সম্প্রতি সিলেটের এমসি কলেজে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণসহ বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু ধর্ষণের ঘটনায় ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। কয়েকটি ঘটনায় ভাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও পড়েছে বিব্রত অবস্থায়।
এরইমধ্যে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন দল হিসেবে তারা দায় এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
সিলেটের এম সি কলেজ ছাত্রাবাসে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নাম আসে। দেশজুড়ে তোলপাড় করা এই ঘটনার মধ্যেই আরও বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তবে গত রবিবার নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের একটি ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে প্রধান আসামিসহ স্থানীয় একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর চারজনকে নোয়াখালী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-পুলিশ।
এদিকে বেগমগঞ্জের ঘটনায় নয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে থানায়। বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি হারুনুর রশীদ জানান, নির্যাতনের শিকার ওই নারী বাদী হয়ে রোববার রাতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করেন। সেখানে ৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা হলেন- বাদল, মো. রহিম, আবুল কালাম, ইস্রাফিল হোসেন, সাজু, সামছুদ্দিন সুমন, আবদুর রব, আরিফ ও রহমত উল্যা। তাদের সবার বাড়ি বেগমগঞ্জে।
আসামিদের মধ্যে রহিম ও রহমত উল্যাকে নোয়াখালী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জেলার পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন জানান। আর র্যাব-১১ এর একটি দল সোমবার ভোরে ঢাকা থেকে প্রধান আসামি বাদলকে এবং নারায়ণগঞ্জে থেকে ওই চক্রের দলনেতা দেলোয়ারকে গ্রেপ্তার করেছে বলে র্যাব সদর দপ্তরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ জানান।
বেগমগঞ্জে নারী নির্যাতনের ঘটনায় সোমবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে। শাহবাগে সকাল থেকে ছাত্র অধিকার পরিষদ ও প্রগতিশীল ছাত্রজোটসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রদল। বিক্ষোভকারীরা দিনভর লাঠি মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করে।
‘সরকার ক্ষমতায় কীভাবে দায় এড়াবে?’
প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলাকালীন সচিবালয়ে এ বিষয়ে কথা বলেন ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ধর্ষণের সঙ্গে সরকারি দল সমর্থিত ছাত্র-সংগঠনের নেতাকর্মীদের নাম আসার বিষয়ে জানতে চাইলে কাদের বলেন, ‘সরকার ক্ষমতায় কীভাবে দায় এড়াবে? সরকার এটাকে আবার প্রশ্রয়ও দিচ্ছে না। প্রত্যেকটি ব্যাপারে সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ দিয়ে এসব ঘটনায় যারাই জড়িত থাক, আমাদের দলীয় পরিচয়েও কেউ থাকে অবশ্যই তাকে আইনের আওতায় শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সেটা শুধু মুখে বলা হচ্ছে না বাস্তবেও কার্যকর করা হচ্ছে।’
এসময় সব ইস্যু নিয়ে রাজনীতি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্তত এই ধরনের একটি ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
অনলাইন থেকে ভিডিও সরানোর নির্দেশ
এদিকে অনলাইন থেকে নোয়াখালীর ঘটনার ভিডিও সরিয়ে নিতে বিটিআরসিকে নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। পাশাপাশি বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে ভিডিওটি পেনড্রাইভ বা সিডিতে সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি করা নির্যাতনের এ ঘটনা নজরে আনার পর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. মহি উদ্দিন শামীমের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলসহ এ আদেশ দেন।
এছাড়া এ ঘটনায় করা মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্যাতিত নারী ও তার পরিবারকে সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে নোয়াখালীর পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। একইসঙ্গে ওই নারীর নিরাপত্তা, জবানবন্দি নেওয়া, দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণসহ সার্বিক ঘটনায় স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো অবহেলা আছে কি না তা অনুসন্ধানে নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি করে দিয়েছে হাইকোর্ট। কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে হাই কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। জেলার সমাজ সেবা কর্মকর্তা ও চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজের অধ্যক্ষকে কমিটিতে রাখা হয়েছে।
জেলায় জেলায় বিক্ষোভ
নোয়াখালীর নারীকে নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এর প্রতিবাদে সারাদেশে বিক্ষোভ করেন নানা শ্রেনী পেশার মানুষ। ঘটনাস্থল নোয়াখালী, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, মাগুরাসহ বেশিরভাগ এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। জেলা পর্যায়ে দিনে বিচ্ছিন্ন সময়ে কর্মসূচি পালিত হলেও শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে দিনভর বিক্ষোভ হয়েছে।
শাহবাগের বিক্ষোভে বক্তারা, প্রায় একমাসেও এই ঘটনা উদঘাটন না হওয়া এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমালোচনা করেন। গ্রেপ্তারকৃতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিতের দাবি করেন তারা।
সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতাকর্মীরা শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে জড়ো হতে থাকে। এসময় প্রায় শতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত হলে মিছিল সহকারে জাদুঘর থেকে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন তারা। তবে শাহবাগে অবস্থান করলেও কোন যান আটকে না দিয়ে চলাচলের জায়গা করে বিক্ষোভকারীরা।
অন্যদিকে পূর্বোঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী দুপুর বারোটায় জাদুঘরের সামনে ‘ধর্ষণ ও নিপীড়ন বিরোধী ছাত্র জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল এবং সমাবেশ করে বাংলাদেশ ছাত্র, যুব শ্রমিক অধিকার পরিষদ। সমাবেশে সংগঠনটির প্রায় সহস্রাধিক নেতা-কর্মী অংশ নেয়।
কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা জামান বলেন, ‘যে রাষ্ট্র নারীকে নিরাপত্তা দিতে পারে না সে রাষ্ট্র উন্নয়নশীল রাষ্ট্র বলে বিশ্বাস করি না।’ যারা ধর্ষণের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানান এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।

