মো. শহীদুল হক সাবেক পররাষ্ট্রসচিব। এখন বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। রোহিঙ্গা সংকট, ভূরাজনীতি ও সংযুক্তি—এ বিষয়গুলো নিয়ে দেশে-বিদেশে লেখালেখি এবং আলোচনায় যুক্ত আছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূরাজনীতির পাশাপাশি যোগাযোগের বৃহদায়তন প্রকল্প নিয়ে জনমনে রয়েছে নানা কৌতূহল। এ বিষয়গুলো নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন মো. শহীদুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাহীদ এজাজ।
রাহীদ এজাজ: মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উদ্যোগে কোয়াড নেতাদের ভার্চ্যুয়াল শীর্ষ বৈঠক হলো। চীনকে বেঁধে রাখার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত আর অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ নেতাদের আলোচনার পর ভূরাজনীতিতে কি নতুন মাত্রা যোগ হলো?
মো. শহীদুল হক: চার দেশের এই সহযোগিতা আগেও ছিল। সহযোগিতাকে সুসংহত করতে দেশগুলো একমত হয়েছে। চার দেশ উন্নত আর সমৃদ্ধ পৃথিবীর অঙ্গীকার করে অবাধে সমুদ্রে বিচরণের কথা বললেও চূড়ান্তভাবে তা যে চীনের এগিয়ে চলা রোধের লক্ষ্যে, সেটা অনস্বীকার্য। ওরা দেখাতে চায়, বড় কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে সি এঞ্জেলের মতো যৌথভাবে মোকাবিলা করবে। তাদের এই আলোচনা এশিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ধারাবাহিকতারই অংশ। এই দেশগুলো মনে করে, দুই মহাসাগরের মধ্যে তাদের অবস্থান নিতে হবে। আর এটা করা গেলে পুরো বিশ্ব তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আছে। একইভাবে চীন মনে করে, এই মহাদেশ তো আমার। এখন চীনের সমস্যা হচ্ছে এখানে দেশটি একা। যারা চীনের পক্ষে রয়েছে, তারাও কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলছে না। সামরিকভাবে দেখলে চীন কিন্তু এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। সামুদ্রিক শক্তির বিচারে তো বটেই।
রাহীদ এজাজ: তার মানে কোয়াডের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বৈঠকটা আগেরই ধারাবাহিকতা?
মো. শহীদুল হক: কোয়াডের শীর্ষ বৈঠক মূলত আগের প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত করা। আর জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে বিশ্ব পরিমণ্ডলে তাঁর দেশের জোরালো নেতৃত্বের কথা জানালেন। হোয়াইট হাউস এশিয়া নীতিতে জোর দিচ্ছে। আর মার্কিন প্রশাসনের এশিয়ামুখী নীতির কেন্দ্রেই রয়েছে ইন্দো–প্যাসিফিক। ডেমোক্র্যাটদের গণতন্ত্র, মানবাধিকারসহ অন্য মূল্যবোধগুলো ঠিক রেখেই যুক্তরাষ্ট্র যে সামুদ্রিক পরাশক্তি হিসেবে বড় পরিসরে আছে এবং থাকবে, সেটারই জানান দিয়েছেন জো বাইডেন।
রাহীদ এজাজ: চীনের অঞ্চল আর পথের উদ্যোগের (বিআরআই) বাস্তবায়ন যতটা দৃশ্যমান, ঠিক ততটাই অস্পষ্ট যুক্তরাষ্ট্রের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল (আইপিএস)।
মো. শহীদুল হক: আইপিএসের প্রক্রিয়াটা অবধারিতভাবে কৌশলগত। আর চীনের বিআরআইয়ের লক্ষ্যই হচ্ছে বিভিন্ন দেশের বৃহদায়তন প্রকল্পে অর্থায়ন করে তাদের নিজের বলয়ে নিয়ে আসা। বিভিন্ন দেশের বড় বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করে সেগুলোকে বিআরআই পরিকল্পনায় যুক্ত করে দেখানো। অর্থাৎ, একটি দেশ তার উন্নয়নের সঙ্গে মিলিয়েই চীনের সঙ্গে যুক্ত হবে। কাজেই দুপক্ষের ধরন কিন্তু একেবারেই আলাদা। আইপিএসের ভাবনাটাই হচ্ছে একটি কৌশলগত জোট। এতে যতটা সম্ভব বৃহদায়তন প্রকল্পও থাকবে। তবে বিআরআইয়ে যে টাকা বিভিন্ন দেশে দেওয়া হচ্ছে, এটা কিন্তু ঋণ; অনুদান নয়। আবার আইপিএসে যে এখন পর্যন্ত তহবিল নেই, সেটাও ঠিক।
রাহীদ এজাজ: পদ্মা সেতুর রেল প্রকল্পকে চীন তাদের বিআরআইয়ের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখিয়েছে। আপনি পররাষ্ট্রসচিব থাকার সময় বাংলাদেশ বিআরআই নিয়ে চুক্তি সই করেছে। চুক্তি সইয়ের আগে বা পরে চীন এই প্রকল্প বিআরআইতে আছে, এমন কোনো আলোচনা করেছিল?
মো. শহীদুল হক: চীন এটা আগে কখনো বলেনি। এখন বলছে। চীন এখন যেখানেই বৃহদায়তন প্রকল্প করছে, তা বিআরআইতে দেখাচ্ছে। দিস ইজ এন আফটার থট। হয়তো আগে থেকেই তাদের মাথায় এসব ছিল। কিন্তু কখনো আলোচনার টেবিলে আনেনি।
রাহীদ এজাজ: বাংলাদেশ ২০১৪ সালে জাপানের বিগ বির সঙ্গে যুক্ততার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। আর ২০১৫ সালে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। দুই বছর ধরে জাপান প্রকাশ্যে বলছে, মাতারবাড়ী বিগ বির পরিকল্পনায় আছে। এই প্রকল্প আইপিএসের অংশ। তবে কি জাপানও আগে এসব আলোচনায় আনেনি?
মো. শহীদুল হক: না, জাপানও আগে এটা বলেনি। ২০১৯ সালের শেষ দিকে এসে বলতে শুরু করেছে। তবে আমরা ২০১৭ সালে বুঝেছিলাম, মাতারবাড়ীতে একসময় সমুদ্রবন্দর হবে। আমাদের মিশনগুলোর বিভিন্ন সময়ের যেসব চিঠি চালাচালি, তা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
রাহীদ এজাজ: চীন আর জাপানের অভিজ্ঞতায় কি এটা প্রমাণিত যে বৃহদায়তন প্রকল্প আর বড় কোনো দেশের উদ্যোগের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার আগে বাংলাদেশের পরিকল্পনা করে কৌশলগত অবস্থান ঠিক করাটা জরুরি?
মো. শহীদুল হক: অবশ্যই এটা করা উচিত। আমরা অধিকাংশ সময় নিজেদের বৃহদায়তনের প্রকল্পগুলো অ্যাডহক ভিত্তিতে দেখি। এই প্রকল্পগুলো দেশের বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ। তবে এ প্রকল্পগুলো চূড়ান্তভাবে ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনায় রয়েছে কি না, সেটা আমরা বিবেচনায় নিই না। সব সময় মনে রাখতে হবে, কেউ কিন্তু চ্যারিটি করছে না। হয় ব্যবসা করছে, না হলে ভূরাজনীতি করছে। অথবা দুটোই। এ জিনিস আমাদের বুঝতে হবে। আমাদের আরও সাবধান হতে হবে। আমাদের অগ্রাধিকার ছিল বলে অতীতে বিভিন্ন দেশের সহযোগিতার প্রস্তাব গ্রহণ করেছি। আজকাল সব বৃহদায়তন প্রকল্পের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত করা হয়। একটি বৃহদায়তন প্রকল্পে সহযোগিতা নিলে এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব কী হবে, সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। এ জন্যই নিতে হবে যে এর দীর্ঘ সময়ের প্রভাব কী এবং এতে দেশের লাভ-ক্ষতির বিষয়টিও আসবে।
রাহীদ এজাজ: আইপিএসে ব্যবসাই মুখ্য। এতে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার কোনো উপাদান নেই। অথচ আইপিএসের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ৩০০ মিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল রেখেছে নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য। এটাকে কীভাবে দেখছেন?
মো. শহীদুল হক: এটা নতুন কিছু নয়। এটা যুক্তরাষ্ট্রের দর-কষাকষি কৌশলের অংশ। আমাদের হয়তো বুঝতে অসুবিধা হয়েছিল। কিংবা আমাদের প্রয়োজনটা তখন এত বেশি ছিল যে ভেবেছি ঠিক আছে, অসুবিধা নেই। আমরা বিআরআইতে থাকব। আবার আইপিএসেও থাকব। ওই জায়গাটা তখন গুরুত্ব পায়নি। এখন সেটা আনতে হবে।
রাহীদ এজাজ: বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন সব সময় দিল্লির চোখ দিয়ে ঢাকাকে দেখে—ইদানীং কথাটা বেশি শোনা যাচ্ছে। আসলেই কি ওয়াশিংটন দিল্লির চোখে বাংলাদেশকে দেখে?
মো. শহীদুল হক: আমার কাছে এটা কখনো মনে হয়নি। ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার সময় আঞ্চলিক সম্পর্কের আলোচনায় ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার প্রসঙ্গ এসেছে। বাংলাদেশের যে আলাদা একটা অবস্থান রয়েছে আর সেটা যে ভারতের সঙ্গে সব সময় এক থাকেনি, এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সজাগ থেকেছে বলে দেখেছি। যেমন ধরেন, আইপিএস নিয়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের নিতে চেয়েছে, বাংলাদেশের লাভ-সুবিধার প্রেক্ষাপটে তারা কথা বলেছে। ভারতের প্রসঙ্গ টেনে আমাদের কখনো কিছু বলেনি।
রাহীদ এজাজ: সরকার আবার ক্ষমতায় আসছে—এটা বিবেচনায় নিয়ে ২০১৮ সালের শেষ দিকে বিআরআই এবং আইপিএস নিয়ে অবস্থান ঠিক করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করেছিল। শেষ পর্যন্ত কি কোনো অবস্থান ঠিক করা হয়েছিল?
মো. শহীদুল হক: ২০১৮ সালের মার্চে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আমাদের জানানো হয়েছিল, আইপিএস আর বিআরআইয়ের প্রেক্ষাপটে কী হচ্ছে তার পরিপ্রেক্ষিতে অবস্থান ঠিক করার ব্যাপারে বাংলাদেশের একটি সমীক্ষা করা জরুরি। আমাদের অবস্থানটা কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে ওই বছর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি উপস্থাপনাও করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, আমরা দুই উদ্যোগেই থাকব, যার কেন্দ্রে থাকবে ব্যবসা-বাণিজ্য। কোনো প্রতিরক্ষার উদ্যোগে যাব না। আমরা বুঝেছিলাম, ভৌগোলিক অবস্থানের পাশাপাশি জনসংখ্যার কারণে আমাদের একটা গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বাজারের একটা গুরুত্ব আছে। এটা মনে রেখে আমাদের কৌশল ঠিক করতে হবে।
রাহীদ এজাজ: কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে বাংলাদেশের সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে কোনো ধারণা পাওয়া যায় না।
মো. শহীদুল হক: আমিও জানি না। বিআরআই আর আইপিএস নিয়ে দু-একজনের ভাষ্য আমরা শুনি। কিন্তু দৃশ্যমান অবস্থান কী, সেটা স্পষ্ট নয়। কোয়াড ভার্চ্যুয়াল বৈঠকের পর মনে করি, বাংলাদেশের একটি কৌশলগত এবং দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ঠিক করা জরুরি।
রাহীদ এজাজ: ‘মুজিব চিরন্তন’ অনুষ্ঠানে ভারতসহ পাঁচ শীর্ষ নেতার আলোচনায় বাংলাদেশ সংযুক্তিতে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভারতকে নিয়ে নেপাল, ভুটানের সঙ্গে উপ-আঞ্চলিক সংযুক্তিতে বাংলাদেশ জোর দিচ্ছে। পুরো বিষয় সামাল দেওয়ার সামর্থ্য, সক্ষমতা কি বাংলাদেশের আছে?
মো. শহীদুল হক: দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে সংযুক্তিকে অবশ্যই সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। আর ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলে সংযুক্তি নতুন নয়। উপমহাদেশের বিভক্তির আগেই নানা মাত্রায় এ অঞ্চলের দেশগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে এর একটি চিরাচরিত বৈচিত্র্য রয়েছে। সেটাকে মাথায় রেখে সংযুক্তির পুনর্জাগরণকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। আরেকটা বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে, বাংলাদেশের সামর্থ্য ও শক্তি বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট ও কার্যকর ছিল কি না, তার মূল্যায়ন হবে পরে। তবে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির সুযোগ নেই। অতি আত্মবিশ্বাসী হলেও চলবে না। বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে সংযতভাবে এগোতে হবে বাংলাদেশকে। মনে রাখতে হবে, উপ-আঞ্চলিক হোক, আন্তর্জাতিক হোক, সংযুক্তি, বড় প্রকল্প কিংবা উদ্যোগ—যেকোনো যুক্ততার সময় সব পক্ষকে আস্থায় রেখে বাংলাদেশকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাহীদ এজাজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
মো. শহীদুল হক: আপনাকেও ধন্যবাদ।

