শিরোনাম
শনি. জানু ৩, ২০২৬

ডিসি সুলতানাকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা যে বার্তা দিল

।। মনজুরুল আহসান বুলবুল।।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ দেশের পেশাদার সাংবাদিকদের খুবই প্রিয় মানুষ। রাষ্ট্রপতি বলে নয়, রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি জনবান্ধব ও সাংবাদিকবান্ধব। কিন্তু সেই রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্তে গোটা সাংবাদিক সমাজ হতবাক, বিস্মিত ও আতঙ্কিত।

ঘটনার পটভূমি

গত বছরের ১৩ মার্চ মধ্যরাতে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পুলিশ ছাড়া আনসার সদস্য নিয়ে জেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা দরজা ভেঙে আরিফুলের বাসায় ঢোকেন। এরপর তাঁকে মারধর করেন। পরে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে নিয়ে ‘বিবস্ত্র’ করে নির্যাতন করা হয় তাঁকে।

আরিফুলের স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার নিতু সাংবাদিকদের বলেন, ‘সেদিন রাতে দরজা ভেঙে সাত থেকে আটজন বাসায় ঢোকে। এরপরই আরিফকে পেটাতে শুরু করে। কী অপরাধ, জানতে চাইলে আরও বেশি মারতে থাকে। একপর্যায়ে টিনের বেড়া ভেঙে ওকে নিয়ে যায়। প্রথমে তো আমরা জানতামই না কারা নিয়ে গেছে। পরে আমি কারাগারে দেখা করি। তখন সে দাঁড়াতেই পারছিল না। আমাকে বলল, বিবস্ত্র করে পিটিয়েছে। দুটি কাগজেও স্বাক্ষর নিয়েছে।’

আরিফুলকে আটক অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা। তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ‘অভিযানের সময় তার কাছ থেকে আধা বোতল মদ ও দেড় শ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে। এ অপরাধ স্বীকার করায় রাতেই আদালত বসিয়ে তাকে এক বছরের জেল দেওয়া হয়েছে এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ ঘটনার পেছনের নাটের গুরু কুড়িগ্রামের সে সময়ের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) সুলতানা পারভীন। স্থানীয় সাংবাদিকেরা জানান, ২০১৯ সালে ডিসি সুলতানা পারভীন একটি পুকুর সংস্কার করে নিজের নামে ‘সুলতানা সরোবর’ নামকরণ করতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে প্রতিবেদন করেছিলেন আরিফুল। ওই সংবাদের পর তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন ডিসি। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করতে চেয়েছিলেন আরিফুল। এ বিষয়ে জানতে পেরে জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে তাঁকে বেশ কয়েকবার ডেকে নিয়ে সতর্ক করা হয়।

মধ্যরাতে সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে আরিফুলকে জামিন দেওয়া হয়। এরপরই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

ডিসি সুলতানা পারভীন জানান, সেটা টাস্কফোর্সের অভিযান ছিল। ম্যাজিস্ট্রেট তা পরিচালনা করেছেন নিয়মিত শিডিউলের অধীনে। সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোক, পুলিশ ও আনসার সদস্য ছিলেন। তবে ডিসির এ বক্তব্যের সত্যতা মেলেনি। পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ অভিযানের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

পরে এ ঘটনায় ডিসি সুলতানা পারভীন, জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (আরডিসি) নাজিম উদ্দীন ও আরও দুই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়। প্রত্যাহার হওয়া বাকি দুজন হলেন সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এনডিসি এস এম রাহাতুল ইসলাম। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বারবার আরডিসি নাজিম উদ্দীনের নাম উল্লেখ করছিলেন সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম। এই নাজিম তাঁকে ক্রসফায়ারে দেওয়ার কথাও বলছিলেন।

এ ঘটনায় সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার তদন্তে অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করে শাস্তি হিসেবে তাঁর বেতন বৃদ্ধি দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। এ ছাড়া বলা হয়, তিনি ভবিষ্যতে এই মেয়াদের কোনো বকেয়া পাবেন না এবং এই মেয়াদ বেতন বৃদ্ধির জন্য গণনা করা হবে না। এনডিসি রাহাতুল ইসলামের তিনটি ইনক্রিমেন্ট কর্তন, আরডিসি নাজিম উদ্দীনকে নিম্ন ধাপে নামিয়ে দেওয়া এবং রিন্টু বিকাশ চাকমাকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

সুলতানা পারভীনের খুঁটিটি কোথায়, তা আমরা জানতে পারিনি, তবে সেটার জোর যে বড় শক্ত, বোঝা যায়। কারণ, তদন্তে সব অভিযোগ প্রমাণিত হলো; তাঁকে গুরুদণ্ড দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দেওয়া হলো লঘুদণ্ড; কিন্তু এই লঘুর ভারও বইতে রাজি নন সুলতানা পারভীন; তিনি দণ্ড মওকুফ তো বটেই, অভিযোগের দায় থেকেও অব্যাহতি পেলেন। নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক পেলেন অশ্বডিম্ব, দেশের প্রতিবাদী সাংবাদিকদের গালে পড়ল চপেটাঘাত।

ঘটনার আদ্যোপান্ত মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ২৩ নভেম্বর জ্যেষ্ঠ সচিব কে এম আলী আজমের জারি করা প্রজ্ঞাপনে ধারাবাহিকভাবে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সাংবাদিক নির্যাতনের জন্য অসদাচরণের দায়ে বিভাগীয় অভিযোগে ডিসি সুলতানা পারভীনকে শোকজ করা হয় (১৮/৩/২০২০)। প্রায় তিন মাস পর ২০২০ সালের ২৫ জুন তিনি লিখিত জবাব দেন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত শুনানি নেওয়া হয় আরও প্রায় দুই মাস পর ২০২০ সালের ৯ আগস্ট। কিন্তু জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত বোর্ড করা হয়। বোর্ডের আহ্বায়ক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আলী কদর গত ২ মে যে প্রতিবেদন দেন, তাতে ডিসি সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়েছে’ বলে জানানো হয়। এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সুলতানা পারভীনকে ‘গুরুদণ্ড’ দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়ে গত ৮ জুন দ্বিতীয় কারণ দর্শাও নোটিশ জারি করা হয়। ২২ জুন দেওয়া সুলতানা পারভীনের জবাব বিবেচনা করে ১০ আগস্ট ‘লঘুদণ্ড’ হিসেবে দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। সুলতানা পারভীন ৬ সেপ্টেম্বর এই লঘুদণ্ডাদেশ মওকুফ করার জন্য রাষ্ট্রপতি সমীপে আপিল করেন এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি ‘সদয়’ হয়ে বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার দণ্ডাদেশ বাতিল করে তাঁকে অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি দেন গত ২৩ নভেম্বর।

সুলতানা পারভীনের খুঁটিটি কোথায়, তা আমরা জানতে পারিনি, তবে সেটার জোর যে বড় শক্ত, বোঝা যায়। কারণ, তদন্তে সব অভিযোগ প্রমাণিত হলো; তাঁকে গুরুদণ্ড দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দেওয়া হলো লঘুদণ্ড; কিন্তু এই লঘুর ভারও বইতে রাজি নন সুলতানা পারভীন; তিনি দণ্ড মওকুফ তো বটেই, অভিযোগের দায় থেকেও অব্যাহতি পেলেন। নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক পেলেন অশ্বডিম্ব, দেশের প্রতিবাদী সাংবাদিকদের গালে পড়ল চপেটাঘাত।

আমাদের সংবিধানের চতুর্থ ভাগের প্রথম পরিচ্ছেদের ৪৯ নম্বর ধারায় রাষ্ট্রপতিকে যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা দেওয়া আছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করার সুযোগ হয়তো নেই, কিন্তু তাঁর এ সিদ্ধান্তে সাংবাদিক সমাজ যে আহত, ক্ষুব্ধ, অপমানিত ও হতবাক; বেদনায় ভরা এ প্রতিক্রিয়া জানানোয় নিশ্চয়ই কোনো বাধা নেই।

রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষ পর্যায়ে এমন দুজন মানুষ আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় যাঁদের একজনকে ‘ভাই’, অপরজনকে অবলীলায় ‘আপা’ সম্বোধন করা যায়। সেই অধিকার থেকেই বলি, সব তদন্তে দোষী প্রমাণিত একজন ডিসিকে তাঁর অপরাধের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া কি এতটাই জরুরি ছিল? একজন ডিসি সুলতানা পারভীনকে প্রমাণিত অপরাধ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বাংলাদেশ কী পেল? বাংলাদেশের সম্মান ও একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর মর্যাদার চেয়ে একজন অপরাধী ডিসিকে দায়মুক্তির বিষয়টি কেন জরুরি হয়ে পড়ল? মহামান্য রাষ্ট্রপতির দপ্তর এসব প্রশ্নের জবাব বা ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য নয়। তবে সাধারণ মানুষের মনে এ প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে বলেই সেগুলো তুলে ধরা।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক আন্তর্জাতিক মানচিত্রে বাংলাদেশকে ‘আংশিক স্বাধীন’ বলে চিহ্নিত করা হয় অন্য অনেক কারণের পাশাপাশি একটি বড় কারণে যে বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের কোনো বিচার হয় না। মহামান্য রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত কি এ সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করল?

ধারণা করি, সুলতানা পারভীনের দায়মুক্তির পর তাঁর নির্দেশ পালনকারী অপর তিন কর্মকর্তার শাস্তিও নৈতিক বিচারে টিকবে না। আমাদের মাঝারি মানের আমলারাই যদি এতটা শক্তিধর হন; অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও আইনের জাল কেটে বেরিয়ে যান, তাহলে উঁচু পর্যায়ের আমলারা কতটা শক্তিশালী, সহজেই বোঝা যায়। তাঁদের হাতে দেশ বা মানুষ কেউই নিরাপদ নয়, বলাই বাহুল্য।

বিনয়ের সঙ্গে বলি, মহামান্য রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্ত দেশে ও বিদেশে এ রকম একটি ভুল বার্তা দিল যে বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের কোনো বিচার হয় না। বার্তাটি বিপজ্জনক এ কারণে যে দেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের মাত্রাটা আরও বাড়বে। বিশেষ করে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক ও আমলাদের যৌথ চক্র সাংবাদিক নির্যাতনে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। কারণ, এ চক্রই সত্যসন্ধানী পেশাদার সাংবাদিকদের শত্রু মনে করে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক আন্তর্জাতিক মানচিত্রে বাংলাদেশকে ‘আংশিক স্বাধীন’ বলে চিহ্নিত করা হয় অন্য অনেক কারণের পাশাপাশি একটি বড় কারণে যে বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের কোনো বিচার হয় না। মহামান্য রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত কি এ সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করল?

● মনজুরুল আহসান বুলবুল সাবেক সভাপতি, বিএফইউজে; সাবেক ভাইস চেয়ার, আইপিআই; সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *