বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়য় কুতুপালং ক্যাম্পের ভেতরে গুলিতে রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লহ নিহত হওয়ার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো সময়ে এসব ক্যাম্পে সহিংসতা ঘটতে পারে বলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনেকে আশঙ্কা করছেন। তারা বলছেন, ২০১৭ সালে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে লাখ লাখ রোহিঙ্গার স্রোত নামার পর গত চার বছরে এরকম আতঙ্কজনক পরিস্থিতি আর কখনো তৈরি হয়নি। এদিকে মুহিবুল্লাহকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মো. সেলিম ওরফে লম্বা সেলিম (২৭) নামে এক যুবককে আটক করেছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। শুক্রবার বেলা ১১টায় উখিয়া ক্যাম্প-৭ এ অভিযান চালিয়ে থাকে আটক করা হয়। মো. সেলিম একই ক্যাম্পের বাসিন্দা। কক্সবাজার-১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক ও পুলিশ সুপার নাঈমুল হক জানান, আটক সেলিমকে উখিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
অপরদিকে মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারে সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করছে পশ্চিমা গোষ্ঠী। একইসঙ্গে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ থেকেও এই হত্যার নিন্দা জানানো হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যায় জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি বিনকেন।
জানা গেছে, হামলার ভয়ে রোহিঙ্গাদের অনেক নেতা আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের টেলিফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি এরকম একজন শরণার্থী বলেছেন, ক্যাম্পগুলোতে লোকজনের মধ্যে চাপা আতঙ্ক। সবার মনে একটা ভয় তৈরি হয়েছে যে এর পর কী হয়। আগেও যে কেউ খুন হয়নি তা নয়। কিন্তু মুহিবুল্লাহর মতো এতো বড়ো মাপের নেতাকে এভাবে হত্যা করার ঘটনা তো আগে কখনো হয়নি। এখন সবাই একটা ভয়ের মধ্যে পড়ে গেছে।
একজন মানবাধিকার কর্মী বলেন, ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং চরমপন্থি সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। যেমন আরসা, আল ইয়াকিন, আরএসও, ইসলামি মাহাত। এর পাশাপাশি সিভিল রাইটস ও মানবাধিকার ইস্যুতেও আন্দোলন করছে কিছু সংগঠন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মুহিবুল্লাহর সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, মুহিবুল্লাহর মতাদর্শের বিরোধীরা তাকে হত্যা করে থাকতে পারে। মুহিবুল্লাহর ভাই হাবিবুল্লাহও এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আরসা নামের একটি সশস্ত্র সংগঠনের সন্ত্রাসীদের দায়ী করেছেন।
এদিকে মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারে সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করছে পশ্চিমা গোষ্ঠী। একইসঙ্গে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ থেকেও এই হত্যার নিন্দা জানানো হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকরা এই ইস্যুতে সরব হয়েছেন। রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। এর মধ্যে রয়েছেন প্রভাবশালী দেশ হিসেবে বিবেচিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কূটনীতিকরাও। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন তারা। বিশেষ করে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসসিআর এ ঘটনার পর ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে মুহিবুল্লাহর সঙ্গে দেশ-বিদেশের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার যোগাযোগ ছিল। রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি তিনি সবার কাছে তুলে ধরতেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলেও মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গা পরিস্থিতি তুলে ধরেছিলেন। তাকে হত্যার পর বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ ঘটনার স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহকে গত বুধবার রাতে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে মুহিবুল্লাহর পরিবার ও তার অনুসারীরা। উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও। এরই ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যায় জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি বিনকেন। গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে মুহিবুল্লাহ হত্যার বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ আহ্বান জানান। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে অ্যান্থনি বিনকেনের ওই বিবৃতিটি প্রচার করা হয়েছে।
অ্যান্থনি বিনকেন বলেন, গত ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহর হত্যার খবর আমাদের গভীরভাবে মর্মাহত ও পর্যুদস্ত করেছে। সারা বিশ্বে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার সুরক্ষায় তিনি ছিলেন এক সাহসী এবং শক্তিশালী প্রচারক। তিনি জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের পাশাপাশি ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের সভায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ধর্মীয়ভাবে নিপীড়িত হওয়া জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জঘন্য ওই অপরাধে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে আমরা তার হত্যার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানাই। আমরা রোহিঙ্গাদের পক্ষে সমর্থন অব্যাহত রেখে এবং রোহিঙ্গারা নিজেদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ হতে পারেন সে জন্য সহায়তার মাধ্যমে তার কাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানাব।
এদিকে বিনকেন তার টুইটে লিখেছেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। সারা বিশ্বে রোহিঙ্গাদের পক্ষে একজন সাহসী নেতা হিসেবে তিনি বেঁচে থাকবেন। এদিকে মুহিবুল্লাহ হত্যার তদন্তের দাবিতে এর আগে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিবৃতি দিয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এরকম কতোগুলো গ্রুপ সক্রিয় তার কোনো হিসেব নেই। তবে পুলিশ, এনজিও কর্মী ও স্থানীয় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা করা যায় যে এধরনের ২০টির মতো গ্রুপ কক্সবাজারে সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এসব গ্রুপ ‘অপহরণ’ বাহিনী” নামে পরিচিত। টেকনাফ ও উখিয়ার ৩৪টি ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় লোকজনকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করাই তাদের কাজ। ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য এসব গ্রুপের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে থাকে। তাদের মধ্যে গোলাগুলিতে কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে এসব গ্রুপের নেতাদের নামেই বাহিনীগুলোর পরিচয় গড়ে উঠেছে। যেমন: রকি বাহিনী, শুক্কুর বাহিনী, আব্দুল হাকিম বাহিনী, সাদ্দাম গ্রুপ, জাকির বাহিনী, মুন্না গ্রুপ, নবী হোসেন বাহিনী ইত্যাদি। এসব বাহিনীর কয়েকশ’ করে সদস্য, স্থানীয় লোকজনের কাছে যারা ডাকাত হিসেবে পরিচিত।

