শিরোনাম
শুক্র. ফেব্রু ২০, ২০২৬

প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী: ‘কবরীর মতো কেউ শতাব্দীতে একবার জন্মগ্রহণ করে’

মনজুর কাদের, ঢাকা: বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মিষ্টি মিয়া’ কবরীর মৃত্যুর এক বছর হয়ে গেল। গত বছরের ১৭ এপ্রিল করোনার কারণে তিনি মারা যান। মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করছিলেন, ‘এই তুমি সে তুমি’। ছবিতে অভিনয়ও করছিলেন তিনি। ছবিটি পুরোপুরি শেষ হয়নি। তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার বেশ কয়েকজন সহকর্মী কথা বলেছেন এবং তাদের অনুভূতি শেয়ার করেছেন।

শবনম
আমাদের একসঙ্গে কাজ হয়নি। সেই সুযোগও তৈরি হয়নি। তারপরও আমাদের যেখানে দেখা হতো, একটা সুন্দর কথাবার্তা হতো। কবরী তো ছোট বয়সে চলচ্চিত্রে এসেছে। সবাই তাকে ভালোবাসত। মিষ্টি চেহারা, মিষ্টি হাসি আর আর্টিস্ট হিসেবেও যে খুব ভালো ছিল, এটা নিয়ে বলার তো অবকাশ নেই। এর মধ্যে মৃত্যুর এক বছর হয়ে গেল, ভাবতেই কেমন যেন লাগছে।

কবরীর সঙ্গে মাঝেমধ্যে স্টুডিওতে দেখা হতো। একসঙ্গে কাজ করতে গেলে যেমনটা জানা যায়, একসঙ্গে বসে আড্ডা না দিলে তো ততটা জানা যায় না। কারও সঙ্গে ওঠাবসা করলে অনেক কিছুই জানা যায়—মানুষটা কেমন আরকি। কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ হয়নি। আমাদের তো অনেক জুনিয়র ছিল। তবে চলচ্চিত্রের জগতে ভালো কাজ করেছে, রাজনীতিতেও সে দারুণ সফল ছিল বলে আমি মনে করি। এক লাইনে সফল, সেই মানুষটা আরেক লাইনে গিয়ে সফলতা পেয়েছে, তা-ও আবার রাজনীতির মতো মাঠে, এটা তো বড় ব্যাপার। মানুষ হিসেবে এটাই বড় সার্থকতা।

কবরী ছিলেন একজন পাওয়ারফুল অভিনেত্রী। অনেক সুন্দরভাবে অভিনয় করত। ব্যক্তিগতভাবে স্পষ্টবাদী ছিল। যে কারণে হয়তো অনেকেই তাকে ভুল বুঝত। ভালো-খারাপ দুটিই সে সরাসরি বলে দিত। এটা আমার খুব ভালো লাগত। বাস্তব চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তুলতে অভিনেত্রী হিসেবে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সহজেই যেকোনো চরিত্রের সঙ্গে মানিয়ে যেত, যে কারণে সে ছিল সফল অভিনেত্রী।

সোহেল রানা
কবরীর দুটি সত্তা। মানুষ ও শিল্পী সত্তা। দুটোই ভিন্ন ভিন্ন। শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের মানুষেরাই তাঁকে মিষ্টি মেয়ে নাম দিয়েছে, কোনো সাংবাদিক নয়। আমাকে যেমন আমার সাংবাদিক বন্ধু ড্যাশিং হিরো উপাধি দিয়েছে, অন্যদেরও তেমনটা দিয়েছে তবে কবরীকে এ দেশের মানুষই তা দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ সেই নামটা দিয়েছিল, সেই নামটা হচ্ছে মিষ্টি মেয়ে। সাধারণ লোকের দেওয়া নামটাই বোধ হয় একজন শিল্পীর বড় প্রাপ্য। একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর বড় সার্থকতা। এরপর পর শিল্পী হিসেবে তাঁকে নিয়ে আর দ্বিতীয় কথা বলার নেই। সি ওয়াজ জাস্ট আন প্যারালাল। ওই মিষ্টি মুখ বা ওই মিষ্টি হাসি বা ওই মিষ্টি অভিনয়—বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আসেনি এর আগে, এক কবরী ছাড়া। আগামী ৫০ বছরে আসবে বলেও আমার ধারণা নেই। আমি বিশ্বাস করি, শত বছরে কবরী একটাই জন্মায়। সি ওয়াজ সামথিং মোর…।

মানুষ হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক ছিল। অত্যন্ত আড্ডাবাজ ছিলেন। সবাইকে নিয়ে হইহুল্লোড করে থাকতে পছন্দ করতেন। তবে এই আড্ডাটা আবার সীমিত ছিল, সবার সঙ্গে মিশতেন না। প্রখর ব্যক্তিত্ব ছিল। যাদের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক ছিল, শুধু তাদের সঙ্গেই আড্ডা দিতেন। ভীষণ চুজি ছিলেন। তাঁর আড্ডা সঙ্গী হওয়াটা যে কারও জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার মনে করছি। কবরী উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে নিজেকে যেভাবে ডেভেলপ করেছেন, স্বশিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন—একটা মানুষ নিজেকে কি অসাধারণভাবে যে বদলে নিতে পারেন, তা কবরীকে দেখলেই বোঝা যায়। আমরা যে কথায় কথায় বলি স্বশিক্ষিত হতে পারা যায়, এটা পারা যায় আমরা রবীন্দ্রনাথকে দেখেছি, নজরুলকে দেখেছি—তাঁরা যা লিখেছেন, আমরা এখনো পড়ে যাই।

আর কবরী স্বশিক্ষিত হয়ে রাজনৈতিক মঞ্চে যেভাবে বক্তৃতা দিতেন, আমি তো আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে থাকতাম, হাউ সি কুড ট্রান্সপার হার আ রিয়েল পলিটিশিয়ান ফ্রম জাস্ট অ্যান অ্যাক্রেটস! এটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগত। বিস্ময়। রাজনীতিতে ৬০ বছরের অভিজ্ঞতা হলেও আমি হয়তো ছোট একজন রাজনৈতিক কর্মী। চলচ্চিত্রে রাজনীতিতে ৬০ বছরের অভিজ্ঞতা হয়তো কম মানুষেরই আছে। সেই আমার সঙ্গেও যখন রাজনীতি নিয়ে কথা হতো বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। রাজনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র, দেশ, অর্থনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এসব নিয়ে কী অসাধারণ বলতেন। আমার তো মনে হতো, অনেক পিএইচডি ডিগ্রিধারীরাও কবরীর মতো বলতে পারবেন না। কল্পনাই করা যায় না। সো, কবরী ইজ জাস্ট আনপ্যারারাল।

ববিতা
আমার জীবনে ছোট থেকে কবরী আপাকে দেখেছি। আমি তখনো সিনেমায় অভিনয়ে আসিনি, তখন থেকে তাঁর অভিনয় ভালো লাগত। রাজ্জাক কবরীর খুব ভক্ত ছিলাম। তাঁদের ‘ময়নামতি’ ছবিটি সিনেমা হলে প্রথম দেখেছি। অনেক সাধের ময়না আমার গানটা তো গুনগুন করে গাইতাম। এরপর তাঁদের আরও কত ছবি যে দেখেছি, বলে বোঝাতে পারব না। তিনি নেই এটা মোটেও ভাবতে পারি না।

আমার কেন যেন মনে হয়, কবরী আপাকে কষ্ট করে অভিনয় করতে হতো না। তিনি জন্মগতভাবে অসাধারণ একজন অভিনয়শিল্পী। তাঁর চেহারা–ছবি সবকিছু সাধারণ নারী হলেও পর্দায় খুব সুন্দরভাবে নিজেকে ফুটিয়ে তুলতেন। দিলীপ কুমার, অমিতাভ বচ্চন, রেখাকে যে অভিনয় করতে হতো, সেটা কবরী আপাকে করতে হতো বলে আমার মনে হয় না। আমার সব সময়ই মনে হতো, এই চরিত্রটিই বুঝি তিনি। তিনি যখন টপ নায়িকা, তখনই আমার আগমন। রাজ্জাক ভাইয়ের ডাইরেকশনে এরপর আমিও কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছি। গ্রামীণ পটভূমির যত চলচ্চিত্র তৈরি হতো, এসব চরিত্রে অসাধারণ মানিয়ে যেতেন তিনি। সাধারণ একটি মেয়ে যেন পর্দায় অসাধারণ হয়ে উঠতেন।

কবরী আপা অসাধারণ গুণী শিল্পী। তিনি লাখো মানুষের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন। আপার সঙ্গে সর্বশেষ ‘রাজা সূর্য খাঁ’ নামে একটি সিনেমা করেছিলাম। পরিচালক গাজী মাহবুব চাচ্ছিলেন ঐতিহাসিক ওই সিনেমায় কবরী আপা থাকলে ভালো হয়। আপা তখন সাংসদ। আপাকে অনুরোধ করে বললাম, আমরা একসঙ্গে কাজটি করব। আপা শতব্যস্ততার মধে৵ও না করতে পারলেন না। সেবার আমাদের অনেক গল্প, আড্ডা হয়েছিল। আমি আপার জন্য খাবার নিয়ে যেতাম। তিনি অনেক স্নেহ করতেন। তারও আগে আমরা দুজন মিলে আরও দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলাম।

আলমগীর
কবরীর দুটি দিক। প্রথমত, তিনি একজন অসাধারণ অভিনেত্রী আর দ্বিতীয়ত, অসাধারণ একজন মানুষ। অভিনেত্রী কবরী সম্পর্কে বলা আমার ধৃষ্টতার মধ্যে পড়ে। তিনি যতটা বড় মাপের অভিনয়শিল্পী, ওটার আশপাশেও আমরা নেই। তাই তাঁর অভিনয় নিয়ে কথা বলার ধৃষ্টতা দেখাব না কোনো দিনই। তবে এটা বলতে দ্বিধা নেই, মানুষ হিসেবে অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। স্পষ্টভাষী মানুষ ছিলেন, স্পষ্ট কথা বলতে একপা পেছাতেন না।

খুব কেয়ারিং ছিলেন আমাদের প্রতি। খুবই স্নেহ করতেন। ভালোবাসতেন। সেই আগেকার দিনে যখন প্রথম নায়ক হয়ে এসেছি, তখন আমাদের যখন এক পয়সারও মূল্য নেই মার্কেটে বা প্রোডাকশন ম্যানেজার বা প্রডিউসারদের কাছে—তখন তিনিই কিন্তু আমাদের পাশে দাঁড়াতেন। আমার জীবনের প্রথম চলচ্চিত্র ‘আমার জন্মভূমি’তে তিনি নায়িকা ছিলেন, কিন্তু আমার বিপরীতে নন, রাজ্জাক ভাইয়ের বিপরীতে। মাহফুজুর রহমান (চিত্রগ্রাহক) ছিলেন, মিনু রহমানও ছিলেন। আমার সঙ্গে সেই ছবিতে কোনো নায়িকাই ছিলেন না। আমি একটা খ্যাপা চরিত্রে অভিনয় করেছি, মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে।

একটা ছোট্ট ঘটনা সবার সঙ্গে শেয়ার করতে চাই। ‘আমার জন্মভূমি’ চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে যখন আউটডোরে গেছি কুমিল্লায়, কোথায় থাকব না থাকব, তা ভেবে তো কারও কোনো কিছু যাবে আসবে না। আমি কে, আমার কী আছে, কোথা থেকে আসছি, লেখাপড়া কত দূর—ওসবের কিন্তু কোনো মূল্য নেই ওখানে। চলচ্চিত্রে মূল্যটা হচ্ছে, কত ভালো অভিনেতা আপনি। কী কাজ করছি, সেটার মূল্য আছে। থাকার জায়গার অভাবে শুটিংবাড়িতে আমাকে আর মাহফুজকে বড় বারান্দা ছিল, খড় বিছিয়ে চাদর গায়ে দিয়ে থাকতে হয়েছে সেখানে। পরদিন এটা আবার কবরী দেখে ফেলেন। তিনি দেখার পর প্রোডাকশন ম্যানেজারকে ডেকে, নিজে টাকা দিয়ে চৌকি কিনে এনে দুটি তোশক দিয়ে, দুটি বালিশ এনে দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। তখনকার সেই কবরীকে নিয়ে আসলে কী বলব! আমি মাত্র এসেছি চলচ্চিত্রে, দু–চার দিন শুটিং করেছি—এসব তো ভুলিনি, ভুলব না কোনো দিন।

চলচ্চিত্রে আমরা যখন এসেছি, তখন কি আমাদের কাছে অত টাকা থাকত। তখন মানে ’৭২–এ, কবরী তো তখন স্টার। আমরা তো কেউই না। কিন্তু আমরা তাঁর আদর পেতাম। আমাকে ও মাহফুজকে জীবনে প্রথম তখনকার কন্টিনেন্টালে নিয়ে লাঞ্চ করিয়েছে। এই ব্যাপারগুলো তো অনন্য। আউটডোর শুটিংয়ে গেলে আজকাল দরজা বন্ধ করে আর্টিস্টরা যাঁর যাঁর রুমে বসে থাকেন। কোনো শুটিংয়ে তিনি থাকলে এটা করতে দিতেন না। সবাইকে সন্ধ্যার পর ডেকে নিয়ে আড্ডা দিতেন, হইহুল্লোড় করতেন। নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াতেন। আবার পান থেকে একটু চুন খসলে বকাও দিতেন।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *