বাংলাদেশে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা এক কালো অধ্যায় অতিক্রম করছে বলে মন্তব্য করেছেন এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন। একদিকে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ অন্যদিকে তাঁদের অধীনে থাকা পেটোয়া বাহিনীর নগ্ন হামলার শিকার হচ্ছে জাতির বিবেক নামে পরিচিত সাংবাদিক ও গণমাধ্যম। এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন ৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ “বাংলাদেশ: সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতাসীনদের নগ্ন হামলার মুখে স্বাধীনতা” শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই মন্তব্য করেন। প্রতিবেদনটিতে বিরোধী মতের প্রতি সরকারের নিপীড়নের প্রসঙ্গে, যুক্তরাজ্য থেকে আমার দেশ অনলাইন প্রকাশিত হওয়ার ১২ ঘন্টার মধ্যেই সরকার কতৃক বাংলাদেশে ডাউনলোড বন্ধের উল্লেখ করা হয়েছে। পত্রিকাটির সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের উপর নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রসঙ্গেও এসেছে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের প্রতিবেদনে। নিম্নে পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা এক কালো অধ্যায় অতিক্রম করছে। দেশটির প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন সংবাদ মাধ্যম কঠোর আইনের অপব্যবহার এবং স্বৈরাচারী শাসনের মধ্যে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকগণ ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থাকা লোকদের দ্বারা শারীরিক হামলার শিকার হচ্ছেন। অনেক সাংবাদিক হয় দেশের ভেতরে বিনা বিচাওে কারাগারে কিংবা রাষ্ট্রের চলমান দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে বিদেশে নির্বাসনের জীবন বেছে নিয়েছেন। দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভিন্ন মতাবলম্বী প্রতিটি ব্যক্তির সভা-সমিতি করার স্বাধীনতা রুদ্ধ।
অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর বাধ্যতামূলক নিবন্ধীকরণের জন্য জাতীয় গণ-অনলাইন সংবাদ মাধ্যম নীতিমালা আরোপ:
বাংলাদেশ সরকার জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১৭ (সংশোধিত ২০২০) এর একটি সংশোধনী গ্রহণ করেছে। ৩১ আগস্ট ২০২০ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের সাপ্তাহিক বৈঠকে সংশোধনীটি গৃহীত হয়। সর্বশেষ গৃহীত এই নীতিমালা প্রতিটি অনুমতিপ্রাপ্ত বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত সংবাদ মাধ্যম তাদের সংবাদপত্র, প্রাইভেট টেলিভিশন এবং রেডিও চ্যানেলসহ অনলাইন নিউজ পোর্টাল চালানোর উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। দেশটির মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ভাষ্যমতে, প্রতিটি পোর্টালকে কর্তৃপক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন নিতে হবে।
মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক নিউজ পোর্টাল বাধ্যতামূলক নিবন্ধীকরণের অনুমোদন তখনই আরোপ করা হলো যখন মাত্র এক সপ্তাহ পূর্বে সম্পাদক পরিষদ এই বিধানের বিরোধিতা করে বিবৃতি প্রদান করেছিল। যখন বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর চরম অপব্যবহার হচ্ছে তখন এই বিধানটি সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর আরেকটি চরম আঘাত। সম্পাদক পরিষদ তাদের বিবৃতিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রতিবাদ করেছে এবং অতিদ্রুত এর প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানিয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবগুলোর বিষয় উল্লেখ করে সম্পাদক পরিষদের বিবৃতিতে বলা হয়, “পাঠক সংখ্যা এবং সংবাদপত্র প্রকাশ প্রচুর হ্রাস পেয়েছে। বিজ্ঞাপনও আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। সংবাদপত্রগুলো বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু এই জন্য সংবাদপত্র শিল্প সরকারের কাছ থেকে কখনো কার্যকর কোন সাহায্য ও সহযোগিতা পায়নি। মুনাফা অর্জনকারী সাধারণ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছ থেকে যে সহযোগিতা পেয়েছে, সংবাদপত্র শিল্প তার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সংবাদপত্রগুলো বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে এ ব্যাপারে দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা গেছে যে, সরকার দাবিগুলো কখনই আমলে নেয়নি। অপরদিকে, এই শিল্প উদাসীনতা ও অসহযোগিতামূলক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।” সংশোধিত কঠোর অনলাইন নীতিমালা গৃহীত হওয়া এ কথাই ইঙ্গিত করে যে, সম্পাদক পরিষদের উত্থাপিত সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা সংশ্লিষ্ট দাবি ও আপত্তিগুলো সরকার কর্তৃক অবমূল্যায়িত হয়েছে।
বিরোধী মতের অনলাইন নিউজ পোর্টাল পূনরায় চালু হওয়ার পর বন্ধ করে দেয়া:
বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত বিরোধী মতের একটি নিউজ পোর্টাল চালু হওয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যে বন্ধ করে দিয়েছে। ৩০ আগস্ট ২০২০-এ নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে পালিত আন্তর্জাতিক গুম দিবসে আমার দেশ ইউকে চালু হয়। সাংবাদিকদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বাংলাদেশে কর্তৃপক্ষ এর ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়েছে। নিউজ পোর্টালটি সম্পাদনা করছেন জনাব মাহমুদুর রহমান, যিনি দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। বিরোধী মতের জাতীয় এ দৈনিকটি ২০১৩ সালের ১১ই এপ্রিল শেখ হাসিনা সরকার কর্তৃক জোরপূর্বক বন্ধ করে দেয়া হয়। মাহমুদুর রহমান পত্রিকার ঢাকা অফিস থেকে কার্যত অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। দীর্ঘকাল আটক ও কারাবাসের পর ২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বর তিনি জামিনে মুক্তি পান। পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ১২৬টি মামলা দায়ের করে। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, সাইবার অপরাধ, মানহানি, অগ্নিসংযোগ ও বোমা বিস্ফোরণ; শেখ হাসিনা সরকারের সমালোচনা এবং দুর্নীতি প্রকাশের জন্য এই মামলাগুলো করা হয়। তিনি আটক থাকাকালীন পুলিশী নির্যাতনের পরও প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। মাহমুদুর রহমান ২০১৮ সালের ২২ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আদালতে হাজিরা দিতে গেলে আদালত প্রাঙ্গণে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হত্যার চেষ্টা করে। তিনি আহত অবস্থার একটুর জন্য পরিত্রাণ পান।
আমার দেশ ইউকে’র ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়াই প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি ও অপকর্মের প্রকাশ এবং ভিন্নমত বাংলাদেশ সরকার সহ্য করতে পারে না।
দুর্নীতির খবর প্রকাশ করায় সাংবাদিক ও তার পিতাকে নির্মমভাবে মারধর:
বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করা একটি জীবনবিনাশী কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার দৈনিক সমকালের সংবাদদাতা এবং মুরাদনগর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরিফুল আলম চৌধুরী দারোরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়ার নেতৃত্বে হামলার শিকার হন। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের প্রতিবেদন প্রকাশ করায় প্রতিশোধ নেয়ার জন্য উক্ত সাংবাদিক ও তার পরিবারের উপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে এই আক্রমণ চালানো হয়। ২০২০ সালের ৪ জুলাই সংঘটিত এই হামলায় সাংবাদিকের বাবা-মা’ও গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে পিতা-মাতা উভয়ের হাতই ভেঙ্গে গিয়েছিল। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক জানান, শরিফুলের দেহের সাতটি জায়গায় ভেঙ্গে গিয়েছে। গুরুতরভাবে ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকগণ তাঁকে ঢাকায় জাতীয় ট্রমাটোলজি এন্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশনএ স্থানান্তরিত করেন।
শরিফুলের বাবা আব্দুল মতিন চৌধুরী ৪ জুলাই মুরাদনগর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। ওই সন্ধ্যায় মুরাদনগর থানা পুলিশ শাহজাহান মিয়া ও তার সহযোগিদের গ্রেফতার করেন। পরদিন ৫ জুলাই জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অভিযুক্ত মাস্টার মাইন্ড শাহজাহান মিয়ার জামিন মঞ্জুর করেন। দু’দিন পর তার সহযোগিরাও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে জামিন পান।
সাংবাদিক ও তার পরিবারের সদস্যদের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনার অপরাধীদের তড়িৎ মুক্তি এটারই ইঙ্গিত বহন করে যে, অপরাধীরা দায়মুক্তি ভোগ করছে। এর বিপরীতে, বহু ভিন্নমতাবলম্বী বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বন্দী জীবন যাপন করছেন এবং বিচার বিভাগ তাদের জামিন আবেদন নাকচ করে দিচ্ছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রতিবাদ করতে গেলে ক্ষমতাসীন দলের লোকদের বাধার সম্মুখীন হতে হয়:
গত ৪ সেপ্টেম্বর বিখ্যাত ফটো সাংবাদিক শহিদুল আলমের নেতৃত্বে দৃক গ্যালারির ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি ক্ষমতাসীন দলের লোকদের বাধার মুখে সংক্ষিপ্ত আকারে শেষ করতে হয়। সেদিন দৃক গ্যালারি ‘ক্রসফায়ার’ নামে একটি স্ট্রীট পারফরমেন্সের আয়োজন করেছিল। টিএসসিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল গ্যালারির ৩১ তম বার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করা।
শহিদুল আলম জানান, অনুষ্ঠান চলাকালে বিপুল সংখ্যক লোক ক্ষমতাসীন দলের প্ল্যাকার্ড নিয়ে ঘটনাস্থলে আসে এবং পূর্বঘোষিত ইভেন্টটিকে বানচাল করার চেষ্টা করে। একই সময়ে পুলিশের বিশাল একটি দল শাহবাগ অঞ্চল দখল করে রাখে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ৫ আগস্ট আল-জাজিরাতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত স্কুল শিক্ষার্থীদের উপর নৃশংস হামলা নিয়ে সাক্ষাৎকার দেয়ায় শহিদুল আলমকে ১০৮ দিন পুলিশ হেফাজতে আটক করে রাখা হয়। যাইহোক, সেদিন অনুষ্ঠানটির পরিচালক ক্ষমতাসীন দলের লোকদের হুমকির মুখে সময়ের অনেক আগেই ইভেন্টটি শেষ করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনুপ্রবেশকারীদের কোন রকম বাধা দেয়নি।
বলা যায়, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ভিন্ন মতাবলম্বীদের জন্য স্বাধীন ও শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনা-সমাবেশ করা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা অকল্পনীয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা এবং আদালতে জামিন নামঞ্জুর হওয়ার দরুন সাংবাদিকদের কারাগারে দিনানিপাত:
ফটো সাংবাদিক এবং ‘দৈনিক পক্ষকাল’ পত্রিকার সম্পাদক জনাব শফিকুল ইসলাম কাজলকে ৫৩ দিন গুম করে রাখার পর বিনা বিচারে আটক করে রাখা হয়েছিল। ৩ মে ২০২০ থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। আটকের পর তাঁর আইনজীবীরা আদালতে যতগুলো জামিন আবেদন করেছিলেন এর সবকয়টি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের সর্বস্তরে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে র্যাবের দ্বারা উদঘাটিত একটি যৌন-কেলেঙ্কারি জনিত ঘটনার সূত্র ধরে ক্ষমতাসীন দলের একজন আইনপ্রণেতা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর অধীনে শফিকুলের নামে একটি মামলা দায়ের করেন এবং এর পরই ২০২০ সালের ১০ মার্চ শফিকুল নিখোঁজ হন। পুলিশের দাবি, ২ মে মধ্যরাতে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে নিজ দেশে প্রবেশের সময় শফিকুলকে আটক করা হয় এবং তখন থেকেই তিনি বন্দী অবস্থায় রয়েছেন।
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা একটি স্বৈরাচারী অবৈধ সরকারের অধীনে থেকে শফিকুলের ন্যায়বিচারের অধিকার দিতে এবং নিজেদের স্বাধীন মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

