বাংলাদেশ-ফ্রান্স দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে, যখন ফ্রান্স বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ, বাংলাদেশ প্যারিসে তার কূটনৈতিক মিশন চালু করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ফ্রান্স সরকার ও জনগণ তাদের মূল্যবান সমর্থন জানিয়েছিল বাংলাদেশকে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে আন্তর্জাতিক জনমতকে একত্রিত করতে প্রখ্যাত ফরাসি চিন্তাবিদ ও দার্শনিক আন্দ্রে মালরাক্সের নেতৃত্বে ফ্রান্সের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছিলেন।
তারপর থেকে, উভয় দেশ পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সহযোগিতার একটি শক্ত ভীত তৈরী করেছে। ফরাসী রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ এর ১৪ নভেম্বর ফ্রান্সে একটি সরকারী সফর সম্পন্ন করেছেন। অর্থনীতি, বাণিজ্যের পাশাপাশি দু দেশে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনার ক্ষেত্রটিকে কিভাবে আরো প্রসারিত করা যায় তাই নিয়ে আলোচনা হয় উভয় রাষ্ট্রনেতার মধ্যে । উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্বিমুখী বাণিজ্য ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, ফ্রান্স এখন বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম রপ্তানি ক্ষেত্র।
ফ্রান্সে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০% আসে পোশাক থেকে এবং বাংলাদেশে ফরাসি রপ্তানির মধ্যে রয়েছে বিমান ও জাহাজ, নৌ জাহাজের খুচরা যন্ত্রাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায়, বাংলাদেশ এএফডি (এজেন্সি ফ্রান্স ডেভেলপমেন্ট) এর বৃহত্তম সহায়তা গ্রহণকারী। তাছাড়া, ইউরোপীয় দেশগুলো যেমন বৃটেন, স্পেন, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস যখন প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং AUKUS গঠনের পর ফ্রান্স এই বিষয়ে উৎসাহ দেখাচ্ছে, তখন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এই সফরটি লক্ষণীয়। প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের দেশীয় সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলছে। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
ফ্রান্স এবং বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি কৌশলগত নিরাপত্তায় নিজেদের অংশীদারিত্বের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর প্রমাণ করে যে, উভয় দেশ কীভাবে ঐতিহ্যগত সম্পর্ককে প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় রূপান্তরিত করার ওপর জোর দিচ্ছে ।ফ্রান্সে পাঁচ দিনের সফরের প্রথম দিনে এলিসি প্যালেসে উষ্ণ অভ্যর্থনা পাবার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কের বর্তমান গতি আরও এগিয়ে নিতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর সঙ্গে আলোচনায় বসেন।
২০২১ এর ৯ নভেম্বর উভয় নেতাই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পরবর্তী স্তরে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি অভিপ্রায় পত্র (LoI) স্বাক্ষর করেন। এই অভিপ্রায় পত্রে রয়েছে, ক) সক্ষমতা বৃদ্ধি, খ) প্রযুক্তি স্থানান্তর, গ) প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং ঘ) প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা। সেই লক্ষ্যেই উভয় দেশ আলোচনা জোরদার করতে এবং তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া কর্মীদের জ্ঞান আদান-প্রদান ও প্রশিক্ষণে সহযোগিতা জোরদার করতে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ফ্রান্সের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এইভাবে এটি বিমান নিরাপত্তা সহ বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজনে সহায়তা করবে যা বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সহায়ক হবে। বাংলাদেশ যেহেতু দেশীয় প্রতিরক্ষা এবং সামরিক সরঞ্জামগুলিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বিমান চালনা এবং বৈমানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাই প্রতিরক্ষা চুক্তি চিহ্নিতকরণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি সক্ষমতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া, ফ্রান্সের সাথে এমন একটি দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার তাৎপর্য
বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতা, ভূ-কৌশলগত গণনা এবং সামগ্রিক বৈদেশিক নীতির পদক্ষেপের ক্ষেত্রে গভীর গুরুত্ব নির্দেশ করে।
প্রথমত, প্রতিরক্ষা চুক্তি বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক গুরুত্বকে নির্দেশ করে কারণ ফ্রান্সের মতো বৈশ্বিক শক্তি দক্ষিণ এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেয়। এলিসি প্যালেসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা বাংলাদেশের কাছে একটি বড় স্বীকৃতি।
দ্বিতীয়ত, কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে, চুক্তিটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক তাত্পর্য নির্ধারণ করে কারণ বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে অবস্থান করছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তায় উভয় দেশের কৌশলগত স্বার্থের মিল এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং সমৃদ্ধিশীল বাজার এই অঞ্চলকে লাভজনক দিকে নিয়ে গেছে।
তৃতীয়ত, এটা উল্লেখ্য যে ইউরোপসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ওপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বাংলাদেশ যখন “ফোর্সেস গোল-২০৩০”কর্মসূচির মাধ্যমে তার সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিকীকরণে উদ্যোগ নিয়েছে তখন জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং স্পেন উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্র সরবরাহে ক্রমশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ফ্রান্স সফরের সময়, Dassault এর CEO এরিক ট্রাপিয়ার একটি ফরাসি টুইন-ইঞ্জিন মাল্টি-রোল ফাইটার এয়ারক্রাফ্ট বিক্রির বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।
চতুর্থত, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ফ্রান্স-বাংলাদেশ উভয় দেশেরই একটি অভিন্ন উদ্দেশ্য। উভয় দেশ, তাই যৌথভাবে সন্ত্রাস দমন প্রচেষ্টার জন্য তাদের সমর্থন প্রকাশ করেছে এবং তাদের সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে। তালেবানের হাতে কাবুলের পতনের পর যখন দক্ষিণ-এশীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তখন এটি আরও উল্লেখযোগ্য।এই চুক্তিটি সন্ত্রাসবাদের হুমকির মোকাবিলা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদের বিস্তার বন্ধ করার বিষয়ে নীতিগত অবস্থান জোরদার করেছে।
ভূ-রাজনীতির এক নতুন যুগ
অর্থনৈতিক-কূটনীতির প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে, হাসিনার সফরটি প্রতিরক্ষা কূটনীতির ভিত্তি স্থাপন করে বৈদেশিক নীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। এটা প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশ বিশ্ব শৃঙ্খলায় ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের সাথে মধ্যম শক্তি হিসেবে উঠে আসছে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেহেতু প্রতিরক্ষা নীতির অভিমুখীতাকে প্রসারিত করে, তাই, সফরটি প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশকে একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতিও এর দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে।
এখন, বিশ্ব বাংলাদেশকে বিশ্ব রাজনীতি ও কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে যা একসময় পশ্চিমা শক্তির উপহাসের বিষয় ছিল। চতুর্থত, বাংলাদেশ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততাকে সহজতর করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তার নীতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে কারণ ফ্রান্স বাংলাদেশের প্রতি তার উষ্ণ হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সুযোগকে বাংলাদেশের কাজে লাগানো উচিত।
যৌথ বিবৃতিতে ফ্রান্স-বাংলাদেশ উভয় রাষ্ট্রই রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের তহবিল নিশ্চিত করার এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিয়ানমারে তাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ফ্রান্স বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। ষষ্ঠত, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার যোগ্যতা প্রমান করেছে, তাই বিশ্বশক্তিগুলো বাংলাদেশকে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে যুক্ত করার চেষ্টা করছে এবং ফ্রান্সও এর ব্যতিক্রম নয়। সপ্তমত, প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের রপ্তানিকারকদের প্রতি নিজের নীতি পরিবর্তন করেছে যা বাংলাদেশের নীতিগত স্বায়ত্তশাসনকে নির্দেশ করে।
পরিশেষে বলা যায়, এই অঞ্চলে বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে বিশাল শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে, ফ্রান্সের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গভীর তাৎপর্য প্রদান করবে কারণ উভয় দেশের বন্ধুত্ব এই অঞ্চলের অন্যান্য শক্তির কাছে ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেবে। এককথায় বলা যায়, এই সফর ফ্রান্স ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্বকে আরও জোরদার করার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি- ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং স্পেন প্রতিরক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতিকেও কাজে লাগাতে চায় তাই বাংলাদেশও এই চুক্তি থেকে সেই সুযোগটি নিতে পারে।
এই সফর উভয় দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ককে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশে নতুন পথ খুলে দেবে। পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য বিবেচনায় তা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হবে। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফ্রান্স সফরকে কৌশলগত, ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল বৈদেশিক নীতির গতিশীলতার প্রতিফলন বললে ভুল হবে না। Source: moderndiplomacy.eu

