ঋদি হক, চট্টগ্রাম: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেন। তিনি বাঙালির ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির হয়েছিলেন। ব্রিটিশের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ভারতমাতাকে মুক্ত করতে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেছিলেন। ব্রিটিশরাজ তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম আজও হেঁটে চলেছে তাঁর স্মৃতির পথ ধরেই। সূর্য সেনের সেই স্মৃতিধন্য চট্টগ্রামে এ বারেও বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক পূজার আয়োজন।
করোনা-আবহেও সাধারণের মানুষের মধ্যে রয়েছে উচ্ছ্বাস, উন্মাদনা। শরতের শুভ্রতায় আর দিন দশেকের মধ্যেই মায়ের কাছে প্রার্থনায় নতজানু হবে সনাতনধর্মালম্বী মানুষ। করোনাকে সঙ্গী করে সতর্কতার সঙ্গে মাকে অঞ্জলি-সহ সকল কার্য সম্পাদনের বার্তা এরই মধ্যে পৌছে দেওয়া হয়েছে দেশের প্রতিটি মণ্ডপে। বিশ্বব্যাপী মহামারির কবল থেকে মানবজাতিকে রক্ষার প্রার্থনা মাথায় রেখেই সাজানো হয়েছে পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের বিভাগীয় যুক্ত সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি শ্যামল কুমার পালিত জানালেন, করোনা-আবহের কারণেও পূজার সংখ্যা কমেনি। চট্টগ্রাম শহর ও বিভাগ মিলিয়ে মোট ৪১৪২টি পূজার আয়োজন হচ্ছে। শেষবেলায় আরও বাড়ার সম্ভাবনার কথা জানালেন শ্যামলবাবু।
শ্যামলবাবু বললেন, করোনাকালীন সময়েও চট্টগ্রামে পুজোর সংখ্যা কমেনি। বরং এ ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রা যোগ হতে চলেছে। করোনা মহামারি থেকে মানবজাতিকে রক্ষায় এ বারের পুজায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন থাকবে। ভাবগম্ভীর পরিবেশে মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করেই অঞ্জলি-সহ সকল আয়োজন সম্পন্ন করতে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম ঘুরে দেখা গেল, মৃত্শিল্পীদের প্রতিটি কারখানায় প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় সম্পন্ন। বাকি রয়েছে রঙতুলির শেষ আঁচড় দেওয়া ও মাকে সাজানোর কাজ। ডালাভর্তি অলংকার আনা হয়েছে। দু’-এক দিনের মধ্যেই মাকে সাজানোর কাজে হাত লাগাবেন প্রতিমাশিল্পীরা।
৬০ বছরে রূপশ্রী
৩৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা মাথায় নিয়ে নগরীর দেওয়ানজি পুকুরপাড়ের দত্তাত্রেয় আখাড়ার ‘রূপশ্রী’তে প্রবেশ করেই মনটা শান্ত হয়ে গেল। এতক্ষণ যে প্রচণ্ড তাপদাহটা আঁকড়ে ধরেছিল তা আর নেই। নানা আকারের সার সার প্রতিমা। তার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতেই চোখে পুরো লেন্সের চশমা, মুখে স্মিত হাসি নিয়ে এগিয়ে এলেন ছ’ ফুটের মতো লম্বা মধ্যবয়সি ব্যক্তিটি। বিনয়ের সঙ্গে জানালেন, তিনিই অধ্যাপক সুনীলচন্দ্র পাল।
‘রূপশ্রী’র অন্যতম কর্ণধার সুনীলচন্দ্র পাল।
অধ্যাপক সুনীলচন্দ্র পাল ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিটি কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রধানের পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনিই সবার বড়ো। মেজো ভাই রতনচন্দ্র পালই মূলত পারিবারিক ব্যবসার দেখভাল করেন। অপর জন অরুণকৃষ্ণ পাল পেশায় শিক্ষক এবং সবার ছোটো ভাই একটি ফুড কোম্পানির কেমিস্ট অ্যান্ড কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত।
একটুখানি সময় ভেবে নিয়ে সুনীলবাবু ঢুকে গেলেন ইতিহাসের গলিপথে। বাবা রাধাশ্যাম পাল ফরিদপুরের সন্তান হলেও অবিভক্ত ভারতে কলকাতার বেলেঘাটায় প্রতিমার কারখানা ছিল। সুনীলবাবুর বড়োমামা পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত ভাস্কর রমেশচন্দ্র পাল। ডা. বিধানচন্দ্র রায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মাতঙ্গিনী হাজরা, মাস্টারদা সূর্যসেন, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত-সহ দেশমাতৃকার বহু গুণীসন্তানের মূর্তি গড়েছেন রমেশচন্দ্র পাল। বাবা-মামাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই সুনীলবাবুরা এই পেশাকে ধরে রেখেছেন। চট্টগ্রামের বিখ্যাত সব মণ্ডপের প্রতিমা যে ‘রূপশ্রী’তেই গড়তে হবে।
প্রতিমা প্রায় তৈরি। বাকি শুধু গয়নার সাজ।
এ বারের করোনায় প্রতিমার সংখ্যা তেমন একটা না কমলেও আকারে ছোটো হয়েছে। চট্টগ্রামের সকল ঐতিহ্যবাহী পুজোমণ্ডপের প্রতিমা গড়া হয়ে থাকে এখানে। কিন্তু এ বারে মহামারির ধাক্কায় প্রতিমার আকার তুলনামূলক ছোটো হওয়া দাম কমে এসেছে। তার পরও চট্টগ্রামে পুজোর আমেজে যে ভাটা পড়েনি এটাই সুনীলবাবুর সান্ত্বনা।
জমজমাট পুজোর কেনাকাটা
পুজো উপলক্ষ্যে কেনাকাটায়ও কমতি নেই। নগরীর দেওয়ানি পুকুরপাড়ের ঐতিহ্যবাহী ‘দত্তাত্রেয় আখাড়া’র অধ্যাপক সুনীলচন্দ্র পালবাবুদের প্রতিমা কারখানা থেকে বেরিয়ে আসতেই দেখা মিলল প্রচুর শপিং ব্যাগ হাতে নানা বয়সি মানুষের। সামনে হাঁটাপথে এগিয়ে যেতেই দেখা গেল অর্ণব ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের বাইরে মানুষের জটলা। কারণ, কেনাকাটার এতটাই ধুম যে এখানে ভিড় ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করাটা কঠিন। মালিক গোপালবাবু হাসিমুখে জানালেন, তাঁরা খুবই আনন্দিত। সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত বেচাকেনা চলছে। জমজমাট পূজার কেনাকাটা। চট্টগ্রাম শহরে।
অনেক কেনাকাটা করেছেন অনুরাধা দেবী। কয়েক ব্যাগ কেনাকাটা করে হাসিমুখে বিল পরিশোধ করতে এসে জানালেন, পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা করছেন। পুজো শুরুর দু’-এক দিন আগে আরেক পাক কেনাকাটার আশা তাঁর। অর্ণব ডিপার্টমেন্টাল স্টোর হচ্ছে ‘এক ছাদের তলায় সব’। শাঁখা-সিঁদুর থেকে শুরু করে সকল কিছুই মেলে এখানে। কোনো পরিবার এই দোকানে এসে সব কেনাকাটা করে নিতে পারেন এক সঙ্গে। বেচাকেনার এতটাই চাপ, দোকানের প্রায় জনাকুড়ি কর্মচারীর দম ফেলার সুযোগ নেই।
চট্টগ্রাম শহরে ২৫৪টি পুজো
চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি প্রতিমা গড়ার কারখানা রয়েছে। বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদের বিভাগীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি শ্যামল কুমার পালিত জানান, চট্টগ্রামে মোট যে ৪১৪২টি পূজার আয়োজন হয়েছে তার মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে হচ্ছে ২৫৪টি পুজো। বাকিগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ১৫২৭ এবং বিভাগের অন্য জেলাগুলোয় ২৩৬১টি।

