আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে থাকলেই কী কেবল তাকে দলের নেতা বলা যাবে? দলের জেলা-উপজেলা ও অন্য ইউনিট কমিটিতে যারা আছেন, তারা তাহলে কী? তাদের কী হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে আওয়ামী লীগ? এই প্রশ্ন এখন তৃর্ণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্রে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন বিব্রতকর মন্তব্য করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন সমালোচনার মুখে পড়েন। এ বিষয়ে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেই ক্ষোভ দেখা দেয়। এ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন আওয়ামী লীগের কেউ নন।
একই সুরে তাল মিলিয়ে আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের এক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলেছেন, দলের বিষয় নিয়ে কথা বলার তিনি কেউ নন। মোমেন তো দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কেউ না।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের এক নম্বর সদস্য এবং জেলা কমিটির উপদেষ্টা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বলেছেন বেফাঁস মন্তব্যকারী মোমেন আওয়ামী লীগের কেউ না।
তাহলে কি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছাড়া কেউ আওয়ামী লীগের নেতা নন? সরকারের এত বড় বড় মন্ত্রীদের আওয়ামী লীগ দলের নীতিনিধার্রণী পর্যায়ে জায়গা দিচ্ছে না। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি শিক্ষামন্ত্রী, ড. হাছান মাহমুদ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকা হাতে গোনা কয়েকজন মন্ত্রী আছেন।
এই রকম কেন্দ্রীয় পদধারী কয়েকজন নেতা ছাড়া বাকি সবাই আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কমিটিতে আছেন। তাহলে কি তাদের আওয়ামী লীগের নেতা বলা যাবে না?
যদি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছাড়া অন্য কোনো কমিটিতে থাকলে তিনি আওয়ামী লীগের কেউ না হন, তবে জেলা, থানা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কমিটি করা হয় কেন এবং তৃণমূল নেতাদের আওয়ামী লীগের প্রাণ বলার কারণ কী?
তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের মাথায় এখন এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানান প্রশ্ন।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও এমপি-মন্ত্রীদের ৯০ শতাংশের বেশি তৃণমূলের কমিটিতে আছেন। তাদের যদি নেতা হিসেবে অস্বীকার করা হয় তাহলে তো জেলা থেকে শুরু করে থানা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও ইউনিট কমিটির সবাইকে অস্বীকার করা হয়। যদি তারা আওয়ামী লীগের নেতা না হয়ে থাকেন তাহলে তারা কী? তারা কারা? তারা কোন দলের, তাদের নেতা কে?
সরকারের এমপি-মন্ত্রী হওয়ার পরেও যদি সরকারি দলের তৃণমূলের কমিটিতে থাকেন, তাহলে কেন তাদের অস্বীকার করা হচ্ছে! বিরোধী দলের নেতারা ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি-মন্ত্রী সবাই আওয়ামী লীগের হয়ে নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী প্রায় সবাই কোনো না কোনো কমিটিতে আছেন।
যেমন, গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং সাধারণ সম্পাদক গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন সবুজ। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার এক নেতা বলেন, যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ভালো হয়েছে। এই কমিটি নিয়ে কারো মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। কারণ কসবা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী। নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। গৃহায়ণ ও পূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য ।
নওগাঁ ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার একাধিক নেতাদের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক তারা বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা জেলায় থাকলে কমিটির মধ্যে একটা শৃঙ্খলা থাকে।
পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী এক সদস্য বলেন, ‘শ ম রেজাউল করিম আমাদের গর্ব। তিনি বহু বছর ধরে পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য। কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা থাকলেও তিনি জেলায় ছিলেন।’
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ুন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান আওয়ামী লীগের কার্যনিবার্হী সদস্য ছিলেন। এছাড়া গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা এবং বিগত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এরা কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন, কিন্তু সরকারে মন্ত্রী। তারা আবার বিভিন্ন জেলার কমিটিতে আছেন। তাহলে কি তারা আওয়ামী লীগের নেতা নন?
এভাবেই সামনে একের পর এক উদাহরণ এনে প্রশ্ন তুলছেন ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। কারণ তারা এতে বিভ্রান্ত বোধ করছেন। বিভ্রান্ত বোধ করছেন স্বয়ং সংশ্লিষ্ট নেতারাও। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে চান তারা। সূত্র: ঢাকাটাইমস

