আত্মসমর্পণ
বহুদূর থেকে হেঁটে এসেছি,
দেখ, আমাকে চিনতে পারো কিনা?
চুলে জটা বেঁধে গেছে, নিদ্রাহীন ক্লান্ত চোখ দুটি
ফুটে আছে তন্দ্রালু পপির মতো, নিকষ বিষণ্ণতায়।
ধুলোমলিন ছেঁড়া পোষাক, যত্নহীন রুক্ষ আঙুল, বাজে না সেতার,
বিধ্বস্ত পদযুগল ভুলে গেছে নৃত্যের কলা, কর্ণ অলংকারের মহিমা।
কোথায় তুমি? এগিয়ে এসে দেখ, আমাকে চিনতে পারো কিনা?
এবার আমি গৃহগামী, দাও, দাও, পরিচ্ছন্ন পোষাক এগিয়ে দাও
আমাকে স্নান করিয়ে ঘরে তুলে নাও তোমার,
বহুদূর থেকে হেঁটে এসেছি, এবার কিছুটা শান্তি চাই, তাই
জলযোগ শেষে আমি তোমারই কোলে ঘুমিয়ে পড়ব।
বুকের মধ্যে নিয়ত ডানা ঝাপটাচ্ছে যে আগুনপাখি,
আমি আর সইতে পারি না তাকে।
পর্যটকের দ্বিধা
আধা সংসারী মনটা আমার, আধা সন্ন্যাসী মন
দুই দিক থেকে রাহুর মতন, টানছে দুই জীবন।
কমলা রঙের রোদ্দুর আর চড়ুই পাখির ঘর,
কখনো অরোরা, হিমালয় আর স্তেপের ঐ প্রান্তর,
বসন্তের এই হাওয়ার মতোন প্রিয়তম চুম্বন
কিংবা শিশুর কোমল গায়ের দুগ্ধ-গন্ধক্ষণ
চাইছে হৃদয়, আবার বদলে যাচ্ছে খানিক পরেই
চোখ দুটো বুঁজে আফ্রিকা ঘুরে ফিরছি আবার ঘরেই।
দূরে?
এই দূরত্ব, এই দুর্যোগ ঘনঘটা
এনেছে তোমাকে আমার এতটা কাছে,
চোখ বুঁজে আছি, জানলার গ্রিলে মাথা
তোমার অনতিদূর।
দূরে নাকি কাছে?
কাছে নাকি দূরে?
বুঝছি না কিছু, অন্ধ হৃদয়পুর!
আমাকে দেখছ কি তুমি?
বুঝছ কি কতটা বিরহ ভাঙছে বুকে
মর্মর, চুরচুর?
স্বপ্নবর্ণনা
ট্রেনে চড়ে যাচ্ছি কোথাও, একা
না, একা নই, তুমিও আছো সাথে
ট্রেন আমাদের নামিয়ে দিল কোথায়?
সৌরভময় ফুলের বনে, রাতে।
আমরা দু’জন ফুলের বনে বনে
হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে এলাম রাত,
দুইয়ের চোখে জাগল দুইয়ের ঊষা
আলগোছে ধরা একে-অন্যের হাত।
বিকেল হলো সোনার আলোয় আলোয়
বলি আমি, “চলি, বিদায় দাও…”
বললে তুমি, “যাচ্ছো কোথায় একা?”
আমায় তোমার সঙ্গে আবার নাও।”
আমরা দু’জন চলতে চলতে ট্রেনে
একই এস্টেশনেই গেলাম নেমে,
হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে গেলাম রাত
আলগোছে ধরে একে-অন্যের হাত।
অপেক্ষা
আমি যাই না কোথাও, থামি। যেতে যেতে থামি। পাখিরা আসে, আমাকে তাওয়াফ করে তারা উড়ে যায় দক্ষিণে সমুদ্রের দিকে। আমি আমার ডালপালা নাড়াই; বলি, “এসো, এসো, প্রেম হলে এসো।” আর, আমি যাই না কোথাও৷ থামি। অশ্বত্থ হয়ে অপেক্ষা করি, কবে আমার শেকড় ছুঁয়ে একটি নদী যাবে কুলকুল করে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখি, আমার শেকড়ের কাছে পড়ে থাকে, উড়ে যাওয়া পাখিদের পুড়ে যাওয়া ছায়ার ভস্ম৷ আমি হাসি। বলি, “তোমাদের কাছে আমার কোনো প্রত্যাশা নেই।“ আমি শুধু অপেক্ষা করি সেই নদীর, যেমন করে গডোর জন্য অপেক্ষা করে ডিডি আর গোগো…..
বেদনা
বেদনা বনের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে থাকা ডোরা কাটা বাঘের মতো। জ্বলজ্বলে, লোলুপ, হিংস্রতায় ভরা চোখ। কিছুমাত্র সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। জানি আমরা, বেদনার আছে আমাদের ওপর সতর্ক দৃষ্টি। তবু আমরা এগিয়ে যাই বেদনার দিকেই। কেননা, শিকারে পরিণত হওয়াই আমাদের নিয়তি।
তুমি না থাকার মানে
দূরে থাকা মানে দূরে থাকা নয়,
বেশি করে আরও তোমার কাছেই থাকা,
তুমি নেই মানে মরুভূমি সব, পুরোটা বিকেল ফাঁকা;
তুমি নেই মানে মন-পাখিটার ডানা ঝাপটানো শুধু
তুমি নেই মানে কিছু নেই আমার
কেবল দীর্ঘশ্বাস।
তুমি নেই মানে হাতে হাত নেই, ওষ্ঠে নেই আর মধু
তুমি নেই মানে কিছু নেই আমার, ডানা ঝাপটানো শুধু,
তুমি নেই মানে আগের মতোন সবুজ নেই আর কিছুই
তুমি নেই মানে দূষিত বাতাসে
দিনমান হাঁসফাঁস।
ইচ্ছে পাথর
জেগে থেকেও বন্ধ রাখলে চোখ
কোন কালেই যায় না দেখা কিছু,
নিজের ভেতর বিন্দু-সমান একা
সিন্ধু-সমান স্বপ্ন পিছু পিছু।
আজ এখানে শব্দ ঝরা পাতার
বুকের ভেতর পথ হারাবার ডর,
কোথায় পাব ইচ্ছে-পাথরটারে?
খুঁজছি কী যে, ভীষণ স্বার্থপর।
কী হবে ঐ ইচ্ছে-পাথর দিয়ে?
অন্ধ লোকের চোখ সারাতাম, আর
নিজেই একটা শিশির বিন্দু হয়ে
ঘাসের গলায় হতাম অলংকার।
তারপরেতে যেই না বাড়ত বেলা
খুশি মনেই না হয় যেতাম ঝরে,
সবার কাছে ইচ্ছে-পাথর দিয়েই
যেতাম আমি ইচ্ছে-বিহীন মরে।
কে রেখেছে এসব হিসেব-নিকেশ
পর হল কে, কেইবা হল আপন?
নাইবা ছুঁলো এই তোমাদের হৃদয়
আমার স্বপ্ন, আমার জীবন যাপন।
তবুও শুনছি শব্দ ঝরা পাতার
বুকের ভেতর পথ হারাবার ডর,
কোথায় পাব ইচ্ছে-পাথরটারে?
খুঁজছি কী যে, ভীষণ স্বার্থপর!
এখন
এখন সময় খারাপ। এখন কবিতারা ঘরে নেই। এখন গদ্যেরা ঘুমে। এখন সস্তা জুতা পরি।
এখন হাতঘড়ি নেই। এখন স্মৃতিরা চিতায়। এখন চারপাশে ছাই। এখন কর্কশ চোখ।
এখন সত্যের জ্বর। এখন মেঘদল স্থির। এখন আয়না পারাহীন।
এখন কাকগুলো গম্ভীর। এখন সময় খারাপ।
এখন চুপ করে থাকি।
সেই কথাটি
সেই কথাটি অনেক অনেক গভীর,
ঐ যে সুনীল সমুদ্দুরের মতো,
কদম্ব আর হিজল ফুলের ঘ্রাণে
বুকের ভেতর আপনি বাড়ে ক্ষত।
টলটলে এক দীঘির কালো জলে
রোজই দেখি অন্য শান্ত মুখ,
সেই কথাটি যায় না বলা তাকে,
রোজই আমি অসুস্থ, উন্মুখ।
সেই কথাটি বলতে গেলেই তাকে
বুকের ভেতর নিঝুম আঁধার কেন?
বিজন বনে যায় না শোনা বাঁশি,
চোখ-সরোবর উথলে ওঠে যেন।
সেই কথাটি ভীষণ অন্যরকম,
বলতে গেলেই কেবল তপ্ত শ্বাস,
জ্বরের ঘোরেই শুধু যে তার নাম,
জপছে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস।
আহা! যদি আপনি এসেই নিজে
সেই কথাটি বলত দু’ চোখ বুঁজে,
দু’ হাত দিয়েই কঠিন করে বেঁধে,
নিতাম আমার অরণ্যটাই খুঁজে।
দিতাম কোমল শ্যামল ঘাসের মাঠ,
হৃদয় নদীর শীতল জল ও হাওয়া,
আসত যদি আমার টানেই কাছে
হতই না যে তার আর ফিরে যাওয়া।
কবিতার জন্ম
লাল কাঁকড়ার উচ্ছ্বাসে ভরা বেলাভূমিটা
দিগন্ত হতে দিগন্তে ঢলে সবিতা,
আঙুর রসের পাত্রে ফুটেছে
উদাসীন কিছু পদ্ম,
পুঁতির মতোন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কবিতা।
পেরিস্কোপের অপর প্রান্তে মেটাফোর
ক্যালিডোস্কোপে নকশা আঁকছে অনুপ্রাস,
বর্ণসুতোয় শব্দ পরিয়ে
ছুঁড়ে দিতে হবে বাক্য
শত শির যেন উঁচু করে আছে রাহুগ্রাস!
ইস্পিকারে নিচু গ্রামে বাজে বিঠোফেন
শুনছি না কিছু, মগজ আপ্লুত ভাবে,
রহস্য-রঙ চারদিক ঘিরে
তৈরি করেছে দুর্গ,
কতটা নিবিড় হলে তাকে ছোঁয়া যাবে?
অন্ধকূপের গান
শীত রাতে চুপ কিছু ভালো লাগা চুপ
জ্বালায় না ভাঙা মন সুগন্ধী ধূপ,
বুকফাটা কান্নায় স্বপ্নেরা তড়পায়
অশ্রুসিক্ত চোখ কী যে অপরূপ!
ডাহুকের ডাক আর কুয়াশার হাত
বিষণ্ণ হয়ে পড়ে এই শীত রাত,
জোছনার তিরোধানে উৎসব করে
কৃষ্ণপক্ষ তিথী নামে ঝুপ ঝুপ।
সযতনে লুকায়িত কৃষ্ণের বাঁশি
ইচ্ছেরা অসহায়, ঠোঁটে নেই হাসি,
একে একে ছুটি নেয় রূপকথা সব
নেই কিছু, আছে শুধু, এই অন্ধকূপ।
ছাতিম ফুলের ঘ্রাণে স্মৃতিগুলো ভাসে
শেষ রাতে ভুলে যাওয়া গান মনে আসে,
কলমের কালি হয়ে কাগজে ছড়ায়
দামহীন হৃদয়ের অভিমান খুব।
অযতনে পড়ে থাকে কত কত লেখা
একদিন জীবনের হয় পাঠ শেখা,
ক্রাচে ভর দিয়ে তাই দাঁড়াতেই হয়
ঝরুক বা না ঝরুক বারি টুপ টুপ।
ভবিষৎবর্ণনা
যদি বেঁচে থাকি, একদিন বুড়ো হয়ে যাব।
এই রাবার গাছটি তখন আর থাকবে না,
ফুটপাতগুলো থাকবে হয়তো ; এই দালান
ভেঙে আরেক নতুন দালান উঠাবে মালিক,
যদি আসি কখনো ভ্রমণে এদিকে, তাকাব
এদিক-ওদিক, স্মৃতি হাতড়াব এলোমেলো।
বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে, আমার
প্রিয় দীর্ঘশ্বাস, বলবে, “দেখ, দেখ, এইখানে…”।
তোমার থাকবে একটি মেয়ে, ফলিত
পদার্থবিদ্যায় পড়বে, উদাসীন বাবাটি তার
খবর নিতে ভুলে যাবে, ভুলে যাবে নিজের
খাবার খেতে; মেয়েটি তাকে মুঠোফোনে
দেবে বকে, “বাবা, ইউ আর নটি বয়।” বাবা
বলবে, “অলওয়েজ আই এম, মা।” এরকম
কথায় হঠাৎ একদিন, আমাকে তোমার
ঠিক ঠিক মনে পড়ে যাবে। পড়বে কি?
ঘুম এনে দাও চোখে
না হয় তুমি নাইবা দিলেই কথা
নাইবা পালন করলে আচার-প্রথা
গেলেই না হয়, গেলেই যথা-তথা
ইচ্ছে যেমন বলুক, বলুক লোকে।
বোকা আমি, আছিই তোমার কাছে
আগুন যেমন হাওয়ার কাছেই বাঁচে
আমার হৃদয় তোমার বুকেই আছে
হয়তো সুখে, নয়তো ভীষণ শোকে।
কখন কোথায় শিউলি-বকুল ঝরে,
খোঁজ রাখিনি বৃষ্টি কেমন পড়ে,
হৃদয় তো নেই, দেখব কেমন করে?
আমায় তবে ঘুম এনে দাও চোখে।
মৌখিক
জানো তুমি, আমি নই কোন
নির্মোহ নির্মোক-সর্বস্ব অস্তিত্ব আর,
আমার হৃদয়ে আছে-
দারুচিনি ঘ্রাণ, অসীম জলধি আসমানী ;
আছে রক্তিম ছোপ ছোপ সবুজ পাতাবাহার।
উঁকি দাও সেইখানে, তারপর-
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস রেখে চুপ করে বলে দাও,
নেই কোন সংশয় তোমার।
জানি আমি, হে সুন্দরতম মানুষ,
আমি জানি, তুমি আমার।
তবু, তবু স্পর্শের অতীত এক
অনুপম, মোহনীয় জড়তা যেন
গভীর বেদনার সুঁইয়ের মতোই
বিঁধে আছে হৃদয়ে আমার।