শিরোনাম
বৃহঃ. জানু ২২, ২০২৬

মিয়ানমার সীমান্ত থেকে দূরে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করে কী বার্তা দিচ্ছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির থেকে শুক্রবার আরো প্রায় ১৮শ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেয়া হয়েছে। নোয়াখালীর এই চরে এর আগে দুই দফায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর করা হয়েছে।

প্রায় লাখখানেক শরণার্থীকে পর্যায়ক্রমে এই চরে নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

মাত্র ১ লাখ রোহিঙ্গাকে অন্যত্র নেবার কারণ কী, কী লাভ হবে?

বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরগুলোতে আছেন।

সেখান থেকে মাত্র এক লাখ লোককে সরিয়ে নিয়ে লাভ কী হবে এবং এর উদ্দেশ্য ঠিক কী? এ প্রশ্ন অনেকের মনে উঠছে।

তাছাড়া শরণার্থীদের মিয়ানমারের ফেরত পাঠানো যখন বাংলাদেশের এক নম্বর অগ্রাধিকার, তখন সীমান্ত থেকে দূরে স্থানান্তরের যুক্তি নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন।
লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ এবং উখিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিল ২০১৭ সালে।

এই সংকট যখন শুরু হয়, তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসাবে শহিদুল হক দ্বিপাক্ষিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনাগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি এখনও রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে কাজ করেন।

সাবেক এই পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক বলেছেন, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের উদ্যোগ তাদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।

“আসলে বাংলাদেশ সরকার এদের কোথায় রাখবেন-এটা সরকার এবং বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা। এটা সার্বভৌম অধিকার। “

“কিন্তু আলটিমেটলি এদের সবাইকে ফেরত পাঠানোই তো বাংলাদেশের উদ্দেশ্য, সেখানে এই ধরনের উদ্যোগ ( ভাসানচরে স্থানান্তর ) নানা ধরনের প্রশ্নের অবতারণা করে” বলেন মি: হক।

ভাসানচরে স্থানান্তরের উদ্যোগের কোন প্রভাব রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের চেষ্টায় পড়বে না বলে বাংলাদেশ সরকার মনে করছে।
তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের ফেরত পাঠানোর বিষয়কে এক নম্বর অগ্রাধিকার দিয়ে দ্বিপাক্ষিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথা বলছে।

বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। কিন্তু এখনও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো শুরু করা যায়নি।

ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে ‘নানা প্রশ্নের অবতারণা হতে পারে’

এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, রোহিঙ্গাদের সীমান্তের কাছে শিবির থেকে ভাসানচরে স্থানান্তরের উদ্যোগ মিয়ানমারকে ভিন্ন বার্তা দিতে পারে।

তারা বলছেন, এমন ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করছে – এবং মিয়ানমার এর সুযোগ নিতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে।

এ যুক্তি মানতে রাজি নয় সরকার

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা: এনামুর রহমান বলছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যে ভাল পরিবেশে রাখা হচ্ছে, সেটাই তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরতে চান।

এর কোন নেতিবাচক প্রভাব নেই বলে তারা মনে করেন।

“ভাসানচের নেয়ার কারণ হলো, পর্যটন নগরী কক্সবাজারের ওপর লোড (চাপ) যাতে কমানো যায়। এছাড়াও তাদের একটা ভাল পরিবেশে আবাসস্থল দেয়া।”

কক্সবাজারের টেকনাফ এবং উখিয়ায় এখন ৩৪টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন।

সেখানে মাত্র এক লাখ শরণার্থীকে ভাসানচরে স্থানান্তর করে কি লাভ হবে – এই প্রশ্ন অনেকে তুললেও প্রতিমন্ত্রী ডা: এনামুর রহমানের বক্তব্য হচ্ছে, “এক লাখ শরণার্থীকে সরিয়ে নেয়া হলে শিবিরগুলোর ওপর কিছুটা হলেও চাপ কমবে।”

“কক্সবাজারের জীববৈচিত্রের ওপরও প্রভাব কিছুটা কমবে। সেখানেই লাভ দেখছে সরকার। এখানে ক্ষতির কিছু নেই” – মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড: লাইলুফার ইয়াসমিন বলেছেন, “আমরা বলছি না যে, স্থায়ীভাবে সরানো হয়েছে। শিবিরগুলোর যে অবস্থা, তাতে কিছু লোকতো একটু ভাল অবস্থায় থাকলো।”

“প্রত্যাবাসনের উদ্যোগের সাথে এটিকে মেলানো ঠিক নয়” বলে মনে করেন তিনি।

‘মিয়ানমারের কালক্ষেপণ’

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্বিপাক্ষিক এবং আন্তর্জাতিক নানা দিকে চেষ্টা বা উদ্যোগের কথা বলা হলেও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন শুরু করা যাচ্ছে না।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক বলেছেন, মিয়ানমার কালক্ষেপণ করে চলেছে।

“রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার প্রশ্নে আমি আশাবাদী হতে চাই। কিন্তু আশাবাদী হওয়ার কোন কারণ এ মুহুর্তে দেখছি না।”

“কারণ আমার মনে হয় যে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের ইনটেনশন কখনও পরিস্কার ছিল না। এমনকি আমরা যখন খুবই সিরিয়াস ছিলাম,- তখনও কিন্তু তারা সিরিয়াস ছিল না” বলেন মি: হক।

তিনি আরও বলেছেন, “আমার মনে হয়, তারা শুধু কালক্ষেপণ করছে।”

কিন্তু প্রতিমন্ত্রী ডা: এনামুর রহমান কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-চীন এবং মিয়ানমারের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠককে অগ্রগতি হিসাবে তুলে ধরেন।

“ত্রিপক্ষীয় বৈঠকেও তিন পক্ষই প্রত্যাবাসন শুরু করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।”

তিনি আরও বলেছেন, “বাংলাদেশ প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ শরণার্থীর তালিকা পাঠিয়েছে। মিয়ানমার যাচাই বাছাই করে ৪২ হাজার শরণার্থীকে সম্মতি দিয়েছে যে এই লোকগুলো তাদের। “

“সমস্যা হয়েছে শুধু মিয়ানমার সরকার তাদের নিয়ে একটা নতুন টাউন শিপে রাখবে। আর রোহিঙ্গারা তাদের নিজস্ব এলাকায় যেতে চাচ্ছে। এই একটা জায়গায় এখন আটকে আছে। বিষয়টা নিয়ে আলোচনা চলছে” বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শুক্রবার প্রায় ১৮০০ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেয়া হয়েছে। আরও প্রায় ১৭০০ শরনার্থীকে উখিয়ার শিবির থেকে চট্টগ্রামে এনে রাখা হয়েছে – যাদের শনিবার ভাসানচরে নেয়া হবে। সূত্র: বিবিসি বাংলা

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *