লতা মঙ্গেশকর মাতৃ ভাষার পর সব চাইতে বেশি গান গেয়েছেন বাংলা ভাষায়; ভালোবাসতেন তাঁতের শাড়ি। গায়িকা লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে বাঙালি এবং বাঙালি সংস্কৃতির গভীর সংযোগ ছিল
বিনোদন ডেস্ক: সদ্য প্রয়াত শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সোমবার অর্ধদিবস ছুটি ঘোষণা করে রবীন্দ্রসদনে প্রয়াত সঙ্গীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকরকে শ্রদ্ধা জানালো পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। এবং পশ্চিমবঙ্গে আগামি ১৫ দিন বাজবে লতাজির গাওয়া গান, জানিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার সকাল ৮টা ১২ মিনিটে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন লতা মঙ্গেশকর। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের তরফে জারি করা মুখ্যমন্ত্রী শোকবার্তায় লেখা হয়, ‘কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণে আমি গভীরতম শোক প্রকাশ করছি। তিনি মুম্বইয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তাঁর প্রয়াণে আমরা রিক্ত হলাম। সুরসম্রাজ্ঞী ও অনন্য প্রতিভাময়ী সর্বজনশ্রদ্ধেয় লতা মঙ্গেশকর দীর্ঘ আট দশক ধরে কণ্ঠের জাদুতে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রেখেছিলেন। হিন্দি, মারাঠি, বাংলা সহ ছত্রিশটিরও বেশি ভারতীয় ও বিদেশি ভাষায় তাঁর গাওয়া অগণিত ক্লাসিকাল,গজল, ভজন, আধুনিক ও সিনেমার গান আজও সমান জনপ্রিয়। বাংলার সঙ্গীতজগতের সঙ্গে তাঁর গভীর যোগ ছিল। আমাদের নক্ষত্রদের সাধনা ও তাঁর প্রতিভা পরস্পরকে সমৃদ্ধ ও অভিষিক্ত করেছিল। ভারতরত্ন, পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণ, দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, লিজিয়ন অফ অনার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস’ অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড সহ অজস্র পুরস্কার ও সম্মানে তিনি ভূষিত হয়েছেন। তাঁর প্রয়াণে সঙ্গীতজগতের অপূরণীয় ক্ষতি হল। আমি লতা মঙ্গেশকরের আত্মীয়-পরিজন ও অনুরাগীদের আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।’
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক পদক্ষেপ করা হয়েছে। নবান্ন সূত্রে খবর, রাজ্য সরকার লতা মঙ্গেশকরকে শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। সোমবার রবীন্দ্র সদনে সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে প্রয়াত সঙ্গীতশিল্পীর ছবিতে শ্রদ্ধা জানানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিলো।
গতকাল রবিবার বিকেলে নবান্নে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। এছাড়া আজ সোমবার দুপুর ২টোর পর সরকারি অফিস বন্ধ থাকবে। সারা রাজ্যে ১৫ দিন ধরে বাজবে প্রয়াত সঙ্গীতশিল্পীর অমর সব গান। সারা দেশে তাঁর ভক্ত রয়েছে। সেই সূত্রে এই রাজ্যে তাঁর অগণিত ভক্ত রয়েছে। তাই রবীন্দ্র সদনে তাঁর ভক্তদের উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, লতা মঙ্গেশকর মাতৃভাষার পর সবচাইতে বেশি গান গেয়েছেন বাংলা ভাষায়; ভালোবাসতেন তাঁতের শাড়ি। গায়িকা লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে বাঙালি এবং বাঙালি সংস্কৃতির গভীর সংযোগ ছিল। ১৯৫৬ সালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে “প্রেম একবারই এসেছিল জীবনে” গানটিই ছিল লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া প্রথম বাংলা গান। সলিল চৌধুরিও লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে অনেক কালজয়ী গান গাওয়ান। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুরেও লতা মঙ্গেশকর বেশ কালজয়ী বাংলা গান গেয়েছেন।
যদিও লতা মঙ্গেশকর সবচেয়ে বেশি গান গেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে। অন্যদিকে মান্না দে, শচীন দেব বর্মন, রাহুল দেব বর্মন, সলিল চৌধুরি, গীতা দত্ত, অনিল বিশ্বাস, অশোক কুমার, কিশোর কুমার, শক্তি সামন্ত, হৃষিকেশ মুখার্জি, বিশ্বজিত, বাপী লাহিড়ি প্রমুখের সাথে লতা মঙ্গেশকরের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। হেমন্তের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আশা ভোঁসলে নিজের ছেলের নামও রেখেছিলেন হেমন্তের নামে।
বাংলা ভাষায় গান গাইবার জন্য নিজের বাংলা উচ্চারণ সঠিক করতে লতা মঙ্গেশকর প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। বাঙালি খাবারের প্রতি লতার যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল।হেমন্তের কাছে রবীন্দ্র সংগীতও শিখেছেন লতা মঙ্গেশকর। বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে যথেষ্ট উৎসাহী ছিলেন লতা। বাঙালি তাঁতের শাড়ি লতা খুব পছন্দ করতেন।
‘প্রেম একবার এসেছিল নীরবে’, ‘আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন’, ‘ও মোর ময়না গো’, ‘ও পলাশ ও শিমুল’, ‘আকাশপ্রদীপ জ্বেলে’সহ আরও অনেক বিখ্যাত বাংলা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। আমি যে কে তোমার, আকাশ প্রদীপ জ্বলে, কি লিখি তোমায়, কেন কিছু কথা বলো না, আমারো তো সাধ ছিল, নিঝুম সন্ধ্যায় শ্রান্ত পাখিরা, ভালোবাসার আগুন জ্বেলে, বাঁশি কেনো গায়, চঞ্চলা মন আনমনা হয়, সাত ভাই চম্পা জাগোরো, না যেওনা রজনী এখনো বাকি, ওগো আর কিছুতো নয়, প্রেম একবার এসেছিল নীরবে, চন্দ্ৰ যে তুই, রঙ্গীলা বাশিতে, ও মোর ময়না গো, কেন যে কাঁদাও, যদিও রজনী পোহালো সজনীসহ নানা কালজয়ী গান গেয়েছেন তিনি।
“আর লতা হয়ে জন্মাতে চাই না”, পুর্নজন্মের প্রশ্নে বলেছিলেন কোকিলকণ্ঠী
পরজন্ম বলে সত্যিই কি কিছু আছে? এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে থাকে। লতা মঙ্গেশকরও এক সময় এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই হাসির মধ্যে ছিল বুকভরা বেদনা। বুক ছিঁড়ে যাওয়া বেদনা ছিল সেই হাসিতে।
প্রসঙ্গত, কিংবদন্তি শিল্পীর প্রয়াণের পরই একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। ভাইরাল হচ্ছে সেই ভিডিও। যেখানে সম্ভবত লতাজিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আবার জন্ম নিতে হলে কি লতা মঙ্গেশকর হয়ে জন্মাতে চাইবেন? প্রশ্ন শুনেই হেসে ফেলেন তিনি। জানান এর আগেও তাঁকে এই প্রশ্ন করা হয়েছিল।
তারপর বলেন, “আবার জন্মাতে না হলেই ভাল হয়। তবে যদি জন্ম নিতেই হয় তাহলে আমি লতা মঙ্গেশকর হিসেবে আর জন্মাতে চাই না। লতা মঙ্গেশকরের দুঃখের কথাগুলি শুধু সেই জানে, আর কেউ নয়।” দুঃখ ভারাক্রান্ত ছিল কথাগুলো। মন্তব্য করেই তিনি হেসে উঠেছিলেন।
জীবনে প্রচুর সংগ্রাম করেছেন লতা মঙ্গেশকর। সংসারের বড় সন্তান ছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন। সেই বয়সেই বাড়ির অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব সামলাতে হয়েছিল। চার ভাই-বোনের দায়িত্ব সামলানো তো চাট্যিখানি কথা নয়। সিনেমার জগতে পা রেখেছিলেন লতা মঙ্গেশকর। ভারতীয় চলচ্চিত্রে শুরু হয়েছিল লতা অধ্যায়।
কিন্তু এত সহজ ছিল না সবকিছু। অনেক অপমানিত হয়েছেন। শুনতে হয়েছিল সিনেমার প্লে-ব্যাকের জন্য তাঁর গলা বড্ড সরু। কিন্তু লতা হার মানার মানুষ নন। লড়ে গিয়েছেন। মানুষের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছেন। তবে দুঃখ তো ছিলই, দুঃখ ছিল বলেই আজ তিনি লতা মঙ্গেশকর হয়ে উঠেছেন।

