একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বাংলাদেশ গড়তে হলে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। সোমবার বিকেল ৩টায় মিরপুর মুক্ত দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক ওয়েবিনারে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি ও লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির এসব কথা বলেন।
প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি মিরপুর মুক্ত দিবস পালন করে। করোনা মহামারির কারণে এ বছর মিরপুরের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য জনসমাবেশ ও র্যালির পরিবর্তে ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয়েছে। ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন শিল্প প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহমেদ মজুমদার।
৫০ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন মিরপুর মুক্ত করার যুদ্ধে বরেণ্য চিত্রনির্মাতা ও কথাশিল্পী জহির রায়হান, লেফটেন্যান্ট সেলিম ও পুলিশের ডিএসপি লোধীসহ যে সব মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন তাদের মহান আত্মদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকার-আলবদরদের যে সব সদস্য আত্মসমর্পণ না করে অবাঙালি অধ্যুষিত মিরপুরে অবস্থান নিয়েছিল তাদের দখল থেকে মিরপুর মুক্ত করতে গিয়েই জহির রায়হানসহ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, রাজাকার, আলবদর প্রভৃতি ঘাতকদের দল ও বাহিনী সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে আত্মগোপনে থেকে মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র ও অন্তর্ঘাতে লিপ্ত ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী তার সহযোগীরা ১৯৭২-এ প্রণীত বাংলাদেশে সংবিধানে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং ‘৭১-এর ঘাতক দালালদের বিচার আরম্ভ করেছিলেন, যা ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু ও ৪ জাতীয় নেতার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমানের দ্বারা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্মূল কমিটির দীর্ঘ ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আরম্ভ করেছেন, সংবিধানের বিলুপ্ত মূলনীতিসমূহ পুনঃস্থাপন করেছেন কিন্তু ধর্মের নামে রাজনীতির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা সংবিধানে এখনো পুনঃস্থাপিত হয়নি। যার কারণে ৭১-এর গণহত্যাকারী, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীরা এখনো রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে ধর্মের নামে হত্যা, সন্ত্রাস, নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বাংলাদেশ গড়তে হলে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। অবিলম্বে মিরপুরের দখলিকৃত বধ্যভূমিগুলো পুনরুদ্ধার করে সে সব জায়গায় শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে হবে। ৭১-এর গণহত্যাকারীদের বিভিন্ন সংগঠনসহ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত আরম্ভ করতে হবে। বিভিন্ন মাধ্যমের পাঠ্যপুস্তকে ৭১-এর গণহত্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা সর্বক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন থাকতে হবে। তবেই আমরা বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধের শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে পারব।’
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শিল্প প্রতিমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহমেদ মজুমদার বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ৪ মূলনীতির ভিত্তিতে দেশকে স্বাধীন করেছেন এবং সংবিধান প্রণয়ন করেছেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান সেই সংবিধানকে শুধু ক্ষতবিক্ষত করে নাই বরং ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ জন্য জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচার দাবি করছি।
ঢাকা ১৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আগা খান মিন্টু এমপি বলেন, ”আমি ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি মিরপুরকে মুক্ত করার জন্য সম্মুখ সমরে অংশ নিই। মিরপুরে রাজাকার, আলবদররা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। আমরা ৩টি গ্রুপ মিলে মিরপুরকে হানাদারমুক্ত করার জন্য একসঙ্গে লড়াই করি। ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণের পর জল্লাদরা বিহারিদের সঙ্গে মিরপুরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরাও যুক্ত হয়ে যুদ্ধ ফেরত মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা আরম্ভ করলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা ২৯ জানুয়ারি পাক হানাদার, রাজাকার, আলবদর ও বিহারিদের প্রতিহত করে মিরপুর মুক্ত করি। আমাদের সকলের দাবি মিরপুরের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী নগর’ রাখা হোক এবং প্রধান সড়কগুলো শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করা হোক।
আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন ঢাকা ১৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আগা খান মিন্টু, মিরপুরের শহীদ সাংবাদিক আবু তালেবের পুত্র খন্দকার আবুল আহসান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ড-এর কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তরের ১২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুরাদ হোসেন, ‘মিরপুরের ১০টি বধ্যভূমি’ গ্রন্থের প্রণেতা সাংবাদিক মিরাজ মিজু, ‘কল্যাণপুর গণহত্যা’ গ্রন্থের লেখক আলী আকবর টাবী, আমরা নতুন প্রজন্ম-এর সভাপতি অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম কিরণ ও নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল।

