তেজপুর (অসম) : আজ সোমবার শোণিতপুরজেলা সদর তেজপুরের শতবর্ষ প্রাচীন বাঙালি নাট্যমন্দির প্রাঙ্গণে নাট্যসমাজের নেতৃবৃন্দ তথা সদস্যদের সঙ্গে সারা আসাম বাঙালি যুব ছাত্র ফেডারেশনের রাজ্য সভাপতি দীপক দে, উপ-সভাপতি বিপ্লব দাস, রাজ্য প্রচার সম্পাদক সঞ্জয় দে, শোণিতপুর জেলা সভাপতি প্রদীপ দে, শোণিতপুর জেলা সম্পাদক অজিত মজুমদার প্রমুখ নেতৃবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে মিলিত হয়েছিলেন। তেজপুর আঞ্চলিক সভাপতি গৌতম মণ্ডল এবং জ্যেষ্ঠ নাগরিক নির্মলেন্দু রায়ের উদ্যোগে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজ্য উপ-সভাপতি বিপ্লব দাস বলেন, এই সময় অসমে বাঙালিদের নানাপ্রকারে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা হচ্ছে। যথার্থ ভারতীয় নাগরিকদের নামের আগে যথেচ্ছভাবে ডি-ভোটার চিহ্ন লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অগোচরে এক তরফা বিচারে ‘ঘোষিত বিদেশি’ বানিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পের নামে বিভিন্ন জেলে ভরে দেওয়া হচ্ছে। জেলের ভেতরে নিতান্ত অবহেলায় নানা রকম জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে একেবারে বিনা চিকিত্সায় ইতিমধ্যে এই জেলবন্দিদের মধ্যে ত্রিশ জন বেঘোরে প্রাণত্যাগ করেছেন। নাগরিক সংশোধনী আইনে পরিণত হলেও এই সব যথার্থ নাগরিক অথচ ‘ঘোষিত বিদেশি’ ব্যক্তিদের দুর্ভাগ্যের কোনও সুরাহা এখনও হয়নি। বাঙালির প্রতি এই অন্যায়ের ব্যাপারে অগপ, কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে কোনও ভেদাভেদ নেই।
তিনি বলেন, অগপ ডি-ভোটার সৃষ্টি করেছে, কংগ্রেস প্রথমে তিনটি ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করেছে এবং বিজেপি পরবর্তীতে আরও তিনটি ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করেছে। রাজ্যে বিজেপি সরকারের শাসনকালেই কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত অবহেলায় আঠাশজন ‘ঘোষিত বিদেশি’ জেলবন্দির মৃত্যু হয়েছে। আইন ব্যবহার করে বাঙালির উপর শাসনযন্ত্রের অত্যাচার এখানেই শেষ নয়। বর্তমানের করোনা পরিস্থিতিতেও নতুন করে নানা জায়গায় বিভিন্ন ব্যক্তিদের ‘বিদেশি নোটিশ’ দিয়ে ট্রাইব্যুনালের সম্মুখীন হতে বলা হচ্ছে। একদিকে অতিমারির সঙ্কট এবং তারই সমান্তরালভাবে বাঙালিদের ট্রাইব্যুনালের এজলাসে এজলাসে ছুটতে বাধ্য করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এনআরসি-তে প্রায় বারো লক্ষ বাঙালির নাম শামিল হয়নি। এই সব এনআরসি-ছুট ব্যক্তিগণ সকলেই যথার্থ ভারতীয় নাগরিক। অথচ, এনআরসি-র বাইরে রেখে এক বছরের অধিক সময় ধরে এঁদের চরম উত্কণ্ঠায় রাখা হয়েছে।
বিপ্লব দাস বলেন, এই পরিস্থিতিতে আবার অসম চুক্তির ছয় নন্বর দফা রূপায়ণের নামে বাঙালিদের নাগরিকসুলভ সাংবিধানিক আধিকার কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিজেপি সরকার তেরো সদস্যের এক বিশাল কমিটি গঠন করেছে যদিও, তাতে কোনও বাঙালি প্রতিনিধি নেই। অথচ, ১৮২৬ সালে ইয়ান্ডাবু সন্ধির মুসাবিদা তৈরির সময় বাঙালি জয়শঙ্কর গুহের সেবা গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। ইতিমধ্যে এই কমিটি খিলঞ্জিয়াদের জন্য যাবতীয় সাংবিধানিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ভূমির অধিকার শতকরা আশি থেকে একশো ভাগ সংরক্ষণের জন্য প্রস্তাব করেছে। এ ব্যাপারে ১৯৫১ সালকে কাট-অব-ইয়ার ধরা হয়েছে। এই প্রস্তাব গৃহীত হলে ১৯৫১ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত যে সব বাঙালি অসমে বসতি স্থাপন করেছেন, তাঁরা যাবতীয় অধিকার হারাবেন। অসমের বাঙালিদের এই জটিল পরিস্থিতি সমূহ বিবেচনা করতে হবে। সকলে মিলে আলোচনা করে ভবিষ্যত কর্মপন্থা স্থির করতে হবে।
এর পর ফেডারেশনের রাজ্য সভাপতি দীপক দে বলেন, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি অসমের বাঙালিদের এক ভয়ানক সঙ্কটের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যে সংসদ ও বিধানসভায় অসমের বাঙালির প্রতিনিধিত্ব একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সংসদের দুই কক্ষ মিলিয়ে অসম থেকে বাঙালি সাংসদ মাত্র একজন, তিনিও শাসকদলের। রাজ্য সরকারে বাঙালি মন্ত্রীও মাত্র একজন। সবেধন নীলমণি সাংসদ এবং মন্ত্রী দুজনেই কাছাড় জেলার প্রতিনিধি। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালির কোনও প্রতিনিধিত্ব নেই। অথচ, শুধুমাত্র বাঙালির ভোটে সাংসদ ও বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার মতো নির্বাচন কেন্দ্র রয়েছে।
তিনি বলেন, অসম চুক্তির ছয় নম্বর দফা লাগু হওয়ার আগেই বাঙালিদের এভাবে রাজনৈতিক ভাবে অপাঙক্তেয় করে রাখা হয়েছে। ছয় নম্বর দফা লাগু হয়ে যাওয়ার পর কী ভয়াবহ অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়। আজকাল সরকারি অফিস ও আদালতে বাঙালি চাকরিজীবীকে অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজতে হয়। এমন-কি এই সময় বেসরকারি ক্ষেত্রেও বাঙালি ছেলেমেয়েদের চাকরি পাওয়া অতি দুষ্কর। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক, দু দিক দিয়েই বাঙালিদের কোণঠাসা করার কার্যক্রম ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এবার শুরু হচ্ছে বাঙালিদের নতুন করে ছিন্নমূল করার চক্রান্ত। এই চক্রান্তকে প্রতিরোধ করতে হলে বাঙালিদের রাজনৈতিক ভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ইতিমধ্যে বহুবার পরীক্ষিত যাবতীয় প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল সমূহের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে এসে বাঙালিদের আশা ভরসার উপযোগী নিজস্ব দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বাঙালির বর্তমান সঙ্কটজনক পরিস্থিতির সংবাদ বিধানসভা ও সংসদে তুলে ধরতে হবে। সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাইতে হবে। এই কাজ একমাত্র বাঙালিদের দ্বারা নির্বাচিত বাঙালি প্রতিনিধিই করতে পারবেন। অন্য কেউ এই কাজ করবে না। আজ পর্যন্ত করেনি। ভবিষ্যতেও করবে না, সেটা একেবারে নিশ্চিত। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য শুধু এমএলএ বা এমপি হওয়ার জন্য দল গঠন নয়, বাঙালির সমস্যা সমাধানের জন্য দল গঠন করে নির্বাচনে জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অন্তত কয়েকটি আসনে জেতার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে।
বক্তব্য শেষ করে অবশেষে দীপক দে তেজপুর নাট্যসমাজের উপস্থিত সদস্যদের সত্পরামর্শ এবং সহযোগিতা প্রার্থনা করেন। প্রত্যুত্তরে নাট্যসমাজের কর্মকর্তা বিশ্বজিত বসু বলেন, বাস্তবিকই বাঙালি এই সময় অসমে একেবারে কোণঠাসা হয়ে আছে। বাঙালির দুঃখ কষ্টের কথা কেউ শুনছে না। বিনা যুক্তিতে এনআরসি-তে লক্ষ লক্ষ লোকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কোনও দলই এ বিষয়ে কিছু করছে না। তাই অবশ্যই আলাদা দল গঠন করতে হবে এবং নির্বাচনে অন্তত কয়েকজনকে জিতে আসতে হবে। নাট্যসমাজের অন্য কর্মকর্তা দিগন্ত চক্রবর্তীও সমস্যাজর্জর বাঙালি জাতির জন্য দীপক দে নেতৃত্বাধীন বাঙালি যুব ছাত্র ফেডারেশনের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ফেডারেশনের কর্ম প্রচেষ্টার সঙ্গে সর্বতোভাবে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।
নাট্যসমাজের সম্পাদক গৌতম মৈত্র এবং অন্য কর্মকর্তা বিশ্বজিত পুরকায়স্থ এই সভার প্রধান আয়োজক ছিলেন। ফেডারেশনের অন্যান্য স্থানীয় সদস্যগণও আজকের সভায় উপস্থিত ছিলেন। বিধান / অমল / এসকেডি

