শিরোনাম
রবি. ফেব্রু ২২, ২০২৬

বাংলাদেশে অবৈধ বিদেশিদের তালিকা তৈরি হচ্ছে

আইনের আওতায় আনতে শিগগিরই গ্রেপ্তার অভিযান

গাফফার খান চৌধুরী: বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থান করা বিদেশিদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। তালিকা অনুযায়ী শিগগিরই শুরু হচ্ছে গ্রেপ্তার অভিযান। অভিযানে অবৈধ বিদেশিদের কাছে বাসা বা ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া এবং মোবাইল ফোনের সিমকার্ড বিক্রয়কারীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। অবৈধ বিদেশিদের নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় এমন নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। অবৈধ বিদেশিদের মধ্যে আফ্রিকানদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে প্রায় ৪শ’ আফ্রিকান নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রেপ্তাররা জাল ডলার তৈরি, বেচাকেনা ও মাদক চোরাচালানে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে সম্প্রতি অনেকেই জামিন পেয়েছেন। যার সংখ্যা শতাধিক। জামিনে ছাড়া পেলেও তারা দেশ ছাড়েননি। তারা নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে বসবাসকারী কোনো বিদেশির কাছে বাসা বা ফ্ল্যাট ভাড়া দিলে অবশ্যই ওই বিদেশির পাসপোর্ট বা ভিসার ফটোকপি রাখতে হবে। শুধু তাই নয়, তা সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করতে হবে। এ ছাড়া কোনো দোকানি বা প্রতিষ্ঠান কোনো বিদেশির কাছে মোবাইল ফোনের সিমকার্ড বিক্রি করলেও তাকেও ওই বিদেশির পাসপোর্ট বা ভিসার ফটোকপি রাখার বাধ্যবাধকতা আছে। তা সংশ্লিষ্ট থানা বা মোবাইল ফোন অপারেটর কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। মোবাইল ফোন অপারেটর কর্তৃপক্ষ তা বিটিআরসিকে জানাবে। পর্যায়ক্রমে ওইসব বিদেশির তথ্য চলে যাবে সরকারের গোয়েন্দা ও চ্যান্সারি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগে। সূত্রটি বলছে, আইনে এসব থাকলেও মানার কোনো বালাই নেই। বেশি টাকার ভাড়ার লোভে বিদেশিদের কাছে বাসা বা ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। ওই বিদেশি বাংলাদেশে বৈধ না অবৈধভাবে বসবাস করছেন, তার খবরও রাখছেন না বাড়ি বা ফ্ল্যাট মালিকরা। শুধু তাই নয়, তা সংশ্লিষ্ট থানাকে নূ্যনতম অবহিত করারও প্রয়োজন মনে করছেন না তারা। মোবাইল ফোনের সিম বিক্রির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটনা ঘটছে। আবার যেসব বিদেশি অপরাধ কর্মকান্ড করার জন্যই বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন, তারা দেশে ঢুকেই পাসপোর্ট ভিসার কাগজপত্র গায়েব করে ফেলছেন। তারা এদেশীয় দালালদের মাধ্যমে বাড়ি ভাড়া ও মোবাইল ফোনের সিমকার্ড কিনছেন। অনেক বিদেশি বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত করছেন ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা আর দালালদের মাধ্যমে। যা সম্পূর্ণ বেআইনি। ঢাকা মহানগর পুলিশের চ্যান্সারি বিভাগের উপ-কমিশনার আশরাফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে ৫১টি চ্যান্সেলর ও দূতাবাস মিলিয়ে বিশ্বের ৪৮টি দেশের অফিস আছে। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার দূতাবাস ভারতের দিলিস্নতে অবস্থিত। আফ্রিকানরা বাংলাদেশে ঢুকলে তাদের এয়ারপোর্টে এন্ট্রি করা হয়। তিনি আরও জানান, দূতাবাস ও চ্যান্সারি অফিসগুলোর অধিকাংশই রাজধানীর গুলশান, বনানী ও বারিধারায়। অফিসগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সর্বক্ষণ প্রস্তুত রয়েছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব অফিসে দেশি-বিদেশিদের যাতায়াতের ওপর নজর রাখা হয়। এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, বিভিন্ন দেশের যেসব নাগরিক অবৈধভাবে এদেশে বসবাস করেন। তাদের অনেকেই দূতাবাসের সঙ্গে বা চ্যান্সারি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে বৈধভাবে বসবাস করার সহযোগিতা চান। তাদের নির্ধারিত হারে জরিমানা দিয়ে বৈধ হওয়ার সুযোগ দিয়ে থাকে সরকার। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ইমিগ্রেশন বিভাগ ও পাসপোর্ট অফিসের মাধ্যমে ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়ে তারা বৈধ হন। পুলিশ কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলছেন, কিন্তু যারা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত থাকেন, তারা তাদের বাংলাদেশস্থ দূতাবাস বা পুলিশের চ্যান্সারি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। এমনকি তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানও পাওয়া যায় না। তবে বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে চ্যান্সারি বিভাগের তরফ থেকে ওইসব দেশের বাংলাদেশস্থ দূতাবাস বা চ্যান্সারি অফিস থাকলে সেখানে যোগাযোগ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রথমত কোনো বিদেশিকে বাসা বা ফ্ল্যাট ভাড়া দিতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের তরফ থেকে দেওয়া একটি নির্দিষ্ট ভাড়াটিয়া ফরম পূরণ করতে হয়। পূরণকৃত ফরম থানায় জমা দিতে হয়। ভাড়া দেওয়ার আগে বাড়ি বা ফ্ল্যাট মালিককে অবশ্যই দেখতে ওই বিদেশির ভিসার মেয়াদ আছে কিনা। না থাকলে ওই বিদেশির কাছে বাসা বা ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। মোবাইল ফোনের সিমকার্ড বিক্রির ক্ষেত্রেও এমন আইন প্রযোজ্য। যারা এসব আইন না মেনে বিদেশিদের কাছে মোবাইল ফোনের সিমকার্ড বা বাসা ভাড়া দিচ্ছেন তারা অপরাধ করছেন। তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনার সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশিদের নানা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বহু বছর ধরেই বাংলাদেশে অনেক বিদেশি অবৈধভাবে বসবাস করে আসছেন। যেটি প্রথম নজরে আসে ২০১২ সালে। ওই বছর রাজধানীর উত্তরার একটি বাড়িতে মাত্রাতিরিক্ত মাদক সেবন করে হইচই, মারামারি, ভাঙচুর ও অসামাজিক কর্মকান্ড করার দায়ে বিদেশি নারীসহ ১৯ আফ্রিকান পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তাদের বৈধ পাসপোর্ট বা ভিসা বা অন্য কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। তাদের কাছে পাওয়া যায় জাল ইউএস ডলার, জাল ডলার তৈরির সরঞ্জাম, হেরোইন, কোকেন ও অবৈধ পাসপোর্টসহ অপরাধ কর্মকান্ড চালানোর বিভিন্ন আলামত। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়, শুধু তারা নয়, তাদের মতো বহু আফ্রিকান এবং অন্য দেশের নাগরিক নানা ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে এবং এদেশীয় দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছেন। অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের প্রধান কাজই হচ্ছে মাদক ব্যবসা, মাদক পাচার ও জাল ডলার তৈরি করে বাজারজাত করা। গ্রেপ্তারদের তথ্যমতে, পুলিশ রাজধানীর বনানীর ওয়েস্টিন হোটেল থেকে পাঁচ কেজি কোকেনসহ বেতসী নামে এক আফ্রিকান নারীকে গ্রেপ্তার করে। বহু বছর ধরে তিনি বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে কোকেন পাচার করে আসছিলেন। এ ছাড়া রাজধানীর উত্তরায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র জুবায়ের আহমেদকে হত্যার দায়ে আলজেরীয় নাগরিক আবু ওবায়েদ কাদের গ্রেপ্তার হয়। তিনিও ১০ বছর ধরে অবৈধভাবে বসবাস করছিলেন। ধারাবাহিক অভিযানে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেল থেকে অবৈধ বিদেশি হিসেবে লিবিয়ার নাগরিক সামির আহম্মেদ ওমর ফর্ড, আমারা মাহমুদ আমারা ও মাবুর্ক ফর্ড সাইলেম গ্রেপ্তার হয়। তাদের কাছে পাওয়া যায় ৬৮৪টি বাংলাদেশি নকল পাসপোর্ট, ১১ লাখ টাকা, প্রায় ২ লাখ টাকার সমপরিমাণ ইউএস ডলারসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা, বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য ও মাদকদ্রব্য ব্যবহারের সরঞ্জাম।

পুলিশের বিশেষ শাখার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে এই প্রতিবেদককে জানান, বাংলাদেশে থাকা বিদেশি চ্যান্সেলর ও দূতাবাস ছাড়াও বহু দেশের নাগরিক যাতায়াত করেন। অন্তত শতাধিক দেশের নাগরিক নিয়মিত যাতায়াত করেন বাংলাদেশে। বিশেষ করে যে ৪৮টি দেশের দূতাবাস বা চ্যান্সেলর অফিস বাংলাদেশে আছে, সেসব দেশের নাগরিকের যাতায়াত তুলনামূলক অনেক বেশি। এর বাইরেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশে যাতায়াতের বিষয়ে চুক্তি আছে। চুক্তি অনুযায়ী ওইসব দেশের নাগরিকের বাংলাদেশে পৌঁছার পর বিমানবন্দরে ভিসা (পোর্টএন্ট্রি) দেওয়া হয়। বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে সবচেয়ে বেশি যাতায়াত করে মিয়ানমার, ভারত, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের নাগরিক। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে বৈধ বিদেশি নাগরিক সম্পর্কে তথ্য আছে। তবে অবৈধ নাগরিক সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কারণ যখন কোনো নাগরিক ভিসার মেয়াদের অতিরিক্ত সময় থাকবেন, নিয়ম অনুযায়ী তাকে দরখাস্ত করতে হবে। দরখাস্ত করলেই ওই নাগরিক সম্পর্কে জানা সম্ভব। অন্যথায় জানা প্রায় অসম্ভব। গাফিলতিসহ নানা কারণে অবৈধ বিদেশি নাগরিক সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায় না। যারা ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন না, তদন্তে দেখা গেছে তাদের বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি। এজন্য দেশে অবৈধ বিদেশির সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে আফ্রিকানদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যা উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। যেসব আফ্রিকান অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, তারা বাংলাদেশে ঢুকেই পাসপোর্ট গায়েব করে ফেলেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার মো. ফারুক হোসেন বলেন, বাংলাদেশে বসবাসকারী অবৈধ বিদেশি মধ্যে আফ্রিকানদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি। নানা অপরাধের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া বিদেশিদের অধিকাংশই অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করে আসছিলেন। এজন্য অবৈধ অভিবাসীদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। তালিকা অনুযায়ী তাদের গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ইতোপূর্বে যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই জাল ডলার তৈরি, প্রতারণার মাধ্যমে জাল ডলার বিক্রি ও মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। নানা অপরাধে জড়িত বিদেশিদের বিশেষ করে গ্রেপ্তারকৃত আফ্রিকানদের সম্পর্কে তদন্ত করতে গিয়ে নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। কারণ তাদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তাদের পাসপোর্ট বা তাদের বাংলাদেশে প্রবেশের বৈধ কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায় না। ফলে তাদের নাম-ঠিকানা যাচাই করারও নূ্যনতম সুযোগ থাকে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় তাদের দেশে পাঠাতেও নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬৮টি কারাগারে বিদেশি বন্দির সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মিয়ানমারের নাগরিক। এরা বেশিরভাগই অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ ও ইয়াবা ব্যবসার দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। এদের অধিকাংশ কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দি। সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন ভারতীয় নাগরিক। এরা অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ ও বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে এদেশেই আত্মগোপনে থাকার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি রয়েছেন। দেশের বিভিন্ন কারাগারেই রয়েছেন তারা। আর সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন আফ্রিকানরা। এদের অধিকাংশই হেরোইন ও কোকেনের মতো মাদক বেচাকেনা ও পাচার, জাল বিদেশি মুদ্রা তৈরি, প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশি জালমুদ্রা বেচাকেনা ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *