হাবিবুর রহমান, ঢাকা: বাংলাদেশের উপকূলে ধেয়ে আসছে ভারত মহাসাগরে সৃষ্টি হতে যাওয়া লঘুচাপ ঘূর্ণিঝড় অশনি। এই পরিস্থিতিতে চোখ রাঙাচ্ছে বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি’। ইতিমধ্যে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয়েছে একটি ঘূর্ণাবর্ত। ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণাবর্তটি প্রবল সাইক্লোনে রূপান্তরিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় আঘাত হানতে পারে।
জানা গেছে, দক্ষিণ আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপের সৃষ্টি হয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় এটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিবে। এটির নাম দেয়া হয়েছে ঘুর্ণিঝড় ‘অশনি’। ভারতের আবহাওয়া অফিস এমন খবর জানিয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের আবহাওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে।
উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আগামী ১০ মে রাতে ‘অশনি’ উড়িষ্যা ও অন্ধ্র উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছাবে। তবে এটি কিছুটা পূর্বদিকে দিক পরিবর্তন করে উপকূলে আঘাত হানতে পারে ১১ মে। যে গতিপথ ধরে লঘুচাপটি অগ্রসর হচ্ছে, এতে বাংলাদেশের উপকূলে অশনির আঘাত হানার সম্ভাবনা কম। এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও বড় ধরনের প্রভাব নাও পড়তে পারে।
ভারতের আবহাওয়া বিজ্ঞানী আনন্দ কুমার দাস জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়টি কেন্দ্রে সর্বোচ্চ গতি উঠতে পারে ১০০ কিলোমিটার। সাগর প্রচণ্ড বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠবে বিধায় সব মাছ ধরা নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলে ফিরে আসতে হবে। এ সময় ভারী বৃষ্টিপাত হবে উড়িষ্যায়।বাংলাদেশের আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম জানান, দক্ষিণ আন্দামান সাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটি আরও ঘণীভূত হতে পারে। তাই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে পরবর্তী নিদের্শনা পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি’ উত্তর-পূর্ব দিকে ভারতের উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা-খুলনা জেলায় আঘাত হানতে পারে। নিম্নচাপে রূপ নেওয়ার পর এটির গতিপথ কোন দিকে যাবে তা জানা যাবে।কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সাস্টেনিবিলিটির আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল (পলাশ) বলেন, এই মুহূর্তে ঘূর্ণাবর্তটি অবস্থান করছে দক্ষিণ আন্দামান সাগর এবং সন্নিহিত এলাকায়। গত ২৪ ঘণ্টায় আমেরিকা ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেলগুলো থেকে প্রাপ্ত পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, ঘূর্ণিঝড়টি নিম্নচাপ থেকে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি’ সৃষ্টি হবে ৭ মে।
সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির স্থলভাগে আঘাত করার সময় তিন দিন পিছিয়েছে। ঘূর্ণিঝড়টির গতিমুখও পরিবর্তন হয়েছে। ১৪ মে সকাল থেকে ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবনের ওপর দিয়ে (ইউরোপিয়ান মডেল অনুসারে) ও আমেরিকান মডেল অনুসারে ১৩ মে দুপুরের পর থেকে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী উপকূল দিয়ে স্থলভাগে আঘাতের আশঙ্কার কথা নির্দেশ করছে। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির স্থলভাগে আঘাত করার সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ উঠতে পারে ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার। ইউরোপিয়ান মডেলের পূর্বাভাস সঠিক প্রমাণিত হলে ঘূর্ণিঝড়টি সাতক্ষীরা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জেলাগুলো লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে। পক্ষান্তরে আমেরিকান মডেলের পূর্বাভাস সঠিক প্রমাণিত হলে চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতে প্রভাব বেশি পড়বে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানান, ভারত মহাসাগরের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে সৃষ্ট সাইক্লোন এ মাসেই লঘুচাপে রুপান্তরিত হতে পারে। আশঙ্কা আগামী ১১ মে ঘূর্ণিঝড়টি উত্তর-পূর্ব দিকে ভারতের উড়িষ্যা, পশ্চিম বাংলা হয়ে সাতক্ষীরা জেলায় আঘাত হানতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আছে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী জানান, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অবহিত করা এবং গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে সেল্টার সেন্টারগুলো প্রস্তুত করতে হবে। এটি মোকাবিলায় আমাদের সেই ক্যাপাসিটি আছে এবং প্রস্তুতি আছে। আশা করি আমরা সুন্দরভাবে এটি মোকাবিলা করতে পারব। পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আলোচনায় বসে দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তাদের দাবি, দেশে ১৪ হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত আছে। সেখানে ২৪ লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে।
স্মরণযোগ্য, মে মাস মানেই রাক্ষুসে, সর্বনেশে ঝড়ের মাস। ফ্ল্যাশব্যাকে চোখ রাখলে ট্র্যাক রেকর্ডটা এই রকম :২০০৯ সালের ২৫ মে ধেয়ে এসেছিল প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’। যার বীভৎসতায় ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছিল সুন্দরবন। ১১ বছরের ব্যবধানে ২০২০ সালে এই অঞ্চলে পুনরায় আছড়ে পড়েছিল ‘আম্ফান’। সেটাও ছিল এই মে মাস। ২০ মে! পরের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের ২৬ মে হাজির হয়েছিল ‘ইয়াস’। এবার আসছে ‘আসানি’। নামটি শ্রীলঙ্কার দেওয়া। ‘আসানি’ মানে ক্ষুব্ধ।