শিরোনাম
শুক্র. ফেব্রু ২০, ২০২৬

চিকিৎসকদের মানবেতর জীবন

বেতন কর্তন, বোনাস কর্তন। নেই পিপিই। চিকিৎসক ও তাদের পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে নেই চিকিৎসা। এভাবেই চলছে রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। মহামারির এই ক্রান্তিলগ্নে হাসপাতালটিতে চিকিৎসকরা দিনরাত কাজ করলেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ফ্রন্টলাইনের এই যোদ্ধারা। এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে বার বার জানালেও কোনো সাড়া মিলছে না। বরং উল্টো চাকরি থেকে বরখাস্ত বা চাকরি ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বল্প বেতন থেকে টাকা কর্তন করার কারণে বাসা ভাড়া ও পরিবারের অন্যান্য চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

এর মধ্যে নিজের খরচে পিপিই কিনে রোগীদের চিকিৎসাও দিতে হচ্ছে। চিকিৎসকরা পিপিই দাবি করলেও করোনাকালীন সময়ে কোনো পিপিই পাননি কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা। সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতালটিতে ১৭৯ জন চিকিৎসক রয়েছেন। এর মধ্যে অস্থায়ী চিকিৎসক রয়েছে ১০৭ জন। বাকি ৭২ জন সিনিয়র ও স্থায়ী চিকিৎসক। করোনাকালীন সময়ে নানা অজুহাত দেখিয়ে ও অসুস্থতার কথা বলে অনেক স্থায়ী চিকিৎসক কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। এই সংকটের সময়ও দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন অস্থায়ী চিকিৎসকরা। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালটিতে কাজ করলেও তারা পাচ্ছেন না তাদের প্রাপ্যটুকু। নামপ্রকাশ না করার শর্তে একজন চিকিৎসক বলেন, গত তিন মাস ধরে আমাদের বেতনের একটি বড় অংশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেটে রাখছে। আমরা বেতন পাই ত্রিশ হাজার টাকা। এর মধ্যে কারো দশ হাজার টাকা, কারো কাছে আট হাজার টাকা করে কেটে রাখছে। ঈদের বোনাস দিয়েছে অর্ধেক। বৈশাখী বোনাস দেয়নি। তাছাড়া আমাদের নিজেদের পিপিই কিনে পরতে হয়। হাসপাতাল থেকে আমরা কোনো ধরনের সহযোগিতা পাই না। এসব দাবি-দাওয়া নিয়ে গত ২০শে জুন আমরা একটি স্মারকলিপি দিয়েছি ডিরেক্টর স্যারের বরাবর। আগামী ২৭ তারিখ পর্যন্ত আমরা তাদের সময় দিয়েছি। দেখি কী করে? আমাদের তো বাঁচতে হবে।

ওই স্মারকলিপি থেকে জানা যায়, মহামারির সময় দিনে দিনে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এমন অবস্থায় হাসপাতালটিতে করোনা আক্রান্ত, ডায়াবেটিকস ও নানা জটিল রোগী আসার কারণে করোনা সংক্রমণ হাসপাতালেও বাড়তে থাকে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায়, দায়িত্বহীনতার কারণে, হাসপাতালে পিসিআর মেশিন থাকা সত্ত্বেও তারা করোনা টেস্ট চালু করেননি। ফলে হাসপাতালে আসা রোগী এবং চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। এদিকে কোভিড ও নন-কোভিড রোগীদের জন্য আলাদা প্রটোকল না থাকায় চিকিৎসা কার্যক্রমে তীব্র বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। অথচ হাসপাতালে আসা রোগীদের করোনা টেস্ট করতে বাইরের ল্যাবের ওপর নির্ভর করতে হয়। আর সেই রিপোর্ট আসতে সময় লাগে দুই থেকে তিনদিন। ফলে অনেক চিকিৎসক রোগীদের সংস্পর্শে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই নয়, চিকিৎসকরা অভিযোগ করেছেন করোনা আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীরা বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কারণে রোগীদের সেবায় আন্তর্জাতিক ভাবে যে রোস্টার পদ্ধতি করা হয়েছে হাসপাতাল তা মানছে না। ফলে চিকিৎসকরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু হাসপাতালটিতে চিকিৎসকরা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা আক্রান্ত হলেও তাদের চিকিৎসা দিচ্ছে না নিজেদের কর্মক্ষেত্র বারডেম হাসপাতাল। ফলে চিকিৎসকদের মাঝে এক ধরনের ক্ষোভ কাজ করছে।

পরিচালকের কাছে দেয়া স্মারকলিপিতে চিকিৎসকরা বলেন, করোনা মহামারি শুরু থেকে আর. এম.ও/সহকারী রেজিস্ট্রার/এম.ও (অস্থায়ী) করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। যদি এমন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়, তাদের পরিবারের কি হবে? যদি ফুসফুস ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে কে তার দায়ভার নেবে? পরে কর্তৃপক্ষ তাদের হাসপাতাল থেকে অপসারণ করবেন! কিন্তু তাদের এই স্থায়ী বিকলাঙ্গ নিয়ে কোনো চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা কে দেবেন?

তাদের অভিযোগ সারা বিশ্বে যখন চিকিৎসকদের চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছেন, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন ঠিক তখনই উল্টো পথে হাঁটছেন বারডেম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ভুক্তভোগী চিকিৎসকরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান, তাদের পদগুলো স্থায়ী করার জন্য। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো আশ্বাস দেয়নি।

আরেকজন চিকিৎসক বলেন, আমরা বিগত তিন মাসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করেছি। প্রথমে মৌখিক পরে লিখিতভাবে দাবি জানিয়েছি। অথচ মহাপরিচালক ও সংশ্লিষ্টরা আমাদের এই দাবি-দাওয়াকে অবহেলা করেছে। এখন যে সময় দিয়েছি এই সময়ের মধ্যে আমাদের দাবি-দাওয়া না মানলে অন্যপথ অবলম্বন করতে হবে। আমরাও তো মানুষ। আমাদের পরিবার আছে। এভাবে তো চলতে পারে না। অর্থ সংকট আর নিশ্চয়তা না থাকলে মনোযোগ দিয়ে কাজ করা যায় না। দিন শেষে পরিবারের কাছে যেতে হয়। অথচ পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে তাদের চিকিৎসা পর্যন্ত দিতে রাজি না বারডেম কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালটির মহাপরিচালকের বরাবর দেয়া স্মারকলিপিটিতে আরো কয়েকটি দাবির মধ্যে চিকিৎসকদের পিপিই ও তাদের পরিবারের কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে হাসপাতালকে। কোনো চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে তাদের এককালীন দশ লাখ টাকা করে দেয়ার দাবি জানানো হয়।

এই স্মারকলিপির অনুলিপি দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি সভাপতির কাছে। সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, তারা তো ইন্টার্নি চিকিৎসক। তাদের সবাইকে তো স্থায়ী করা সম্ভব না। সেই ব্যয় প্রতিষ্ঠান বহন করতে পারবে না বলে আমার মনে হয়। তারপরও বারডেম কর্তৃপক্ষ যা সিদ্ধান্ত নেয় তাই হবে। বেতন কর্তনের ব্যাপারে তিনি বলেন, সেটা সাময়িক কর্তন করা হয়েছে। পরে তো সেটা ফিরিয়ে দেয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. এম কে আই কাইয়ূম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি হাসপাতালটির যুগ্ম পরিচালক ও মুখপাত্র ডা. নাজিমুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন ।

পরে ডা. নাজিমুল ইসলাম বলেন, স্মারকলিপি দিয়েছে, বিষয়টি আমরা জানি। তবে তাদের বেতন বোনাস কর্তন করা হয়নি। আমরা পরে তা দিয়ে দিবো। যদিও আমারা এপ্রিল পর্যন্ত তাদের পুরো বেতন দিয়েছি। তিনি বলেন, কিন্তু আমাদের রোগী ছিলো না, আয় ছিলো না। যার কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এখন একটু রোগী বেড়েছে। আমরা চেষ্টা করবো সামনের মাসে পুরো বেতন দিয়ে দেয়ার জন্য। তারা বলছে তাদেরকে স্থায়ী করে নেয়ার জন্য। সেটা তো আমাদের হাত নেই। আমরা কর্তৃপক্ষকে তাদের বিষয়টি জানিয়েছি। সেটা তারা দেখবে। পিপিই’র বিষয়ে তিনি বলেন, এটা মিথ্যা কথা। আমার এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কখনো এমনটা করবো না। আপনি চাইলে আমি লিস্ট দিতে পারবো। কে কত পিপিই নিয়েছে। বল্লেই তো হবে না। করোনা আক্রান্ত পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার বিষয়ে তিনি বলেন, দেখুন তাদের যখন নিয়োগটা হয় তখন যে নিয়মগুলো আছে এর বাইরে তো প্রতিষ্ঠান যেতে পারে না। তাছাড়া তাদের নিয়োগটা অস্থায়ী । তিন বা চার বছরের জন্য। তারা স্থায়ীদের মতো সুবিধা পাবে না সেটাই স্বাভাবিক। করোনা টেস্টের ব্যাপারে তিনি বলেন, পিসিআর মেশিন থাকলেই হবে না। টেকনিক্যাল অনেক বিষয় আছে সেগুলো আমাদের নেই। সংবাদ সূত্র: মানবজমিন

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *