গত বছরের মার্চ মাস থেকে গোটা বিশ্বে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। গতবছর গোটা দেশজুড়ে বাধ্য হয়ে লকডাউন ঘোষণা করতে হয়েছিল সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য। সেই সময় বারংবার খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে পরিযায়ী শ্রমিকদের পায়ে হেঁটে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ অতিক্রম করা। তারই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া তথা জাতীয় মিডিয়াতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন বিহারের “সাইকেল গার্ল” ওরফে জ্যোতি কুমারী। যারা প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়া দুনিয়ায় বিচরণ করেন তারা অবশ্যই সাইকেল গার্লকে খুব ভালোভাবেই চেনেন।
গত বছর দেশব্যাপী লকডাউনের মধ্যে গুরগাঁও থেকে ১২০০ কিমি রাস্তা সাইকেল চালিয়ে বিহারের দ্বারভাঙায় ফিরেছিল, পিছনের সিটে জখম বাবাকে বসিয়ে! বাবার জন্য এত বড় ঝুঁকি নিয়েছিল ১৫ বছরের মেয়েটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে ধরে রাখতে পারল না। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন তিনি। বাবা ই-রিক্সা চালক মোহন পাসোয়ান দুর্ঘটনায় জখম হয়ে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। গত বছর মার্চে তাঁকে দেখতে গিয়েছিল সে। তার মধ্যেই লকডাউন জারি হয়। যানবাহন বন্ধ। নিরুপায় জ্যোতি বাবাকে পিছনের আসনে বসিয়ে টানা সাতদিন সাইকেল চালিয়ে দ্বারভাঙা ফেরে। পথে দুজনের পেটে কিছু পড়েনি। টাকাপয়সাও তেমন ছিল না। সাইকেলটাও টাকা ধার করে কিনতে হয়। জ্যোতির সাহসী সিদ্ধান্ত, পরিশ্রম তাঁকে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় বাল পুরস্কার এনে দেয়। বিহারের নামী কোচিং প্রতিষ্ঠান সুপার ৩০ র প্রতিষ্ঠাতা আনন্দ কুমার তাঁকে আইআইটি-জেইই পরীক্ষায় বসার ফ্রি কোচিংয়ের অফার দেন। বিহারের লোক জনশক্তি পার্টিও তাঁর পছন্দের যে কোনও শাখায় পড়াশোনার আর্থিক দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। জ্যোতির পরিবারকে ১ লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য দিতে চায় সমাজবাদী পার্টিও। তাকে দিল্লিতে ট্রায়ালে ডাকে সাইকেল ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া। জ্যোতির প্রশংসা করেছিলেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্পও। তবে জ্যোতির বাবা বলেছিলেন, তিনি মেয়েকে নিয়ে গর্বিত। মেয়ের কাছেই তিনি ঋণী, তবে তিনি চান, মেয়ে পড়াশোনাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব,অগ্রাধিকার দিক।
আসলে লকডাউন এর সময় গুরগাঁওতে জ্যোতি এবং তার বাবা যে ভাড়া বাড়িতে থাকতো সেখানে তাদের থাকার সংস্থান বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে বিহারে গ্রামের বাড়িতে ফেরার জন্য কোন ট্রেন বা বাস পায়নি তারা। আর বেশি খরচ করে ফেরার মত তাদের কাছে অর্থসংস্থান ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে জ্যোতি তার অসুস্থ বাবাকে সাইকেলে চড়িয়ে ১২০০ কিলোমিটার পথ মাত্র ৮ দিনে অতিক্রম করে। কিন্তু গত বছরের পর ফের আজ খবরের শিরোনামে আসছেন বিহারের সাইকেল গার্ল। আসলে, জ্যোতির বাবা মোহান পাসোয়ান আজ সকালে হৃদরোগজনিত সমস্যায় মারা গিয়েছেন।
গতবছর জ্যোতির সাহসিকতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিল আপামর দেশবাসী। সেই সাথে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন বড় বড় নেতা, আমলা ও ব্যবসায়ী। এমনকি তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প জ্যোতির সাহসিকতার জন্য প্রশংসা জানায়। এমনকি সাইকেল ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া তাকে ট্রায়ালের সুযোগ দিলেও জ্যোতি তা প্রত্যাখ্যান করে পড়াশোনার জন্য।

