শিরোনাম
শুক্র. জানু ২, ২০২৬

পিএসসির প্রশ্নফাঁস: আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি আবেদ আলীসহ ৭ আসামি

  • শৈশবে সদরঘাটে কুলির কাজ করতেন আবেদ আলী, ঘুমাতেন ফুটপাতে

ঢাকা অফিস: বিসিএস পরীক্ষাসহ গত ১২ বছরে পিএসসির ৩০টি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হয়েছেন পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক আবেদ আলীসহ সাত আসামি। আদালতে তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করার জন্য আবেদন করা হয়েছে।

এ ছাড়া আবেদ আলীর ছেলে সোহানুর রহমান সিয়ামসহ ১০ আসামিকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার (৯ জুলাই) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিনা হকের আদালত এ আদেশ দেন।

জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়া আসামিরা হলেন সৈয়দ আবেদ আলী (৫২), মো. খলিলুর রহমান, সাজেদুল ইসলাম (৪১), ঢাবির সাবেক শিক্ষার্থী বর্তমানে মিরপুরের ব্যবসায়ী আবু সোলেমান মো. সোহেল (৩৫), মো. সাখাওয়াত হোসেন (৩৪), সায়েম হোসেন ও বেকার যুবক লিটন সরকার।

এদিন এ মামলায় গ্রেপ্তার ১৭ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এর মধ্যে পিএসসির চেয়ারম্যানের সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবনসহ সাত আসামি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হন। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার জুয়েল চাকমা তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করেন।

এ ছাড়া অপর ১০ আসামিকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়। পরে ১০ আসামির জামিন চেয়ে আবেদন করেন আইনজীবীরা। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালতে ১০ আসামির জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

সোমবার রাতে রাজধানীর পল্টন থানায় বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন আইনে সিআইডির উপপরিদর্শক নিপ্পন চন্দ্র চন্দ বাদী হয়ে মামলা করেন।

একই তদন্ত কর্মকর্তা অপর আসামিদের মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আসামিপক্ষে জামিন আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিনা হক জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এই তালিকায় রয়েছেন পিএসসির উপ-পরিচালক মো. আবু জাফর ও মো. জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর কবির, সাবেক সেনাসদস্য নোমান সিদ্দিকী, অডিটর প্রিয়নাথ রায়, ব্যবসায়ী মো. জাহিদুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের নিরাপত্তা প্রহরী শাহাদাত হোসেন, ঢাকার ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত মো. মামুনুর রশীদ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মেডিকেল টেকনিশিয়ান মো. নিয়ামুন হাসান ও ব্যবসায়ী সহোদর সাখাওয়াত হোসেন।

শৈশবে সদরঘাটে কুলির কাজ করতেন আবেদ আলী, ঘুমাতেন ফুটপাতে

জীবিকার তাগিদে মাত্র আট বছর বয়সে পাড়ি জমান ঢাকায়। সদরঘাটে শুরু করেন কুলির কাজ। রাতে থাকার মতো বাসস্থান না থাকায় ঘুমিয়েছেন ফুটপাতেও। একপর্যায়ে গাড়ি চালানো শিখে ভাগিয়ে নেন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) গাড়িচালকের কাজ। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি আবেদ আলীকে।

অর্জন করেছেন বিপুল সম্পদ, সঙ্গে ক্ষমতাও। সম্প্রতি পিএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সঙ্গে আবেদ আলী জড়িত থাকার বিষয়টি জানাজানি হলে তোলপাড় শুরু হয় তার নিজ এলাকা মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার পশ্চিম বোতলা গ্রামে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সৈয়দ আবেদ আলী মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার পশ্চিম বেতলা গ্রামের মৃত আব্দুর রহমান মীরের ছেলে। আব্দুর রহমান মীরের তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে আবেদ আলী মেজ। রহমান মীরের বড় ছেলে জবেদ আলী কৃষি কাজ করেন। ছোট ছেলে সাবেদ আলী এখনো এলাকায় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের ভাই আবেদ আলী জীবন। এলাকার মানুষের কাছে তিনি পরিচয় দিতেন শিল্পপতি হিসেবে। আবেদ আলীর ছেলে সোহানুর রহমান সিয়ামও ব্যবহার করতেন দামি গাড়ি। আবেদ আলী নিজেও দামি গাড়িতে চড়তেন। অথচ এলাকার কেউ জানতেনই না তিনি গাড়িচালক। ঢাকায় রিয়েল স্টেটের ব্যবসা করতেন বলে এলাকায় প্রচার ছিল। কয়েক বছর ধরে এলাকায় ব্যাপক দান-খয়রাতও করেন প্রশ্নফাঁস চক্রের এই হোতা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিত্ত-বৈভব ফুলে ফেঁপে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আবেদ আলী মীর পদবি পাল্টে নামের আগে সৈয়দ পদবি ব্যবহার শুরু করেন। বাবার উত্থান নিয়ে ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামও সম্প্রতি একটি সমাবেশে বক্তব্য দেন।

বাবার উত্থানের গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার বাবা একদম ছোট থেকে বড় হয়েছেন। আমার বাবার বয়স যখন ৮ বছর, তখন পেটের দায়ে তিনি ঢাকায় চলে গেছেন। ঢাকায় গিয়ে কুলিগিরি করে ৫০ টাকা রুজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এখন তিনি একটি লিমিটেড কোম্পানির মালিক। তিনি কষ্ট করে বড় হয়েছেন।

সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে উঠে আসে আবেদ আলীর ভয়ংকর তথ্য। প্রায় এক যুগ আগে থেকে পিএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্রের সঙ্গে জড়িত এই আবেদ আলী। এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

আবেদ আলী নিজ গ্রামে কোটি টাকা খরচ করে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বাড়ির পাশে করেছেন মসজিদ। এছাড়াও সরকারি জায়গা দখল করে তার গরুর খামার ও মার্কেট নির্মাণাধীন। উপজেলার পান্তাপাড়া ও পূর্ব বোতলা গ্রামে কিনেছেন বিপুল সম্পদ।

সরেজমিনে গিয়ে আরও জানা যায়, পিএসসির চেয়ারম্যানের সাবেক গাড়িচালক আবেদ আলী। কিন্তু এলাকার মানুষ এসব কিছুই জানতেন না। গত কোরবানির ঈদে দামি গাড়িতে চড়ে ১০০ জনকে এক কেজি করে মাংস বণ্টন করেন। সেই ভিডিও শেয়ার করেন নিজের ফেসবুকে। আবেদ আলীর ছেলে সিয়াম শুধু একটি গাড়ি নয়, একাধিক দামি গাড়ি ব্যবহার করেন। সবই দামি, ঝকঝকে। পড়েছেন ভারতের শিলংয়ে। দেশের একটি ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি পড়ালেখা করেন।

স্থানীয় আব্দুল হক নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘এলাকায় আসলে তিনি মানুষকে দানখয়রাত করতেন। তার সঙ্গে আমাদেরও ভালো সর্ম্পক ছিল। কিন্তু তিনি যে এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তা আমি জানতাম না। আমরা এলাকাবাসী হতবাক।’

এ ব্যাপারে মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘যারা অস্বাভাবিকভাবে সম্পদ অর্জন করেছেন, তাদের নিয়ে সচেতন মহলের প্রশ্ন তোলা উচিত। সরকারের উচিত, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। প্রশ্ন ফাঁস করে বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার কারণে তার কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের মাদারীপুর সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আতিকুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে কেউ অভিযোগ দিলে আমরা প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করব।’

এসব ব্যাপারে জানতে আবেদ আলী ও তার ছেলে সিয়ামের ফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন দিলেও কেউ রিসিভ করেননি। তাদের গ্রামের বাড়িতেও তালাবদ্ধ।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *