টানা তৃতীয় বারের মতো ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। দলটির জোটের রাজনীতির অন্যতম একটি হলো চৌদ্দ দলীয় জোট। অন্যটি হলো জাতীয় পার্টিকে নিয়ে মহাজোট। প্রায় তিন দশক ধরে রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগের লড়াই ছিল প্রধানত বিএনপির সঙ্গে। এ লড়াইয়ে ১৪-দলীয় জোট-মহাজোট ছিল আওয়ামী লীগের মিত্র।
কৌশলটি ছিল, নিজের বলয় যত দূর সম্ভব বিস্তৃত করা এবং বিএনপিকে সঙ্গীহীন বা কোণঠাসা করা। তবে তৃতীয় বারের মতো ক্ষমতায় এসে চৌদ্দ দলের কোনো নেতাকেই রাখা হয়নি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও জোটের নেতারা ক্ষমতাবিহীন রয়েছেন। এ নিয়ে জোট নেতাদের মধ্যে চলছে ক্ষোভ-বিক্ষোভ, মান-অভিমান। জোট নেতাদের মন্তব্য হচ্ছে আমিষের রাজ্যে নিরামিষের মতো দিন পার করছেন। তাদের বক্তব্য সরকারের কেউ শুনছেন না জোটের কথা।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, চলতি বছরে মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই শূন্যতা কিছুটা পূরণ করেছেন বর্তমান ১৪-দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য আমির হোসেন আমু। তাকে কয়েক মাস আগে জোটের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু একাদশ সংসদে মন্ত্রিসভা গঠনের পর চাওয়া-পাওয়ার গরমিল নিয়ে শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে টানাপোড়েন শুরু হয়। কিন্তু মোহাম্মদ নাসিম তা ভালোভাবে সামলে নেন, সবার অভিমান ভাঙিয়ে জোটের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে থাকেন। দিবস ও ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি নিয়েও মাঠে সরব ছিলেন তিনি। শরিকদের চাঙ্গা রাখতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশাপাশি নিজের ধানমণ্ডির বাসভবনে নিয়মিত আলোচনায় বসতেন। সেই আলোচনাও এখন আর হয় না বলে রয়েছে নানা অভিযোগ।
আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিক জোটের শরীক দলগুলোকে চাঙ্গা করতে দলীয় নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চৌদ্দ দলীয় জোটের কাউকে না রাখা হলেও ভবিষ্যতে রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে দলটির সিনিয়র নেতারা জানান। জোটের রাজনীতি শক্তিশালী করতে আওয়ামী লীগও বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে বলে জানা গেছে।
এদিকে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক চৌদ্দ দলের এক নেতাকে ফোন করে বলেছিলেন,‘ চৌদ্দ দলের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার জন্য আলোচনা এনেছেন। চৌদ্দ দলকে আরেকটু সজাগ রাখার বিষয়গুলো আলোচনা করেছেন।’ চৌদ্দ দলের এক নেতা বলেন, আমাদের যে মিটিং হয় সেখানে কিছু কিছু নেতা আছেন, তাদের মধ্যে জোট ভাঙ্গার তেমন কোনো লক্ষণ নেই।
এই নেতা আরো বলেন, জোট যে অবস্থানে আছে সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে গিয়ে কী করবে? শেখ হাসিনার যে আদর্শের যদি অন্য কেউ একই আদর্শের থাকত তাহলে বিকল্প হিসেবে গড়ে উঠত। আওয়ামী লীগের আদের্শের সাথে মিল থাকায় চৌদ্দ দলের আদর্শের মিল থাকা মূলত এই জোটটি ভাঙছে না।’ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুব্ধ হলে কেউ বিকল্প হিসেবে নিতে পারেন।
চৌদ্দ দলের অপর এক নেতা বলেন, মোহাম্মদ নাসিমকে দিয়ে যে প্রাপ্ত হয়েছে আমির হোসেন আমুকে দিয়ে তা হবে না। আমুর চেয়ে মোহাম্মদ নাসিম অনেক তরুণ ছিলেন। আমু বর্ষিয়ান জনতা। বয়সও অনেক। এই বয়সে তিনি জোটের জন্য অনেক করছেন। প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। স্বশরীরে উপস্থিত হতে না পারলেও ভার্চুয়ালে তিনি নিয়মিতভাবেই মিটিং ও আলোচনা সভা করছেন। যার কাছ থেকে ৪০-৫০ বছরে প্রাপ্য, ৬০ বছরে যে প্রাপ্য আবার ৮০ বছরের মানুষের কাছে সেই প্রাপ্যতা আশা করা যায় না। তার কাছ থেকে অভিজ্ঞতা আমরা নিতে পারছি। তবে নিয়মিত বৈঠক করতে পারলে জোটের রাজনীতি আরো শক্তিশালী হতো।
এ প্রসঙ্গে ওয়ার্কার্স পাটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, করোনার মধ্যেও চলতি বছরের অনেক কর্মসূচিতে আমরা অংশগ্রহণ করেছি। তবে যারা চৌদ্দ দলীয় জোটে রয়েছেন তারা অনেকেই বয়স্ক। বর্তমান সরকার জোটের সরকার না। এটা আওয়ামী লীগ সরকারে রুপান্তরিত হয়েছে। সরকারের কাছে আমাদের কোনো প্রত্যাশাও নেই।
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, করোনাকালীন অবস্থাতে যতটুকু সম্ভব আমরা দলগতভাবে এবং চৌদ্দ দলের জোটগতভাবে মোটামুটি সক্রিয় ছিলাম। এ সময় ব্যক্তিগতভাবে আলাপ-আলোচনা এবং ভার্চুয়ালে আলোচনা সভা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, সরকারের সাথে চৌদ্দ দলের সম্পৃক্ততা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানেন। আমরা চৌদ্দ দলীয় জোট রাজনৈতিভাবে আছি। যদিও কথা চলে আসে, ‘নির্বাচন এক সাথে, আন্দোলন এক সাথে। ‘সবগুলো এক সাথে হলে সরকারের আপনাদের রাখা হয়নি’-এমন প্রশ্নের দিলীপ বড়–য়া বলেন, ‘এটা আমাদের জোট নেত্রী জানেন। আমাদের কিছু বলার নেই।’
জাসদ (একাংশ) সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া বলেন, ‘সংবিধানে ধর্মকে স্বীকৃতি দেয়া আছে, সংবিধানে কর্তিত্ব শাসনের সুযোগ আছে। যার ফলে এখন কর্তব্যপরায়ন রাজনীতি সচল আছে। এটা থেকে বের হওয়ার জন্য অনেকগুলো সংস্কারের প্রয়োজন আছে। এই সংস্কারগুলো লিবারেল মাইণ্ড নিয়ে করা হয় তাহলে এখানে রাজনীতির পরিবর্তন হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা জোটের ভবিষ্যৎ কিছু দেখি না। অতীতের সফলতায় অনেকের অংশগ্রহণ আছে। যারা নেতৃত্ব দিয়েছে তাদেরও অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই মুহূর্তে জোটের কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না।’
গণআজাদী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এস কে সিকদার বলেন, করোনার কারণে সব দিক থেকে কিছু স্থবিরতার মধ্যে আছে। আমরা মাঝে মধ্যে ভাচুয়ালে মিটিং করি, মিটিতে বসি। তৎপরতা খানিকটা এগুচ্ছে আবার খানিকটা পেছাচ্ছে। চৌদ্দ দলের দুই-একটা দল বাদে আমরা যারা ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত কিন্তু ক্ষমতাবিহীন।
তিনি আরো বলেন, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশটা এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো কিছু পেলে কেউ কেউ তো আরো খুশি হতো। তবে আমরা গণআজাদী লীগ এমনিতেই খুশি।’ @মানবকণ্ঠ

