হত্যাকাণ্ড কখনই কাম্য নয়। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ফলে রাষ্ট্রের ইমেজ ক্ষুন্ন হয়। মানবতার কলঙ্ক হয়। সম্প্রতি একজন চৌকস অব. সেনা কর্মকর্তার নির্মমভাবে হত্যার ফলে গোটা জাতি আজ স্তম্ভিত। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার যেন অন্ত নেই। যিনি কিছু দিন আগেই ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বলয়ের দায়িত্বে। তার মেধা আর যোগ্যতায় অল্প বয়সেই পদোন্নতি পেয়ে তিনি মেজর পদ অলঙ্কিত করেন। সেই মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের কথাই বলছি। কিন্তু বিপথগামি ও দুর্নীতি পরায়ন দুই পুলিশ কর্মকর্তার পিস্তলের গুলির আঘাতে সেই মেধাবী মুখ সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের দেহটি লটিয়ে পড়ে মাটিতে। এই পরিকল্পিত ও নিষ্টুর হত্যাযজ্ঞের খবর দেশের গন্ডি পেরিয়ে তাবৎ দুনিয়ায় নিন্দার ঝড় উঠে। এ ব্যাপারে শুরু হয়েছে তদন্ত। অজানা এক রহস্যের দানা যেন সব কিছুকে কালো আধারে ডেকে রেখেছে। প্রশ্ন উঠেছে এর নেপথ্যের নায়কদের মুখোশ কি আদৌ উন্মোচিত হবে? ঘুরে ফিরে এমন হাজারো প্রশ্নের জবাব কে দেবে? এ ব্যাপারে সব মহল এখন জেগে উঠেছে। দু:খজন হলেও সত্য সিনহার সহযোগীদের আচরণও এখন সেই জালে বন্দি। এই জট খুলে প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হোক এটাই চায় সব মহল।
মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের হত্যাকান্ড নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হন আমাদের প্রতিনিধি। জানতে চেষ্টা করেছেন কি ভাবছে ঢাবি শিক্ষার্থীরা এই হত্যাকান্ড নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান মাজেদ জানাচ্ছেন বিস্তারিত।
ঈদের আগের রাতে (৩১ জুলাই) কক্সবাজারের টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ এলাকার বাহারছড়া চেকপোস্টে তল্লাশির সময় পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পরিদর্শক লিয়াকত আলী, ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ নয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যায় গ্রেফতারকৃত আসামিদের কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাকাউনটিং ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী শায়লা ইসলাম এই হত্যাকান্ড সম্পর্কে বলেন, “আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের বলায় হয়তো এখন আর কারো কিছু আসে যায় না। তবে যা হয়েছে ব্যাপারটা অবশ্যই নেগেটিভ কিছু। যা এখনো ঘোলাটে।
আমাদের দেশের এই আমলাতান্ত্রিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার আর কিছু কিছু জায়গায় সাম্প্রদায়িকতা দেশের বারোটা বাজাচ্ছে। এসব নতুন কিছু না। মেজর সিনহা হত্যার মত কিংবা আরো গুরুতর কিছু এর আগেও ঘটেছে। বাট কার কি আসছে বা গেছে। দিন দিন এগুলো কমন ইস্যু হয়ে যাচ্ছে। এই হত্যার সুষ্টু বিচার হোক। সেটাই কাম্য”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর এক শিক্ষার্থী আমিমুল এহসান হামি বলেন, “এখানে অনেক রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে বলে আমি মনে করি। আবার শুধুমাত্র ওসি প্রদীপ এর যে অত্যাচার চলছিলো তার একটা অধ্যায় ও হতে পারে। বিস্তর তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে”
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শাররিন আহমেদ নামের আর এক শিক্ষার্থী জানান, “ইংরেজীতে একটা প্রবাদ আছে “Everything is fair in love and war”. মেজর সিনহার হত্যাকাণ্ড ফেয়ার কিছু না হলেও কিন্তু এ দেশের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রত্যেকটা হত্যাকাণ্ড /গুম ফেয়ার করে নিয়েছে নিজেদের স্বার্থ সম্পন্ন করার জন্য। হয়তো মেজর সিনহা রাশেদ এসব সরকারি কর্মকর্তাদের অনৈতিক কোন তথ্য পেয়েছে তার জন্যই অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের সাথে এটাও পরিষ্কার যে আমরা রাঘব বোয়াল কিংবা চুনোপুঁটি যা কিছুই হই না কেন যে কোন সময় অকারণে প্রাণ দিতে হতে পারে। হয়তো দেশকে ভালোবেসে নয়তো কিছু কর্তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য।
পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাত খন্দকার জানান, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে প্রয়োজনের তূলনায় বেশি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তেমন কোন নজরদারি নাই, ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার করতেছে। যদি এক কথায় বলি, বিচারবহির্ভূত হত্যার বৈধতার ফলাফল এগুলা।”
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী এনামুল হক বলেন, “কক্সবাজার-টেকনাফের পথ ধরে মাদক আমদানি রুখতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কেউ বিনা বিচারে হত্যার শিকার হবে এটা বিচার বিভাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ক্রসফায়ার সহজ ভাষায় বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। মেজর সিনহাকে হত্যা করার পর মাদকের সাথে জড়িয়ে হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যা এখনও তদন্তাধীন। সেল্ফ ডিফেন্স করতে গিয়ে হত্যা অপরাধ হবে না। কিন্তু এখানে সেল্ফ ডিফেন্স কে অপব্যবহার করা হচ্ছে।
যেমনটা মেজর সিনহার ক্ষেত্রে করা হয়েছে। মেজর সিনহার হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ওসি প্রদীপ এরকম আরো অসংখ্য ক্রসফায়ারের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেগুলোতে কি ন্যায় বিচার নিশ্চিত হয়েছে? রক্ষক যখন ভক্ষক হয় তখন মেজর সিনহার মতো মেধাবীদের হারাতে হয়। তাই এই ধরনের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হোক। এই হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ শিকার মেজর সিনহার মাধ্যমে এর সমাপ্ত হোক। মেজর সিনহাকে একজন রুপক ধরলে এই ধরনের সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিয়াদ নামের আর এক শিক্ষার্থী বলেন, “মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার বাংলাদেশ এর প্রেক্ষাপট এ দ্রুত বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি। তা না হলে দেশ এর বিচার ব্যবস্থা আর ও নাজুক হতে থাকবে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে এরকম ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘটবে।
যদি প্রাক্তন একজন এসএসএফ এর সদস্যের সুষ্ঠু বিচার না হয় তাহলে দেশের সাধারণ জনগণ আইন এবং পুলিশ এর প্রতি আশা হারিয়ে ফেলবে।”ক্যাম্পাসলাইভ

