বিশু / সমীপ, ধলাই (অসম): বরাক উপত্যকার একমাত্র মন্ত্রী পরিমল শুক্লবৈদ্যের খাস তালুক ধলাইয়ের মাটিতে দাঁড়িয়ে দুর্নীতিপরায়ণ জনস্বার্থ বিরোধী বিজেপি সরকারকে আসন্ন নির্বাচনে উত্খাতের ডাক দিলেন কংগ্রেস নেতারা। অসমে কংগ্রেসের প্রথম নির্বাচনি সভা তথা রাজ্য সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে গণ-আওয়াজ তুলতে কাছাড়ের ধলাই অঞ্চলকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তার কারণ স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছেন সর্বভারতীয় মহিলা কংগ্রেস সভানেত্রী সুস্মিতা দেব।
তিনি বলেন, গত নির্বাচনের আগে উন্নয়ন ও পরিবর্তনের আওয়াজ তুলে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু বিগত পাঁচ বছরে কেন কোনও উন্নয়ন হয়নি? বিজেপি সরকারের মন্ত্রী পরিমল শুক্লবৈদ্যের কাছে তাঁর জবাব চান সর্বভারতীয় মহিলা কংগ্রেস সভানেত্রী তথা শিলচরের প্রাক্তন সাংসদ সুস্মিতা। তাঁর প্রশ্ন, কোথায় গেল বিজেপির ২৫ লক্ষ চাকরির প্রতিশ্রুতি? ২৪ ঘণ্টার বিদ্যুত্ পরিষেবা? বরাকের উপর পাঁচটি সেতু? কোথায় গেল বরাকের মিনি সচিবালয়? তিনি বিজেপি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির বাস্তবে কোনও মিল না দেখে সরাসরি এই দল পরিচালিত সরকারের সব মন্ত্রীদের কাছে জানতে চান কী কী পরিবর্তন হয়েছে?
সুস্মিতা বিজেপির প্রতি হুংকার ছুঁড়ে বলেন, বিজেপি তো জনগণের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। খাদ্য সুরক্ষা যোজনার সূচনা করে দু বেলা খেয়ে বাঁচার সুযোগ এনে দিয়েছিল কংগ্রেস সরকার। এনআরইজিএস স্কিম চালু করেছিল কংগ্রেস। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এসে শুধুমাত্র বিভাজনের রাজনীতি করছে। হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অসমিয়া, আদিবাসী ও বাঙালিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে সমগ্র রাজ্যে অশান্তির বাতাবরণ তৈরি করেছে বিজেপি। মন্ত্রী পরিমল নিজের বিধানসভা নির্বাচন ক্ষেত্র ধলাইয়ের জনগণের সুরক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছেন। যার জ্বলন্ত উদাহরণ ধলাইয়ের লায়লাপুরে মিজোরামের আগ্রাসন।
মিজো আগ্রাসনের কোনও সুরাহা করতে পারেনি এই সরকার। মন্ত্রী পরিমল শুক্লবৈদ্য নিজের এলাকার জনগণের যেখানে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ, সেখানে গোটা রাজ্যবাসীর সুরক্ষা দেবেন কেমন করে? সুস্মিতা আরও বলেন, পরিমল মন্ত্রী হয়ে নিজের গাড়ির ড্রাইভারকে সুরক্ষা দিতে পারেননি। সেক্ষেত্রে বিধানসভা এলাকার জনগণ পরিমলের উপর ভরসা করবেন কী করে? এই প্রশ্ন তুলে সুস্মিতা বিজেপির ১০০ প্লাসের স্লোগানকে কটাক্ষ করে বলেন, রাজ্যে বিজেপির শাসনকালে পেট্রোল, ডিজেল, আমূল, মসলা প্রভৃতির মূল্য ১০০ প্লাস হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, ক্ষমতা থাকলে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্য কমিয়ে দেখান। তিনি বলেন, ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বিজেপি সরকার আকাশছোঁয়া মূল্য বৃদ্ধি করেছে। তাই আসন্ন নির্বাচনকে কংগ্রেস অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করে বিজেপিকে উত্খাতের ডাক দেন তিনি।
সুস্মিতা বলেন, যদি বিজেপি ফের সরকার গঠন করে, তা-হলে আবার রাজ্যে এনআরসি শুরু করবে। আর এনআরসি শুরু হলে বরাকের গরিব জনগণকে ডিব্রুগড়, গুয়াহাটি, তিনসুকিয়ায় গিয়ে কাগজপত্র আনুষঙ্গিক রেকর্ড ভেরিফিকেশন করাতে হবে। এমনিতেই এনআরসি নিয়ে জনগণের চূড়ান্ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এনআরসির যাঁতাকলে পড়ে ধলাই অঞ্চলে আত্মঘাতী ব্যক্তির খোঁজ নিতে বিজেপির কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। তখন প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী পরিমলরা কোথায় ছিলেন? এনআরসির ভবিষ্যত্ কী তা প্রধানমন্ত্রীও বলতে পারবেন না বলে শোনান সুস্মিতা। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এনআরসির জন্য ১৯৭১ সালের বদলে ১৯৫১ সালকে নির্ধারিত করবে। কিন্তু কাছাড় জেলা প্রশাসন বলেছে ১৯৫১ সালের কোনও রেকর্ড নেই প্রশাসনের হাতে। এভাবে জনগণের দুশ্চিন্তার মাত্রা বাড়বে বিজেপির শাসনে, বলেন সুস্মিতা।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদী সুন্দর কথা বলেন। মোদী বলেছেন ‘না খায়ুঙ্গা না খানে দেয়ুঙ্গা’। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্র। চতুর্দিকে সিন্ডিক্যাটের রাজত্ব কায়েম করে বরাকের মানুষকে লুটেপুটে খাচ্ছেন বিজেপি নেতারা। তিনি প্রসঙ্গক্রমে অবৈধ কয়লা, পুস্ত, বার্মিজ সুপারি, পাথর, বালু প্রভৃতিতে সিন্ডিক্যাটরাজ কায়েম হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেন।
বরাকে বিজেপির দুজন সাংসদ, আটজন বিধায়ক থাকার পরও বরাকের শিক্ষিত যুবক যুবতীরা চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কেন? প্রশ্ন সুস্মিতার। এছাড়া অসম চুক্তির ৬ নম্বর দফা লাগু হলে বাঙালি জনগণের চাকরির অধিকার থাকবে না, ব্যবসায়িক লাইসেন্স দেওয়া হবে না, বাঙালিদের জমি কেনার অধিকার থাকবে না। অসমে বাঙালিদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানোর চক্রান্ত করছে বিজেপি। তাই বিজেপির বিরুদ্ধে হুংকার ছুঁড়ে অসমের জনগণের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে পারে একমাত্র কংগ্রেস বলে দাবি করেছেন প্রাক্তন সাংসদ সুস্মিতা দেব। এবার ধলাই বিধানসভা কেন্দ্র সহ ১০১ প্লাস নিয়ে কংগ্রেস সরকার গঠনের আহ্বান জানান সুস্মিতা।
এদিনের সভায় অসম প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা সাংসদ রিপুন বরা, সাংসদ তথা কংগ্রেসের ক্যাম্পেইন কমিটির চেয়ারম্যান প্রদ্যুত্ বরদলৈ, বিহারের বিধায়ক শাকিল আহমদ, জেলা কংগ্রেস সভাপতি প্রদীপ কুমার দে, কংগ্রেস আমলের তিন প্রাক্তন মন্ত্রী রকিবুল হুসেন, অজিত সিং, গিরিন্দ্র মল্লিক বক্তব্য পেশ করেছেন। সভায় ছিলেন উত্তর করিমগঞ্জের বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, অসম প্রদেশ কংগ্রেসের সম্পাদক তথা কাছাড়ের নির্বাচনি ইনচার্জ রামান্না বরুয়া, প্রদেশ যুব কংগ্রেস সভাপতি কমরুল ইসলাম বড়ভুইয়াঁ, প্রদেশ কংগ্রেস সম্পাদক দাইয়ান হুসেন সহ জেলা কংগ্রেস ও দলের বিভিন্ন শাখা সংগঠনের কর্মকর্তারা। @হিন্দুস্থান সমাচার

