শিরোনাম
বুধ. জানু ১৪, ২০২৬

দিনাজপুরে কৃষি খামারি অ্যাপসে বদলাচ্ছে চাষাবাদের চিত্র

দিনাজপুর প্রতিনিধি: দিনাজপুরে কৃষি খামারি অ্যাপসের ব্যবহার দিন দিন বাড়ায় কৃষি আবাদে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় চাষাবাদ সহজ হওয়ায় কৃষিকাজে আগ্রহী হয়ে উঠছেন শিক্ষিত তরুণরা। অনেকেই কৃষিকে এখন আধুনিক ও লাভজনক পেশা হিসেবে গ্রহণ করছেন। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে ফসলের ফলন ও গুণগত মান।

দিনাজপুর সদরের বড়াইল বনকালি এলাকায় শিক্ষিত যুবকদের সমবায় উদ্যোগে কৃষি খামারি অ্যাপস ব্যবহার করে আলু চাষ এখন এলাকাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কৃষি বিভাগের উদ্ভাবিত এই অ্যাপস ব্যবহার করে তারা ‘গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস’ বা উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করছেন। অ্যাপসের নির্দেশনা অনুযায়ী সুষম সার প্রয়োগ, উন্নত বীজ ব্যবহার, সীমিত কীটনাশক ও জৈব সারের ব্যবহার নিশ্চিত করায় স্বাবলম্বিতার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন তারা।

কৃষকরা জানান, এই অ্যাপসের মাধ্যমে জমিতে কোন সময়ে কতটুকু সার প্রয়োগ করতে হবে, কীটনাশক ব্যবহার প্রয়োজন কি না, কখন সেচ দিতে হবে—সবকিছুই নির্ধারিত থাকে। ফলে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ছে না। এতে যেমন উৎপাদন খরচ কমছে, তেমনি পরিবেশ ও জমির উর্বরতা রক্ষা পাচ্ছে।

অ্যাপস ব্যবহারকারী তরুণ কৃষক বসন্ত রায় জানান, কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে তিনি স্মার্টফোনে কৃষি খামারি অ্যাপস ডাউনলোড করেন। অ্যাপসের নির্দেশনা অনুযায়ী রাসায়নিক সার, বালাইনাশক ও জৈব সার ব্যবহার করে তিনি ৩৩ শতক জমিতে আলু চাষ করেছেন। এতে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ কম হয়েছে। পাশাপাশি গাছের বৃদ্ধি ও জমির অবস্থা দেখে তিনি আশা করছেন, এবার ফলন আগের চেয়ে অনেক ভালো হবে।

একই এলাকার অ্যাপস ব্যবহারকারী চাষি রাখাল চন্দ্র রায় বলেন, এলাকার ১৫ জন যুবক একত্রিত হয়ে প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে সমবায় ভিত্তিতে আলু চাষ করেছেন। সবাই একই সময়ে আলু রোপণ এবং অ্যাপস অনুযায়ী সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করছেন। আলুর বয়স এখন প্রায় ৪৫ দিন হয়েছে। আরও ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে উত্তোলন করা যাবে। ক্ষেতের অবস্থা দেখে তারা আশাবাদী যে এবার ফলন ভালো হবে।

তরুণ কৃষক দীপু রায় বলেন, তাদের পূর্বপুরুষরা কৃষিকাজ করলেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা অভ্যস্ত নন। স্মার্টফোনের মাধ্যমে কৃষি অ্যাপস ব্যবহার করে তিনি তার বাবাকে জমিতে সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগের পরামর্শ দেন। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় কমছে, অন্যদিকে ফলনও বাড়ছে। তিনি জানান, বিঘাপ্রতি প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে।

সদরের চেহেল গাজী ইউনিয়নের ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেশবন্ধু মহন্ত বলেন, এলাকায় অধিকাংশ চাষি শিক্ষিত ও স্মার্টফোন ব্যবহারকারী হওয়ায় কৃষি খামারি অ্যাপস দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বর্তমানে এই এলাকায় প্রায় ৮০ বিঘা জমিতে অ্যাপস ব্যবহার করে আলু চাষাবাদ হচ্ছে। এতে রোগবালাই কমেছে, জমির উর্বরতা বেড়েছে এবং চাষিরা জৈব সার ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন।

দিনাজপুর সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসুদ তুষার জানান, চলতি মৌসুমে সদর উপজেলায় প্রায় সাড়ে চারশ হেক্টর জমিতে কৃষি অ্যাপস ব্যবহার করে আলু চাষ করা হয়েছে। এতে প্রায় ১ লক্ষ্ ৬৩ হাজার টাকার রাসায়নিক সার কম ব্যবহার হয়েছে এবং সরকারের ভর্তুকির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। অ্যাপসের মাধ্যমে সুষম সার ব্যবহারের ফলে কীটনাশকের প্রয়োজনও কমছে এবং ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কৃষি জমির আলুর ক্ষেত পরিদর্শন করতে এসে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, সরকার কৃষি খামারি অ্যাপস উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষিকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও লাভজনক করতে চায়। চাষিরা এই অ্যাপসের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করলে উৎপাদন খরচ কমবে, জমির উর্বরতা বাড়বে এবং অধিক ফলন নিশ্চিত হবে। তিনি বলেন, গ্রামগঞ্জের শিক্ষিত চাষিদের মধ্যে এই অ্যাপস ছড়িয়ে দেওয়া গেলে দেশের কৃষিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *