আর কত বছর এভাবেই জলে ভাসবে চট্টগ্রাম নগরবাসী। বৃষ্টি আর জোয়ারের জলে অতীতের রেকর্ড ভেঙ্গেছে এবারের জলাবদ্ধতা। জোয়ারের জলে মহানগরের নিচু এলাকার সড়ক, ভোগ্যপণ্যের বড় পাইকারি বাজার, পণ্যের গুদাম, দোকানপাট, হাসপাতাল ও বসতবাড়ি ডুবছে।
বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিনই দু’বার জোয়ারের জলে তলিয়ে যায় চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ। জোয়ারের জল ঢুকে গুদামে রাখা মালামাল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে বেচা-কেনা। দিনে দু’বার জোয়ারের সময় হাঁটু সমান জলে তলিয়ে আদা, রসুন ও পেঁয়াজের মতো পণ্য নষ্ট হচ্ছে। এতে শত কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি সোলাইমান বাদশা বলেন, স্লুইস গেট সহ বিভিন্ন নির্মাণের জন্য যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা ধীরগতি হওয়ায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
জানা যায়, সামান্য বৃষ্টি এবং অমাবস্যা-পূর্ণিমাসহ অন্যান্য সময়ে জোয়ারের জলে নতুন চাক্তাই, মধ্যম চাক্তাই, পুরনো চাক্তাই ও আছাদগঞ্জের নিম্নঞ্চল হাঁটু জলে তলিয়ে যায়। এ ছাড়া খাতুনগঞ্জের ইলিয়াছ মার্কেট, বাদশা মার্কেট, আমির মার্কেট, নবী মার্কেট, চাক্তাই মসজিদ গলি, ড্রামপট্টি ও চালপট্টির সামনের সড়কেও জল জমে যায়। প্রায় সারা বছরই জোয়ারের জল এসব এলাকার কিছু কিছু দোকান ও গুদামে প্রবেশ করে পণ্য ভিজে নষ্ট হয়।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের ভোগ্যপণ্যের ৫০ শতাংশ বেচাকেনা হয় এখানে। করোনাকালীন সময়ে ক্ষতি হয়েছে এখানকার ব্যবসায়ীদের তা আগামী পাঁচ বছরেও পুষিয়ে উঠতে পারব না। এখন জোয়ার আর বৃষ্টির জলে কয়েকদিনে ব্যবসায়ীদের ২৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। লোকসানে পড়ে ব্যাংকের দেনা শোধ করতে পারছেন না অনেকে। সিডিএর স্লুইস গেট নির্মাণকাজ যে গতিতে হওয়ার কথা তা হয়নি। সময় পার হয়ে গেলেও কাজ অর্ধেকও শেষ হয়নি।
এদিকে, চট্টগ্রামের চিকিত্সাসেবা প্রতিষ্ঠান আগ্রাবাদে মা ও শিশু হাসপাতাল জোয়ারের জলে নিচতলা যথারীতি হাঁটু জলে তলিয়ে যায়। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা, পরীক্ষা নিরীক্ষা, রিপোর্ট সংগ্রহ, রোগী আনা নেয়াসহ চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হয়।
জানা যায়, আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের নিচ তলায় রয়েছে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, শিশু বিকাশ কেন্দ্র, ইএনটি বিভাগ, ৮০ শয্যার শিশু ওয়ার্ড, অভ্যর্থনা, ক্যাশ কাউন্টার, প্রশাসনিক ও হিসাব বিভাগ। জোয়ারের জল আসলে নিচ তলায় থাকা রোগীদের উপরের তলার ওয়ার্ডে স্থানান্তর করতে হয়। জল নেমে গেলে ফের তাদের নিয়ে আসা হয় নীচে। এতে চরম কষ্ট ভোগ করতে হয় রোগী, স্বজন এবং হাসপাতালের চিকিসক ও নার্সদের।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির ট্রেজারার রেজাউল করিম আজাদ জানান, গত ১০ বছর ধরে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই সময় হাসপাতালে জোয়ারের জল প্রবেশ করছে। এজন্য হাসপাতালের গ্রাউন্ড ফ্লোর প্রায় আড়াই ফুট উঁচু করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও রক্ষা মিলছে না। ফ্লোর আর উঁচু করারও সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, চিকিত্সকরা উপরের তলায় বসে চিকিত্সা দিচ্ছেন। রোগীদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেহেতু নিয়মিত এ এলাকায় জল উঠে, তাই বর্ষা আসলে আমরা বিকল্প ব্যবস্থা করি। জল উঠার কারণে চলাফেরায় কিছুটা সমস্যা হলেও রোগীদের চিকিত্সা সেবা দেয়ার জন্য সবোর্চ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।
স্থানীয়রা জানান, ২০১০ সালের পর থেকে জল ওঠা শুরু হয়। তবে আগে কেবল ভারী বর্ষণ হলেই জল উঠতো। এরপর থেকে যত দিন বেড়েছে, বেড়েছে জলের উচ্চতা। বর্ষায় প্রায়ই এ সমস্যায় পড়তে হয় রোগী ও তাদের স্বজনদের। সামান্য বৃষ্টিতেই নিচতলার জরুরি বিভাগ, অভ্যর্থনা বিভাগ, টিকিট কাউন্টার, লিফট রুম, বর্হিবিভাগ, প্রশাসনিক বিভাগ ও এবাদত খানা ডুবে থাকে পাজলে । বছরের পর বছর ঘূর্ণিঝড়ের সময় টানা জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩০০ রোগী ভর্তি থাকার পাশাপাশি আউটডোর এবং ইনডোরে চিকিত্সা নিতে আসে অন্তত দেড় হাজার রোগী। এর মধ্যে প্রসূতি মা এবং নবজাতকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা. এ কে এম আশরাফুল করিম বলেন, বর্ষার সময় জোয়ার আসলে জল উঠার সমস্যাটা দীর্ঘ দিনের। এটা হাসপাতাল কেন্দ্রিক সমস্যা না। আমাদের নিচতলা রোগী গুলোকে তিন তলায় নিয়ে গেছি। তাদের সেবা দিতে আমাদের সমস্যা হচ্ছে না।

