।। তাজ ইমান আহমদ ইবনে মুনির ।।
১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ চলছে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ব্যাপক গণহত্যায় লিপ্ত। লাখো কোটি জনগণ নির্যাতিত ও বাস্তুহারা। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার ভাষণে বললেন, ‘এই যুদ্ধ গণ যুদ্ধ। এই যুদ্ধ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের যুদ্ধ। শোষিত সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও তাদের সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে এই মুক্তিযুদ্ধ চলছে।’ তাজউদ্দীন আহমদের বক্তব্য হতে প্রতীয়মান হয়, তিনি অভিজাত ও সুবিধাভোগী শ্রেণির কিংবা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ রক্ষার কথা বলেননি। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যকে তিনি নির্দিষ্ট করেছিলেন সাধারণ জনগণের কল্যাণ ও মুক্তিতে।
সাম্য, সামাজিক ন্যায় বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ নামের এই রাষ্ট্রটি একদিন সৃষ্টি হয়েছিল। অথচ আমাদের গৌরবময় সেই মুক্তিযুদ্ধের অর্ধ শতাব্দী পরেও সাধারণ জনগণের জন্য সত্যিকারের মুক্তি আসেনি। তাদের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য কল্যাণ রাষ্ট্রও গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ একাধারে করোনা মহামারিতে জর্জরিত এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে খাদ্য সংকটে রয়েছেন। এর বিপরীতে, করোনাকালে আবার অতীতের চেয়েও বেশি কোটিপতি তৈরি হয়েছে। এই অবস্থাতো কোনো সুস্থ সমাজের চিত্র হতে পারে না।
বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার ভাষণে বললেন, ‘এই যুদ্ধ গণ যুদ্ধ। এই যুদ্ধ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের যুদ্ধ। শোষিত সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও তাদের সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে এই মুক্তিযুদ্ধ চলছে।’
এর জন্য রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিকে দোষারোপ করছেন। নয়তো ভান করছেন যেন কিছুই ভুল হয়নি। আবার যখন তারা বাজারের দরদামের কারসাজি সম্পর্কে সংবাদকর্মীদের মুখোমুখি হন, তখন তাদের নিজেদের অক্ষমতাকে ঢাকবার জন্য দোষারোপ করছেন ব্যবসায়ীদের অযৌক্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে। এই ব্যবসায়ীরা মুনাফার জন্য দেশবাসীর জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে।
এই বছরের শুরুর দিকে কয়েক মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে আইনতসম্মত বিক্ষোভে শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু নিত্যপণ্য মজুত করে যারা মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? সুবিধাভোগী শ্রেণি এবং দরিদ্রদের সঙ্গে এটা কি রাষ্ট্রের সমান আচরণ? সরকারি চাকুরেদের কর্তব্য হলো সাধারণ মানুষকে সেবা প্রদান করা। তাদের কল্যাণের অভিভাবক হওয়া। কিন্তু পদে পদে এর অন্যথা হচ্ছে। সে জন্যই আজও আমাদের এই সবুজ বাংলার বুকে রক্ত ঝরছেই।
এ গুলো নিছক কোনো দলীয় বিষয় নয়। এটি নীতিগত বিষয়। মুক্ত ব্যবসার নীতি লঙ্ঘন হবে বলে, আমরা ব্যবসায়ীদের আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বাজারকে কবজা করতে দিই। সম্প্রতি খবরে প্রকাশ পেল একজন মানুষ, ষাটের কাছাকাছি বয়সে এসে, আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন খাবার কিনে খাওয়ার মতো সামর্থ্য তার আর নেই। এই মানুষটির মৃত্যুর দায়ভার কি আমাদের সকলের ওপর বর্তায় না? আমরা কি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নিষ্ঠুর ব্যবহারে অভ্যস্ত হইনি? অন্যায়-অবিচারের এই নিষ্ঠুর সংস্কৃতিকে আমরা কি নিজ নিজ স্বার্থে জিইয়ে রাখিনি?
আমরা হাড়গোড় বের হওয়া গৃহকর্মীদের দেখেছি, যাদের নিয়োগকর্তারা তাদের কাছে খাবার রেশন হিসেবে বিতরণ করেন। যেন তারা একটি শ্রম শিবিরের অন্তর্ভুক্ত। কাজে সামান্য ত্রুটি হলে তাদেরকে দশ তালা থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। আমরা এ-ও অহরহ দেখছি যে উচ্চপদধারী ও সমাজ-রাষ্ট্রের বিশেষ সুবিধাভোগীরা নিম্ন আয়ের মানুষদের কেমন তাচ্ছিল্য করেন।
সমাজ এবং রাষ্ট্রের বিবেক ও কর্তব্যবোধ চ্যুতির এসব দৃষ্টান্ত করোনা মহামারির চেয়েও ভয়াবহ। টিকা প্রদান, ওষুধ-পথ্য, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মবদ্ধ জীবন-যাপনে করোনা একদিন দূর হয়ে যাবে। কিন্তু এই বিবেকের অসুখ প্রতিরোধের জন্য দরকার ভিন্ন ধরনের টিকা। প্রয়োজন ব্যক্তি ও জাতীয় চেতনার উন্মেষ। এর মাধ্যমে আইনের শাসনকে কাগজ-কলমের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিয়ে সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় কার্যকরী করা যায়। নতুবা সীমাহীন অপরাধ করেও একশ্রেণি পার পেয়ে যাবে অনায়াসে। আর বিনা অপরাধে জেল-জুলুম-মৃত্যুবরণ করে চলবে সাধারণ মানুষ। এমনটা চলতে থাকলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য অধরা স্বপ্নই থেকে যাবে।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তির এই সময়টা বড় মূল্যবান। এখন হৃদয় পুনরুজ্জীবনের সময়…সত্তার জাগরণের সময়। এখন নিজেদের অতীত হতে সঠিক শিক্ষা নিতে হবে। কিন্তু প্রথমে কুড়াল দিয়ে আমাদের সেই শিকড় কাটা বন্ধ করতে, যার সৃষ্টি হয়েছিল লাখো প্রাণের বিনিময়ে এবং নিপীড়িতদের জন্য।
তাজ ইমান আহাদ ইবনে মুনির বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নাতি এবং জাগরণ-এর প্রতিষ্ঠাতা

