শিরোনাম
রবি. জানু ৪, ২০২৬

জেনারেল নায়েঙকে জানাবোঝা বাংলাদেশের জন্য কেন জরুরি

।। আলতাফ পারভেজ।।

তিনি স্বঘোষিত জেনারেল। থাকেন চীনসংলগ্ন শান প্রদেশে। কিন্তু তাঁর জওয়ানরা লড়ছেন ২৫০ মাইল দূরে বাংলাদেশ সীমান্ত-সংলগ্ন আরাকানে। কেবল এই বিবেচনাতেই জেনারেল তঙ ম্রাট নায়েঙকে জানাবোঝা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। আরাকানের সঙ্গে বাংলাদেশের শত শত বছরের যে সাংস্কৃতিক ইতিহাস, তার ভবিষ্যৎ অংশটুকুতে নায়েঙ বড় চরিত্র হিসেবে উঠে আসছেন। তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার।

নায়েঙের অধীনে রয়েছে ১০ হাজার গেরিলা

দশকের পর দশক সামরিক শাসনে থাকায় দুনিয়াজুড়ে পরিচিত বর্মিজ জেনারেলের কমতি নেই। দেশটিতে বিভিন্ন গেরিলা বাহিনীর স্বঘোষিত জেনারেলও বিপুল। তাঁরা অনেকে খ্যাতনামা সমরবিদও। জেনারেল নায়েঙ দেশটির দ্বিতীয় ঐতিহ্যের সর্বশেষ সংযোজন। এ মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত গেরিলা দল আরাকান আর্মির প্রধান তিনি।

৪৩ বছর বয়সী এই জেনারেল থাকছেন দেশের সর্ব পূর্বে শান প্রদেশের পাঙসাঙয়ে। সেখান থেকেই দেশের দক্ষিণের প্রদেশ আরাকানকে বামারদের হাত থেকে উদ্ধারে লড়ছেন। একদা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘অলিম্পিকে আরাকানের পতাকা ওড়ানো তাঁর জীবনে সর্বোচ্চ স্বপ্নের জায়গা।’ সে লক্ষ্যে অন্তত এক ধাপ এগিয়েছেন ইতিমধ্যে।

মিয়ানমারের সবচেয়ে জাঁদরেল চারটি গেরিলা গ্রুপের একটা নায়েঙের নিয়ন্ত্রণে আছে। অন্য তিনটি হলো ওয়া আর্মি, কাচিন ইনডিপেনডেন্ট আর্মি (কেআইএ) এবং কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (কেএনএলএ)। এই চারটির মধ্যে আরাকান আর্মি সবচেয়ে নবীন এবং ম্রাট নায়েঙও সবচেয়ে তরুণ গেরিলা ডন। ২০০৯-এ মাত্র ২৬ জন সহযোগী নিয়ে ট্যুর গাইডের জীবন ছেড়ে নায়েঙ এই দলের গোড়াপত্তন করেছিলেন। এখন তাঁর সৈন্যসংখ্যা ১০ হাজারের বেশি, যাঁদের বড় অংশ নারী। নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের নায়েঙ গত বছর থাইল্যান্ড দিয়ে সুইজারল্যান্ডে পাঠিয়ে দিতে পেরেছিলেন। ২০১৯-এর ডিসেম্বরে তাতমাদৌর চাপে নায়েঙের স্ত্রীকে আটক করে থাই সরকার। কিন্তু তাতমাদৌ বহু চেষ্টা করেও তাদের মুঠোয় নিতে পারেনি।

সুচির সঙ্গে যে কারণে আরাকান আর্মির সম্পর্ক তিক্ত

জেনারেল নায়েঙ শানে থাকলেও তাঁর দলের সদর দপ্তর উত্তর মিয়ানমারের কাচিন প্রদেশের লাইজায়। কাচিন থেকে চিন প্রদেশ হয়ে আরাকান আর্মির রাখাইন গেরিলারা ২০১৫ থেকে আরাকানে ঢুকছে এবং লড়ছে দেশটির কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে। আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা আরাকান লিগ নিষিদ্ধ থাকায় এই গেরিলা দলের কর্মী-সমর্থকেরা রাজনৈতিক কাজ করে আরাকান ন্যাশনাল পার্টির (এএনপি) সঙ্গে। এএনপি আঞ্চলিক দল হলেও মিয়ানমারের সবচেয়ে প্রভাবশালী আঞ্চলিক দলগুলোর একটা। তাদের ছত্রচ্ছায়াতেই জেনারেল নায়েঙের যাবতীয় অগ্রযাত্রা।

গেরিলাযুদ্ধে মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ সুনাম আছে। সেই আত্মগর্বে এই বাহিনী স্থানীয়ভাবে যাকে ‘তাতমাদৌ’ বলা হয়, তারা আরাকান আর্মিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি শুরুতে। কিন্তু গত এক দশকে পুরো আরাকানে নায়েঙের গেরিলাদের উপস্থিতি ঘটে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, তারা প্রদেশজুড়ে জনপ্রিয়। জনগণ তাদের আশ্রয় দিচ্ছে, সহায়তা করছে। তবে দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল অং সান সু চির ‘ন্যাশনাল লিগ পর ডেমোক্রেসির’ (এনএলডি) সঙ্গে আরাকান আর্মি এবং এএনপির সম্পর্ক খারাপ। এনএলডি বরাবরই এএনপিকে এড়িয়ে আরাকানে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কায়েম করতে চাইত। তাতে উভয়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। একই কারণে সুচির সঙ্গেও আরাকান আর্মির সম্পর্ক ছিল খারাপ।

সামরিক শাসনের বিরোধিতায় নেই জেনারেল নায়েঙ

আরাকানজুড়ে নায়েঙের জওয়ানদের ব্যাপক আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের মধ্যেই ২০২১-এ দেশটির কেন্দ্রে তাতমাদৌ অভ্যুত্থান ঘটায়। এই অভ্যুত্থানের পরপর আরাকান আর্মি অপ্রত্যাশিত এক অবস্থান নেয়। তাৎক্ষণিকভাবে তাতমাদৌর জেনারেলদের সামরিক অভ্যুত্থানের শক্ত কোনো বিরোধিতা করেনি তারা। এই অবস্থানের মূলে কাজ করেছে সুচির এনএলডির সঙ্গে এএনপির পুরোনো তিক্ততা। ২৩ মার্চ তারা অভ্যুত্থানের নিন্দা করে নিরপেক্ষ চরিত্রের একটা বিবৃত দিলেও সামগ্রিকভাবে আরাকান আর্মির অবস্থান তাতমাদৌর দিকেই ঝুঁকে আছে। অথচ একই সময়ে পুরো মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে তীব্র গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন তরুণ-তরুণীরা। সমগ্র দেশের সঙ্গে আরাকানের এ রকম বৈপরীত্য দেখে অনেকেরই প্রশ্ন, জেনারেল নায়েঙ এমন পদক্ষেপ কেন নিলেন? বাংলাদেশের জন্য আরাকান আর্মির এই অবস্থানের বিশেষ কোনো তাৎপর্য আছে কি না?

তাতমাদৌর সঙ্গে দর-কষাকষিতে এএনপি ও আরাকান আর্মি

জেনারেল নায়েঙ ও আরাকান আর্মি মনে করে, সু চি রাখাইনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। ক্ষমতায় এসে সু চি সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক বোঝাপড়া এগিয়ে নেননি। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এগিয়ে নিতে সু চি ও এনএলডি সামান্যই আন্তরিকতা দেখিয়েছে। ফলে সু চি ও এনএলডির ডাকে এখন আবার তাতমাদৌর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জোটবদ্ধ হতে নায়েঙ অনাগ্রহী।

দেশের বড় একটা গেরিলা দলের এ রকম অবস্থান স্বাভাবিকভাবে তাতমাদৌর জন্য বিরাট স্বস্তির হয়েছে। এএনপির কয়েকজন প্রতিনিধিকে সশস্ত্র বাহিনী ‘স্টেট অ্যাডমিনিসট্রেটিভ কাউন্সিল’ নামে পরিচিত তাদের প্রশাসনিক কাঠামোতেও যুক্ত করেছে। এই দুই কারণেই দেখা যাচ্ছে, মিয়ানমার জুড়ে প্রতিদিন যখন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম হচ্ছে, আরাকান তখন শান্ত। ক্যু হওয়ার পর প্রথম ৮৫ দিনে সামরিক বাহিনীর হাতে যে ৭৫৬ জন আন্দোলনকারী মারা গেছেন তার একজনও আরাকানের নন। এই তথ্য পরোক্ষ বার্তা দিচ্ছে, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে আরাকান নীরব।

প্রতিদানে তাতমাদৌ তাৎক্ষণিকভাবে আরাকান আর্মিকে ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’র তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। পাশাপাশি সু চির আমলে জেলে পুরে রাখা এএনপির প্রধান ড. এঈ মংকেও মুক্তি দিয়েছে তারা। খ্যাতনামা রাখাইন লেখক ওয়াই আন অঙও বন্দিদশা থেকে ছাড়া পেয়েছেন। এসব দর-কষাকষির অংশ হিসেবে জেনারেল নায়েঙ কেন্দ্রীয় সরকারের কারাগারে থাকা তাঁর বোন, শ্বশুর ও ভগ্নিপতিকেও মুক্ত করতে চেষ্টায় আছেন।

চীনকে অসন্তুষ্ট করতে চাইছেন না জেনারেল নায়েঙ

আরাকান আর্মি ও এএনপির সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর চলতি দর-কষাকষির পেছনে গণচীনের একটা পরোক্ষ প্রভাব হাজির আছে। বিশেষ করে জেনারেল নায়েঙ থাকছেন যে পাঙসাঙ শহরে, সেটা শান প্রদেশের একদম চীন লাগোয়া জায়গা। এখানে ঘুরলে যে কারও মনে হবে এটা চীনের ইউনানেরই অংশ। মিয়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণ অতি ক্ষীণ এখানে। জেনারেল নায়েঙ এখানে থাকার মানে হলো চীনের সন্তুষ্টিতে থাকা। তাঁকে নিরাপত্তা দিয়ে রাখে স্থানীয় গেরিলা দল ওয়া আর্মি। ওয়ারা সম্পূর্ণভাবে চীনের সশস্ত্র সহায়তায় চলে। গেরিলা রণকৌশলে পারদর্শী বলে ওয়াদের বলা হয় ‘ওয়াইল্ড ওয়া’। এসব কারণে এখানে তাতমাদৌর কোনো অভিযান নেই। প্রায় ২০ হাজার গেরিলার এক অদৃশ্য সরকার এই অঞ্চলের পিতামাতা হয়ে আছে। পাঙসাঙ এই ওয়াদেরই অকথিত রাজধানী। চীনের মানুষ ছাড়া অন্যদের এই এলাকায় ঢুকতে পাস লাগে। জেনারেল নায়েঙের জন্য সংগত কারণেই এটা একটা ভালো আশ্রয়কেন্দ্র।

নিজের নিরাপত্তার জন্য ওয়া এবং গণচীনের প্রতি নায়েঙের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ছাড়াও আরকান আর্মির তরফ থেকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পক্ষে থাকার আরও প্রবল কারণ রয়েছে। আরাকানে রয়েছে গণচীনের বিশাল আয়তনের একাধিক বিনিয়োগ। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে জীবন্ত বন্ধু চীন। চীন, ওয়া আর্মি, তাতমাদৌ ও জেনারেল নায়েঙের সম্পর্ক উপরোক্ত চার সূত্রে গাঁথা।

কিন্তু রাখাইন তরুণ-তরুণীরা আরাকান আর্মির সমর্থক হলেও তাঁরা তাতমাদৌর বিরুদ্ধে দেশের অন্যান্য অংশের গণতন্ত্রপন্থীদের মতোই রাস্তায় দাঁড়াতে আগ্রহী। এটা জেনারেল নায়েঙ এবং এএনপির ওপর ক্রমে চাপ বাড়াচ্ছে।

মিয়ানমারের সেনা-অভ্যুত্থান প্রশ্নে ভারতের নীরবতার পেছনেও বড় এক কারণ জেনারেল নায়েঙের উপরোক্ত চতুর অবস্থান। আরাকানে রয়েছে ভারতের বিশাল বিনিয়োগ ‘কালাদন সড়ক প্রকল্প’। নায়েঙ আরাকানে চলে আসতে পারলে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রশ্নে আরাকান আর্মির সঙ্গে ভারতকে নতুন করে বোঝাপড়া করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য নায়েঙ কেন গুরুত্বপূর্ণ

পুরো মিয়ানমারের সঙ্গে আরাকানের সর্বশেষ পরিস্থিতির বৈপরীত্য এবং সেই বৈপরীত্যের মধ্যে জেনারেল নায়েঙের বড় ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য বহুভাবে তাৎপর্যবহ। জেনারেল নায়েঙ নতুন পরিস্থিতিতে যে অবস্থান নিলেন, তাতে তিনি জয়ী হলে তাঁকে আর পাঙসাঙে থাকতে হবে না এবং আরাকান আর্মির সদর দপ্তরও হয়তো কাচিন থেকে উত্তর আরাকানের মারাক-উতে চলে আসবে। গত ২-৩ মাসে আরাকানজুড়ে আরকান আর্মির ছদ্ম প্রশাসন অনেক বিস্তৃত হয়েছে এবং এটা ক্যুর মধ্যে তাদের কৌশলগত বড় অর্জন। ইতিমধ্যে তাদের লোকেরা আরকানের অনেক এলাকায় পদ্ধতিগতভাবে কর আদায় করতে শুরু করেছেন। স্থানীয় ‘প্রশাসন’ কীভাবে চলবে সে বিষয়ে কিছু ‘আইন’ও তৈরি করেছে তারা।

যদি সশস্ত্র বাহিনী গণতন্ত্রপন্থীদের আন্দোলন দমিয়ে ফেলতে পারে, তাহলে জেনারেল নায়েঙ তাঁর জুয়ার দানে প্রাথমিকভাবে বিজয়ী হবেন এবং তাতমাদৌ’র কাছ থেকে ওপরে উল্লিখিত দুটি ছাড় আদায় করতে তৎপর হবেন। যদি এ রকমটি ঘটে, তাহলে আরাকানে রাখাইনদের রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য বহুভাবে বাড়বে। এ অবস্থার আরেকটি মানে দাঁড়াচ্ছে, তখন রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে হলে কেবল তাতমাদৌর সঙ্গে বাংলাদেশকে বোঝাপড়া করলে হবে না, আরাকান আর্মিরও সম্মতি লাগবে।

অন্যদিকে, জেনারেল নায়েঙ যদি আসন্ন দিনগুলোতে তাতমাদৌর বদলে গণতন্ত্রপন্থীদের দিকে সরে আসেন, সেটাও হবে দেশটির জন্য বড় ঘটনা। কাচিন ও কারেন গেরিলারা ইতিমধ্যে তাতমাদৌর বিপরীতে গণতন্ত্রপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। আরাকান আর্মিও সেটা করলে তাতমাদৌর সরকারের টিকে থাকার জন্য তা বড় এক চ্যালেঞ্জ হবে। সে রকম ঘটলেও জেনারেল নায়েঙের গেরিলারা এনএলডির সঙ্গে দর-কষাকষি করে আরকানে তাদের কর্তৃত্বের সুযোগ আদায় করেই কেবল পক্ষ পরিবর্তন করবে। অর্থাৎ যেকোনো বিবেচনায় আসন্ন আরাকানে জেনারেল ম্রাট নায়েঙের অবস্থান শক্তিশালী হতে চলেছে। গত সাড়ে তিন মাসে আরাকানে পরিস্থিতির এই নাটকীয় মোড় পরিবর্তন রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের যেকোনো সমীকরণে অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ নতুন উপাদান যুক্ত করছে। তাই বাংলাদেশের দিক থেকে আরকান আর্মির ওপর নজর রাখার একটা বাড়তি দায়ও রয়েছে। যদি আদৌ বাংলাদেশ তার দক্ষিণ সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে মনোযোগী থাকে।

আলতাফ পারভেজ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *