শিরোনাম
শুক্র. জানু ২, ২০২৬

গার্ডিয়ানে উঠে এল বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের দুর্দশা

নাজমিন নাহার, বয়স ২৬। দু’সন্তানের মা এই নারী একজন গার্মেন্ট শ্রমিক। ঢাকায় থাকেন। এখন চলছেন ধারদেনা করা চালের ওপর। দু’মাসের বেশি সময় তিনি বেতন পান না। দিতে পারেন না ঘরভাড়া। কর্মঘণ্টা অনেক বেশি হলেও ম্যাগপাই নিটওয়্যারে কাজ করে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। বার্টন এবং এইচএন্ডএমের মতো বৃটিশ ব্রান্ডের পোশাক তৈরি করে মাসে আয় করতেন ১৫০ পাউন্ড।

মার্চের শেষের দিকে বাংলাদেশে লকডাউন দেওয়া হয়। বন্ধ হয়ে যায় তার কারখানা। ৪ এপ্রিল আবার খোলা হয়। কিন্তু নাজমিন নাহার গেলে তাকে বলা হয় কারখানায় কোনও কাজ নেই তার জন্য।

নাজমিন নাহার বলেন, কারখানা থেকে আমাদের বলা হয়েছে বিদেশি ক্রেতারা সব অর্ডার বাতিল করেছে। এজন্য কোনও কাজ নেই। দু’মাস ধরে আমরা বেতন পাচ্ছি না।

বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে লন্ডনের প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

ইংল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডজুড়ে ফ্যাশন আউটলেটগুলো যখন খুলছে, তখন বিশ্বের অন্যপ্রান্তে যেসব শ্রমিক এসব পোশাক সেলাই করে হ্যাঙ্গারে সাজিয়ে রাখেন, তারা হারাচ্ছেন কাজ। মুখোমুখি হচ্ছেন অনাহারের।

নাজমিন নাহার বলেন, আমার ঘরভাড়া বাকি পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব বাকিতে নিচ্ছি। কিন্তু এখন বাকি টাকা দিতে না পারার কারণে দোকানিরা আর বাকি দিতে চাইছেন না। পরে আমাদের বাড়িওয়ালা আমাদের জন্য এক বস্তা চালের ব্যবস্থা করেছেন, যাতে আমরা বেঁচে থাকতে পারি।

মার্চে কোভিড-১৯ মহামারী যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, দোকানপাট বন্ধ, সারাদেশ লকডাউনে, তখন ফ্যাশন ব্রান্ডগুলো কয়েকশ’ কোটি ডলারের অর্ডার বাতিল করে। এমনকি যেসব পোশাক বাক্সবন্দি করে শিপমেন্টের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, কারখানায় সেলাই চলছে, সেসব পোশাকেরও অর্ডার বাতিল হয়ে যায়।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স এক্সপোর্ট এসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) মতে, শুধু বাংলাদেশেই ফ্যাশন ব্রান্ডগুলো ৩ বিলিয়ন পাউন্ডের অর্ডার বাতিল করেছে। বিজিএমইএর প্রেসিডেন্ট রুবানা হক বলেছেন, গত মাসেই কমপক্ষে ২৫ হাজার গার্মেন্ট শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। যদি বিদেশিরা অর্ডার না নেয়, তাহলে পরবর্তী ৬ মাসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৫ লাখ।

ঢাকা থেকে প্রায় এক ঘণ্টার পথ। সেখানে আলটিমেট ফ্যাশন লিমিটেডে কাজ করেন রোজিনা বেগম। এই কারখানা থেকে পোশাক সরবরাহ দেওয়া হয় মাতালান এবং পশ্চিমা আরও কিছু ব্রান্ডের। রোজিনা তার আট বছরের ছেলেকে নিয়ে ঘরে খেলা করছিলেন। তিনিও চাকরি হারিয়েছেন। মাসে বেতন পেতেন ৮ হাজার টাকা। কোভিড-১৯ আঘাত করার পর তার কারখানায় ৩০০ কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়। তিনিও তাদের একজন। ট্রেড ইউনিয়ন দাবি করেছে, বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল করার জন্য তাদেরকে বরখাস্ত করতে হয়েছে বলে জানিয়েছে কারখানার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।

রোজিনা বেগম বলেন, যদি ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা বা ভয় না থাকতো তাহলে আমরা এর বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ করতে পারতাম। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে আমরা কর্মীদের একত্রিত করতে পারছি না, শক্তিশালী প্রতিবাদও করতে পারছি না। যখনই চার বা পাঁচজন শ্রমিক কারখানার সামনে জমায়েত হন, তখনই তারা আমাদেরকে তাড়িয়ে দেয়। এভাবে একা একা শক্তিশালী প্রতিবাদ গড়ে তোলা যায় না।

আরেকজন শ্রমিক আঁখি আখতার। গ্যাপ ব্রান্ডকে পোশাক সরবরাহকারী স্টার্লিং স্টাইল কারখানায় মাসে ৯ হাজার ৩০০ টাকা বেতনে কাজ করতেন তিনি। কোভিডের লক্ষণ নিয়ে তিনি অসুস্থ হওয়ার পর কারখানা থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়। এখন আরেকটা কাজ জুটিয়ে নেওয়া তার জন্য অসম্ভব। তিনিও বলেছেন, দু’মাস ধরে তার বেতন নেই। আঁখি বলেন, গ্রামে আমাদের কিছুই নেই। তাই গ্রামে ফিরে যেতে পারছি না। গ্রামে ফিরে কি করবো আমরা? আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস হল এই চাকরি। কারখানায় অর্ডার কমে গেছে। কারখানাগুলো শ্রমিকদের থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করছে। আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।

বাংলাদেশে এখন গার্মেন্ট কারখানাগুলো খুলছে। তা সত্ত্বেও অর্ডার শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ কমে গেছে। ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম পরিচালিত অনলাইন ট্র্যাকারের মতে, আর্কেডিয়া, প্রাইমার্ক এবং এডিনবার্গ উলেন মিলের মতো বৃটিশ খুচরা ব্রান্ডের মতো ব্রান্ডগুলো এখনও যেসব অর্ডার সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রোডাকশনে রয়েছে, তার পূর্ণ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ক্যাম্পেইনাররা বলছেন, এখন দোকানপাট খুলেছে। তাই সরবরাহকারীদের প্রতি আর্থিক মূল্য পরিশোধ করা ব্রান্ডগুলোর জন্য অত্যাবশ্যক। ক্লিন ক্লোথস ক্যাম্পেইনের একজন ক্যাম্পেইনার মেগ লুইস বলেছেন, গত সপ্তাহে আমরা ফ্যাশন স্টোরগুলোর বাইরে লম্বা লাইন দেখেছি ক্রেতাদের। এসব স্টোর সেইসব কোম্পানির, যারা তাদের শ্রমিকদের সবচেয়ে প্রয়োজনের সময় বঞ্চিত রেখেছে।

তিনি আরও বলেন, মহামারীতে ব্রান্ডগুলোর আচরণে শুধু তাদেরকে জবাবদিহিতায় আনাই যথেষ্ট নয়। কারখানাগুলোকে যেসব কাজের অর্ডার তারা দিয়েছে, তাতো কোনও দাতব্য কাজ নয়। লাখ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে তারা তাদের লভ্যাংশকে সুরক্ষিত করেছে।

এক বিবৃতিতে এইচএন্ডএম বলেছে, তারা ম্যাগপাই নিটওয়্যারের কোনও অর্ডার বাতিল করেনি। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, আমাদের তথ্যমতে, জাতীয় নীতির আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত সব শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।

গ্যাপ বলেছে, তারা সব ভেন্ডারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছ। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা অর্ডারের বিষয়ে তাদের প্রতিজনের সঙ্গে মিটিং করছে এবং সামনের মাসগুলোর জন্য পরিকল্পনা নিচ্ছে।

মাতালান বলেছে, যেসব অর্ডার এরই মধ্যে ট্রানজিটে রয়েছে তা আমরা তা নিয়ে নেব, যদিও এসব পণ্য বিক্রি করতে পারব না। আমরা অর্ডার বাতিল বন্ধ করতে সব রকম চেষ্টাই করছি।

ওদিকে আলটিমেট ফ্যাশনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, কোভিড-১৯ এর কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য আমরা শতকরা ৭০ ভাগ শ্রমিক দিয়ে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছি। সরকারি নিয়ম এবং রেগুলেশন অনুসারে তাই আমাদেরকে কিছু শ্রমিককে ছাঁটাই করতে হয়েছে। এ বিষয়ে আর্কেডিয়া, ম্যাগপাই নিটওয়্যার, স্টার্লিং স্টাইলসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনও সাড়া দেয়নি।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *