গ্রেপ্তার হওয়ার পর অজ্ঞাত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে নির্যাতনের মামলায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দাখিল করবেন কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর। আজ বুধবার মামলাটির প্রতিবেদনের ওপর শুনানির সময় মামলাটি সঠিকভাবে তদন্ত হয়নি মর্মে নারাজি দাখিলের জন্য আইনজীবী সময় প্রার্থণা করেন।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কেএম ইমরুল কায়েশ শুনানি শেষে সময় আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি নারাজি দাখিলের দিন ধার্য করেছেন। চলতি বছর ১০ মার্চ কিশোর বাদী হয়ে এ মামলা করেন। যা পিবিআাইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে কিশোরের শারীরিক পরীক্ষার আদেশ দেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান গত ৯ অক্টোবর প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কিশোরকে গ্রেপ্তার সংক্রান্তে ওয়ারেন্ট অফিসার আবু বকর ছিদ্দিককে (৪৭) জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ২০২০ সালের ৫ মে র্যাব-৩, টিকাটুলি, ঢাকায় কর্মরত থাকাকালীন গোপন সংবাদে জানতে পারেন যে, মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রান্তে গুজব ছড়ানো এবং সরকারবিরোধী পোস্ট দিয়ে জনমনে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। উক্ত সংবাদের ভিত্তিতে আহম্মেদ কবির কিশোরকে ওইদিন কাকরাইলের বাসায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে কিশোর মোস্তাক আহমেদের নাম বলেন। পরে মোস্তাককে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাদের নিয়ে র্যাব-৩ এর ক্যাম্পে আসা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ১১ জনের মামলা করা হয়। গ্রেপ্তারের দিন রাত ৯টায় রমনা থানায় এজাহার দায়ের করার পর তাদের থানায় হস্তান্তর করা হয়। র্যাব হেফাজতে থাকা অবস্থায় আসামিদের কোনো প্রকার মারধর, নির্যাতন করা হয় নাই।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালেল ২ মে কিশোরকে কে বা কারা বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, সেই বিষয়ে তিনি কোনো প্রকার তথ্য প্রদান করতে পারেননি। মামলার ঘটনা সংক্রান্তে বাদীর কোনো সাক্ষী নেই। মামলায় বাদী পক্ষের দেওয়া তথ্যমতে ঘটনাস্থলের আশেপাশের নিরপেক্ষ ২ জন, ঘটনাস্থলের সিসি ফুটেজ সংক্রান্তে ৫ জন, মামলা সংশ্লিষ্ট ১০ জনসহ সর্বমোট ১৯ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের মৌখিক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সর্বিক তদন্তে তাকে কে বা কারা তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নির্যাতনের সময় জসিম নামক লোকের নাম শুনতে পাওয়ার জমিসের সন্ধান বা তার সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মামলায় তিনি র্যাব সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেন নাই। মেডিকেল বোর্ডও নির্যাতনের কোনো আলামত পায়নি।
কিশোরের মামলার অভিযোগে বর্ণনায় বলা হয়, ২০২০ সালের ২ মে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ১৬-১৭ জন সাদা পোশাকদারী লোক কাকরাইলের বাসা থেকে জোর করে আমাকে হাতকড়াসহ মুখে মুখোশ পরিয়ে অচেনা-অজনা নির্জন একটি জায়গায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে আমি বুঝতে পারলাম আমাকে (ভিকটিম) একটি পুরানো এবং স্যাতস্যাতে বাড়ির রুমের ভেতরে আনা হয়েছে। গাড়ির হরণের শব্দ পাচ্ছিলাম কিছুক্ষণ পর প্রজেক্টরে একের পর এক কার্টুন দেখিয়ে সেগুলোর মর্মার্থ জানতে চাওয়া হয়। করোনা নিয়ে আমার আঁকা কিছু কার্টুন দেখিয়ে কেন আকছি এবং কার্টুনের চরিত্রগুলো কারা প্রশ্ন করে। এক পর্যায়ে প্রচণ্ড জোরে আমার কানে থাপ্পড় মারে। কিছুক্ষণের জন্য আমি বোধশক্তিহীন হয়ে পড়ি। বুঝতে পারছিলাম আমার কান দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তারপর স্টিলের পাত বসানো লাঠি দিয়ে পায়ে পেটাতে থাকে। যন্ত্রণা এবং ব্যথায় সজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলাম। এভাবে কয়েক দফা অর্থাৎ ২ থেকে ৪ মে পর্যন্ত আমার ওপর শারীরিক এবং মানসিক টর্চার অত্যাচার চালার পরবর্তীতে আমি নিজেকে র্যাবের কার্যালয়ে দেখতে পাই। পরে ওই বছর ৫ মে র্যাব-৩ এর ওয়ারেন্ট অফিসার মো. আবু বকর সিদ্দিক রমনা থানায় তিনিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন।

