনতলা ভবন নির্মাণে খরচ হবে সাত কোটি চার লাখ টাকা। ২৩০.৪০ বর্গমিটারের মসজিদ নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে দুই কোটি ৮ লাখ টাকা।

জিনিসপত্র কেনার ক্ষেত্রে দরগুলোতে দেখা যায়, ডিজিটাল নোটিশ বোর্ড প্রতিটি তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা, ডিজিটাল ডিসপ্লেবোর্ড প্রতিটি চার লাখ ২০ হাজার টাকা, কনফারেন্স রুমের জন্য ডিজিটাল ইন্টারএক্টিভ সাউন্ড সিস্টেম প্রতিটি ১৭ লাখ টাকা, শ্রেণিকক্ষের জন্য ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম প্রতিটি ৬০ হাজার টাকা। প্রতিটি টেলিভিশন এক লাখ ৮০ হাজার টাকা দরে ১১টি কেনা হবে। যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এয়ারকুলার দুই লাখ ৮৮ হাজার টাকা করে ১০টি মোট ২৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ফটোকপিয়ার প্রতিটি চার লাখ ৯৮ হাজার টাকা দরে ৮টিতে মোট ৩৯ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। চারটি জাতীয় সেমিনার করতেই ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা।

পরামর্শকের দায়িত্ব হলো প্রকিউরমেন্ট কাজে প্রকল্প পরিচালককে সহায়তা করা, রিপোর্ট তৈরি এবং প্রকল্প পরিচালক নির্দেশিত অন্যান্য কাজ। আর এর জন্য প্রতি মাসে তাকে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা দিতে হবে। আর পুরো প্রকল্প মেয়াদকালে পাঁচ বছর তার পেছনে খরচ হবে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা। প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হলো নির্মাণধর্মী, যা গণপূর্ত অধিদফতর সম্পন্ন করবে। ফলে এখানে প্রকিউরমেন্ট পরামর্শকের প্রয়োজন রয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

প্রকল্পে ৮ ব্যাচ অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ, ৬৪ ব্যাচ এটিআই অফিসার, ১০০ ব্যাচ কৃষক প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। যার জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ১৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এটিআইগুলোতে কৃষি ডিপ্লোমা কোর্সে পরিকল্পনা করা হয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানে দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কৃষি ডিপ্লোমাধারী প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা হয়। এই ধরনের বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কৃষক, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অফিসারদের প্রশিক্ষণ প্রদান যৌক্তিক নয়।

এখানে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের দুই দিনের প্রশিক্ষণে প্রতিটি ব্যাচে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার টাকা হিসেবে ৮ ব্যাচে খরচ ৪১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এটিআইদের তিন দিন করে প্রতি ব্যাচে ছয় লাখ ৪১ হাজার টাকা হিসেবে ৬৪ ব্যাচে মোট চার কোটি ১০ লাখ ২৪ হাজার টাকা।

দু’টি ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ বা কেনার জন্য ৩২ কোটি ৩১ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এই জমি নির্বাচন সম্পন্ন ও মৌজার দর অনুযায়ী জমির মূল্য নির্ধারণ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমেই করতে হবে। কিন্তু জমি এখনো নির্বাচন না করে কিসের ভিত্তিতে ভূমি অধিগ্রহণ খাতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, ডিপিপিতে তা উল্লেখ করা হয়নি।

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব বলছেন, নির্মাণ ও পূর্ত খাতে প্রায় ২৭৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। যা মোট খরচের ৭০.৪১ শতাংশ। নির্মাণ কার্যক্রমগুলো গণপূর্ত অধিদফতর সম্পাদন করবে। প্রকল্পে সেসব জিনিসপত্র কেনা হবে তার যে দাম ধরা হয়েছে তা অতিরিক্ত। এসব দাম ও ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনতে এবং বাজারের সাথে মূল্যায়ন দেখাতে হবে। জনবল কমিটির সুপারিশের আলোকে জনবল নিয়োগ, যানবাহনের সংখ্যা ও ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে, যা করা হয়নি বলে কমিশনের অভিমত।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *