- ইউনূসের বিচারে অস্বাভাবিক গতি, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ
- বাধাগ্রস্ত হতে পারে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ
বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক: মিরপুরের গ্রামীণ টেলিকম ভবনে অবস্থিত দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় দখল চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত সোমবার অন্তত ২০ জনের একটি দল এই দখল চেষ্টা চালায় বলে গ্রামীণ কল্যাণের কর্মীরা জানিয়েছেন।
‘গ্রামীণ কল্যাণ’ শান্তিতে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। এছাড়া একই ভবনে রয়েছে তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ টেলিকমসহ আরও সাতটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ টেলিকমের কার্যালয় দখল চেষ্টা হচ্ছে বলে ওই প্রতিষ্ঠান দু’টির কর্মীরা জানিয়েছেন। গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের অফিসে গিয়ে কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সোমবার বিকাল ৪টায় গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অন্তত ২০ জন এসে খুঁজছিলেন এই দু’টি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে। ওই দুই কর্মকর্তা নিচে গেলে তাদের বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের বৈঠক চলছে। সেখান থেকে একটি চিঠি আসবে। সেই চিঠি আসার আগ পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে। তবে রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে কোনো চিঠি না আসায় তারা চলে যান। রাত ৯টায় গ্রামীণ ব্যাংকের চিঠি নিয়ে এসে কয়েকজন কর্মী ভবনের ফটকে তালা লাগিয়ে দেন। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল সকালে গ্রামীণ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা সকালে এসে তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। তাদেরকে গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যালয়ে অবস্থান করতে দেখা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তারা গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন বোর্ড সভায় তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এখন থেকে তারা এখানে দায়িত্ব পালন করবেন। এরসঙ্গে বর্তমান কর্মকর্তারাও বহাল থাকবেন। মূলত গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের কর্তৃত্ব গ্রামীণ ব্যাংকের হাতে নেয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এমনটা করা হয়েছে। একই ভবনে অবস্থিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা করছেন। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল গ্রামীণ কল্যাণের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম মইন চৌধুরী শাহ আলী থানায় একটি জিডি করেছেন। এতে তিনি গ্রামীণ টেলিকম ভবনে বহিরাগতদের প্রবেশ করায় কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
মইন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, গত সোমবার বিকালের দিকে কিছু বহিরাগত লোক আসেন। সব নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তারা অফিসে প্রবেশ করেন। আমি নিচে এসে দেখি তারা ২০ জন বসে আছেন। এসে তারা বলেন- গ্রামীণ ব্যাংক থেকে এসেছেন। কেন এসেছেন জিজ্ঞেস করতে তারা বলেন- আপনাদের কোম্পানির চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হয়েছে। আর আপনাদের কিছু দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমাদের চাকরিজীবীদের তারা কোথাও যেতে দিচ্ছে না। সবাই ভীত সন্তস্ত্র হয়ে পড়েছিলাম। তারা কি কারণে এসেছে আমরা তখনও তা বুঝতে পারছিলাম না। তারা জানালো একটি চিঠি আসবে, এজন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আমরা বললাম আইনের সহায়তা নিয়ে তো আপনারা আসতে পারতেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল ইসলাম বলেন, আমি খবর পেলাম গ্রামীণ ব্যাংক থেকে লোকজন এসে আমাকে খুঁজছে। আমি নিচে গেলাম, গিয়ে কথা বললাম। তার মধ্যে আমি দুইজনকে চিনি। তারা বললেন, আজকে আমাদের একটি বোর্ডসভা হয়েছে। ওই বোর্ডসভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, চেয়ারম্যান ও দুইজন ডিরেক্টর আসছেন। আমরা একটু আগে চলে আসছি। আপনারা কেউ কোথাও যাবেন না। তারা আমাদের অফিসে থাকার জন্য অনুরোধ করলেন। আমরাও কোথাও যাইনি। এরপর আর চিঠিও আসেনি। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা বাজলে আমরা বের হয়ে যাই। ওই সময়ে আমি তাদেরকে বলি- আমাদের চুক্তিভিত্তিক একজন কর্মচারী আছে, তার কাছে চিঠি রেখে যান।
গ্রামীণ টেলিকম ভবনে শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত সেবাধর্মী ৯টি প্রতিষ্ঠান আছে। প্রতিষ্ঠনগুলো হলো- গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কল্যাণ, গ্রামীণ মৎস্য ও পশু সম্পদ ফাউন্ডেশন, গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশন, গ্রামীণ সামগ্রী, গ্রামীণ ফান্ড, গ্রামীণ শক্তি, গ্রামীণ কমিউনিকেশন। বাকিগুলো লিমিটেড কোম্পানি। গ্রামীণ ব্যাংকের সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন ২টি প্রতিষ্ঠানে চিঠি দেয়া হয়েছে। বাকিগুলো এখনো তাদের মতো কাজ করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই দু’টি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত কর্মীরা বলছেন, গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ কল্যাণের মাধ্যমে তারা কর্তৃত্ব নেয়া শুরু করেছে। বাকি ৭টা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রণে নেবে তারা।
সার্বিক বিষয়ে গ্রামীণ কল্যাণের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মইন চৌধুরী বলেন, আমার এমপ্লয়িকে রক্ষা করা একজন এমডি হিসেবে আমার দায়িত্ব। আমরা চাই পূর্বে যে অবস্থায় কাজ করছিলাম সেভাবে আমাদের ফেরত দেয়া হোক। ৭০ লাখ গরিব মানুষের চিকিৎসা সেবা আমরা দেই। আমরা চাই দেশের হতদরিদ্র মানুষ যেন আর কষ্টে না থাকে। ড. ইউনুস সবসময় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
এদিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইনের মামলায় অস্বাভাবিক গতিতে বিচার করা হয়েছে। এ নিয়ে সারাবিশ্ব থেকে যে ব্যাপক নিন্দা জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও তার সঙ্গে আছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শ্রম আইন ব্যবহার করে ড. ইউনূসকে হয়রান ও ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে উদ্বেগ জানায় যুক্তরাষ্ট্রও।
এতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা জানিয়েছেন মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার। সেই সাংবাদিক তার কাছে জানতে চান, সোমবারের মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, অজ্ঞাত ২০ জনের একটি গ্রুপ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অফিস দখল করতে যায়। আপনি যেমনটা অবগত আছেন যে, বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী একপেশে জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগ, মিডিয়া, দুর্নীতি বিরোধিতাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এখন গ্রামীণের মতো প্রতিষ্ঠানে তাদের চোখ পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কি?
সাংবাদিকের এ প্রশ্নের জবাবে ম্যাথিউ মিলার বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলার প্রেক্ষিতে আমি বলবো যে- আমরা দেখতে পেয়েছি তার বিরুদ্ধে শ্রম আইনের মামলার বিচার করা হয়েছে অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে। আরও মামলার চার্জশিট অনুমোদন করেছে দুর্নীতি বিরোধী কমিশন। এসব ঘটনায় সারা বিশ্ব থেকে ব্যাপক নিন্দা জানানো হয়েছে। আমরা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে অভিন্ন উদ্বেগ জানাচ্ছি যে, এসব মামলায় ড. ইউনূসকে হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশের শ্রম আইনের অপব্যবহার করা হতে পারে। আমরা উদ্বিগ্ন যে, শ্রম আইন এবং দুর্নীতি বিরোধী আইনের অপব্যবহারের ফলে আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং ভবিষ্যত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ রোধ করতে পারে। যেহেতু আপিল প্রক্রিয়া চলমান তাই বাংলাদেশ সরকারকে আমরা ড. ইউনূসের জন্য সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে উৎসাহিত করি।

