হাবিবুর রহমান, ঢাকা: বাংলাদেশে দুর্ভোগ এড়াতে পরিবার-পরিজনদের নিয়ে অনেকেই আগাম ঈদযাত্রা শুরু করেছেন। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত দুই বছর ধরে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঈদ উদযাপন করতে পারেনি রাজধানীবাসী। এবার করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। কিন্তু তার মধ্যেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়কের পুরানো সেই দুর্ভোগ। এজন্যই যানজট ও ভাঙা সড়কের দুর্ভোগ এড়াতে অনেকই আগেভাগেই বাড়ির পথে রওনা দিয়েছেন। এরই মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। দুর্ভোগ এড়াতে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরাও নগরবাসীকে একই রকম পরামর্শ দিচ্ছেন।
জানা গেছে, আসন্ন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে দেশের বিভিন্ন গ্রাম ও মফস্বলে নিজ নিজ পরিবারের কাছে যায়। সড়ক-নৌ ও রেলপথে মানুষের ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানা গেছে। যান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে মহাসড়কের বিভিন্নস্থানে রাস্তার উপর থেকে দোকান ও হাট-বাজার সরিয়ে নেয়ার নিদের্শ দিয়েছে। এছাড়া মহাসড়কে নসিমন-করিমন চলাচল ও অযান্ত্রিক যানবাহন যেমন রিকশা, ভ্যান, গরুর গাড়ি, টমটম চলাচল বন্ধ করতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয় তদারকির দায়িত্বে থাকছে উচ্চ পর্যায়ের মনিটরিং সেল ও ভিজিলেন্স টিম। মানুষ যেন ভোগান্তিমুক্তভাবে নিজ নিজ বাড়ি যেতে পারে এবং ঈদের পর নির্বিঘ্নে কর্মস্থলে ফিরতে পারে সেজন্য সরকার সবধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন।
গত কয়েকবছর ধরে দেখা যাচ্ছে ঈদের আগে দেশের মহাসড়কগুলো-বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৩০, ৪০ এমনকি ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত যানযট সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ যানজটে মানুষের ভোগান্তি চরমে ওঠে। এছাড়া বাড়তি চাপ থাকায় রেলের সিডিউল বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। এছাড়া নৌ-পথেও অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে হিমশিম অবস্থা তৈরি হয়। এ বিষয়গুলো নিয়ে সরকার এবছর আগাম সতর্কতা অবলম্বন করছে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মেঘনা-গোমতি সেতুতে টোলপ্লাজায় ধীরগতির কারণে অনেক সময় বিশাল যানজট তেরি হয়। গত কয়েক বছর একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে যমুনা সেতুতে এবং সেতুর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত নলকা সেতুতেও। অনেক সময় সেতুতে যানবাহন বিকল হয়ে যাওয়া অথবা দুর্ঘটনার কারণেও যানজট বিশাল আকার ধারণ করে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহাসড়কগুলোর সেতু এলাকায় এবার রেকার এবং ক্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে। যাতে বিকল যানবাহন দ্রুত সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় এবং দুর্ভোগ এড়ানো যায়।
এদিকে পরিবার-পরিজন নিয়ে রাজধানীর শ্যামলীতে বসবাস করেন সাকির আহমেদ। করোনার কারণে গত দুই বছর গ্রামে বসবাস করা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারেননি তিনি। এবছর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় পরিবারের সব সদস্যদের নিয়ে ঈদ উৎসবটা গ্রামেই কাটাতে চান। তিনি বলেন, মহামারির কারণে গত দুই বছর গ্রামে ঈদ করতে পারিনি। এবার করোনা পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক। সে কারণে গ্রামে ঈদ করার মনস্থির করেছি। আমার মতো এমন অনেকেই এই চিন্তা-ভাবনা করেছেন। সে কারণে সড়কে যানজটসহ দুর্ভোগে পড়ার আশঙ্কায় আগেভাগেই পরিবার পরিজনকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছি।
তার মতো একই ভাবনা যাত্রবাড়ির বাসিন্দা রমিজ উদ্দিনের। তবে তার ভয় ঈদে বাড়ি ফেরা নিয়ে বাড়তি দুর্ভোগের কথা ভেবে। এজন্য ঈদযাত্রার চাপ বাড়ার আগেই বাড়ি পৌঁছার প্রস্তুতি তার। এরই মধ্যে পরিবারের একটি অংশ পাঠিয়ে দিয়েছেন বাড়িতে। সাকির আহমেদ ও রমিজ উদ্দিনের মতো এমন অসংখ্য নগরবাসী ঈদযাত্রার চাপ বাড়ার আগেই বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ বছরও ঈদযাত্রায় মহাসড়কে দুর্ভোগ সহ্য করতে হবে। অধিকাংশ সড়কে খানাখন্দ রয়েছে। তাছাড়া প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলমান থাকায় তীব্র যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ সিরাজগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কাঁচপুর সেতু, বঙ্গবন্ধু সেতু ও শিমুলিয়া ফেরিঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ভোগান্তি আরো বাড়তে পারে। যাত্রাপথে দুর্ভোগের দুঃশ্চিন্তায় নগরবাসীর অনেকেই পরিবার-পরিজনকে আগেই বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ঈদযাত্রায় দুর্ভোগ কমাতে উদ্যোগী সরকারও। এ জন্য দফায় দফায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, সড়কে দুর্ভোগ কমাতে সব দিকে নজর রাখা হচ্ছে। সড়কে যেসব প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে সেগুলো শেষ করে ঈদের আগে খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর যেসব প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাবে না সেগুলোর কাজ বন্ধ রাখা হবে।
এবারের ঈদযাত্রায় রাজধানীবাসী যানজটের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সংগঠনটি জানিয়েছে, রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াতের প্রবেশদ্বারগুলোতে বেশি দুর্ভোগ হবে। এরমধ্যে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, বাবুবাজার ব্রিজ, পোস্তগোলা, টঙ্গী রেলস্টেশন, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু, মীরের বাজার, উলুখোলা, কাঞ্চন ব্রিজ, গাবতলী মাজার রোড, মীরের ধৌর, আশুলিয়া, ইপিজেড, চন্দ্রা, রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতু, জিঞ্জিরা, কেরানীগঞ্জ, হাতিরঝিল, মহাখালী, রামপুরা, শেখের জায়গা, আমুলিয়া, ডেমরা, সুলতানা কামাল ব্রিজ, চিটাগাং রোড, কাঁচপুর, মদনপুর, মেঘনা টোল প্লাজা, ভুলতা, গাউছিয়া, বরফা অন্যতম।
অন্যদিকে, বিআরটি’র নির্মাণাধীন প্রকল্পের কারণে উত্তরা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত যাতায়াতে মানুষজনকে অসহনীয় যানজটে পড়তে হবে। এ ছাড়া দেশের ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ, শিমুলিয়া ঘাট, বঙ্গবন্ধু, নলকা ও কাঁচপুর সেতুতে ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, ঈদে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌযানগুলোতে বিশেষ করে লঞ্চে সরকার নির্ধারিত যাত্রীর বেশি না নেওয়া এবং যাত্রীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বেশি না আদায় করার বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঈদযাত্রায় নৌপথে যাত্রীদের নিরাপত্তায় ফিটনেসবিহীন ও পুরাতন লঞ্চ চালানো বন্ধ করতেও সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন এবং পুলিশকেও মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সড়কে দুর্ঘটনা ও ভোগান্তি এড়াতে বুয়েটের অধ্যক্ষ ও দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ড. মোহম্মদ হাদিউজ্জামান নগরবাসীকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, ঈদে গড়ে দৈনিক যাতায়াত করা ৩০ লাখ যাত্রীর মধ্যে বাসে ৮ লাখ, ট্রেনে ১ লাখ, লঞ্চে দেড় লাখ, ব্যক্তিগত গাড়িতে চার লাখ ও বাইক রাইড করে চার লাখ লোক ঢাকা ছাড়বেন। বাকি ১৫ লাখ লোক ঝুঁকি নিয়ে কভার্ড ভ্যান, ট্রেনের ছাদসহ বিভিন্ন উপায়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করবেন। আর স্কুল-কলেজগুলো ২০ রোজার পর বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে পরিবারের কিছু সদস্য আগেই গ্রামের উদ্দেশে যেতে পারে। অফিসের কাজের জন্য যারা ২৭ রোজার আগে যেতে পারবেন না, তারা পরে গেলেও যাতায়াতে ঝুঁকি এবং চাপ কম পড়বে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, বাসের টিকিট যথেষ্ট বিক্রি হচ্ছে। আমরা মনে করছি, গত দুই বছর অনেকেই করোনার কারণে গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে পারেননি। এ বছর পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক। সে কারণে মানুষ গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেকে এরই মধ্যে দুর্ভোগ এড়াতে ঈদের আগেই গ্রামের বাড়িতে পরিবার-পরিজনকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, গাজীপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জসহ অনেক সড়ক-মহাসড়কে উন্নয়ন কাজ চলছে। অনেক স্থানে সড়কের অবস্থা খারাপ। যে কারণে যানজট হতে পারে। এগুলো মাথায় রেখেই ঈদযাত্রা করতে হবে। দুর্ভোগ যাতে কম হয় সে জন্য আমরা ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছি।
নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নৌপথগুলোতে ঈদযাত্রায় ২৪ ঘন্টা লঞ্চ-ফেরি চলাচলের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে কোনো স্পিডবোট রাতে চলাচল করতে পারবে না। এছাড়া ঈদের সময় দুর্ঘটনা রোধে বালুবাহী ট্রলারও রাতে চলবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ঈদে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার লঞ্চের টিকিট কিনতে যাত্রীদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদ দেখানোও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নৌপথের যাত্রীদের নিরাপত্তায় পর্যায়ক্রমে এটি একটি স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর থাকবে বলে উল্লেখ্য করেন তিনি।
রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ঈদে যাত্রীদের ট্রেনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ভোগান্তি এড়াতে সরকার আন্তরিক। তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষে বিশেষ ট্রেন চালুসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় টিকিট কালোবাজারির অভিযোগ থাকায় এবার কাউন্টারে টিকিট কাটার সময় যাত্রীদের এনআইডি বা জন্ম সনদের ফটোকপি দেখাতে হবে। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি ট্রেনে মহিলা ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য একটি করে আলাদা কোচ সংযোজন করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

