শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে রাজপথে বেপরোয়া পুলিশ। রাষ্ট্রীয় খরচে কেনা বুলেট দিয়ে রাজপথে মানুষকে গুলি করছে ফ্যাসিবাদের সহায়ক লাঠিয়াল এই বাহিনী। পুলিশের গুলিতে নারায়নগঞ্জে দুইজন শাহাদাত বরণ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (১ সেপ্টেম্বর) বিএনপির ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রায় নারায়ণগঞ্জ, নেত্রকোণা, সিরাজগঞ্জ ও মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা উপজেলায় হামলা চালিয়েছে পুলিশ। যদিও শেখ হাসিনা গত কয়েক সপ্তাহ আগে ঘোষণা করেছেন রাজপথে কেউ প্রতিবাদ জানাতে চাইলে কোন বাঁধা দেওয়া হবে না। বিষয়টি পুলিশসহ অন্যান্যদের জানিয়ে দিয়েছেন বলেও ঘোষণা করেছিলেন ফ্যাসিবাদি এই নারী শাসক। এর আগেও বিএনপি’র আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়ে চা’র দাওয়াত দিয়ে ভোলায় দুইজনকে হত্যা করেছিল শেখ হাসিনার এই লাঠিয়াল বাহিনী। রাষ্ট্রীয় খরচে গড়ে তোলা এই বাহিনী এখন ব্যবহৃত হচ্ছে জনগণের বিরুদ্ধে। জনগনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখাই যেন পুলিশের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ শহরে বিএনপির ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রায় হামলা ও গুলি চালিয়েছে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জের শহরের ২নং রেলগেট এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর বেপরোয়া গুলি চালালে শাওন মাহমুদ ওরফে আকাশ (২০) নামে যুবদলের একজন কর্মী ও তোলারাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক ফারুক খান গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নাজমুল হোসেন জানান, শাওন মাহমুদকে হাসপাতালে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে। তাঁর শরীরে গুলির চিহ্ন আছে। লাশ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিএনপি শোভাযাত্রা বের করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশের বাধা অতিক্রম করে শোভাযাত্রা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাইলে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। এক পর্যায়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার লাঠিয়াল বাহিনী মুহুর্মুহু গুলি, টিয়ার গ্যাস শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে পুরো এলাকায় ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি করে।
পুলিশের গুলি ও টিয়ার শেল এর জবাবে বিএনপির নেতাকর্মীরা ইট-পাটকেল দিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ আরো বেপরোয়া হয়ে হামলা অব্যাহত রাখলে বিএনপির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।
ঘটনাস্থলের পাশে থাকা মরগ্যান বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজে দশম শ্রেণির পরীক্ষা চলছিল। এ সময় পুলিশের ছোড়া টিয়ারশেল ওই কক্ষে গিয়ে পড়ে। এতে প্রচণ্ড ধোঁয়ার শ্বাসকষ্টজনিত সদস্যায় ৫ ছাত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জে জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সমাবেশ শেষে হামলা চালায় পুলিশ। সিরাজগঞ্জেও বিএনপি কর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশ বিএনপি কর্মীদের লক্ষ্য কওে ব্যাপক টিয়ার গ্যাস শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। হামলায় বিএনপির কমপক্ষে ১৫ জন কর্মী আহত হয়েছে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, আমাদের দলের ৪৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে দলীয় কার্যালয়ে নেতা কর্মীদের নিয়ে কেক কাটার পর আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এক বক্তা যখনই “এই সরকারের গুম খুন ও মানবতা বিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে সবাইকে এক যোগে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে” এমন কথা বলেন, ঠিক সেই সময় পুলিশ আমাদের উপর লাঠিচার্জ শুরু করে। পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করতে থাকে। পরে আমরা দলীয় কার্যালয় থেকে সরে এসে শহরের ধানবান্ধী এলাকায় অবস্থান নেই। পুলিশ সেখানেও আমাদের উপর চড়াও হয়। এতে আমাদের প্রায় ১০/১২ জন নেতা কর্মী আহত হয়েছে।
মানিকগঞ্জ: মানিকগঞ্জে হামলা চালিয়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান পণ্ড করে দিয়েছে পুলিশ। পুলিশ হামলা প্রতিরোধ করতে গেলে দুই পক্ষে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এক পর্যায়ে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে ও লাঠিচার্জ করে।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে জেলা শহরের খালপাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের লাঠিপেটায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের অন্তত ২৫ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বেলা ১১টার দিকে শহরের দলীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে জেলা বিএনপি। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বেলা পৌনে ১১টার দিকে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা শহরের উত্তর সেওতা এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে দলীয় কার্যালয়ে দিকে যাচ্ছিলেন। পথে খালপাড় এলাকায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতা-কর্মীরা বাগবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ নেতা–কর্মীদের লাঠিপেটা করে। এতে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা–কর্মী আহত হন।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এস এ জিন্নাহ কবীর বলেন, আমাদের গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে পুলিশ অগণতান্ত্রিক আচরণ করছে। পুলিশের লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের শেলে দলের ২৫ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর। এ ছাড়া পাঁচ নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই।
সদর থানার ওসি বলেন, আহত দুই কনস্টেবলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনিও আহত হয়েছেন। আটকের বিষয়সহ বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
নেত্রকোনা: নেত্রকোনায়ও বিএনপির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান পণ্ড করতে হামলা চালিয়েছে পুলিশ। ফলে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিএনপির অন্তত ৩৫ জন কর্মী আহত হবার খবর পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে শহরের ছোটবাজার এলাকায় বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সকাল ১০টার দিকে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে দলীয় কার্যালয়ে আসছিলেন। এ সময় শহরের প্রধান সড়কে সহস্রাধিক নেতা-কর্মী জড়ো হন। কর্মসূচি পণ্ড করতে পুলিশ তাদেরকে সেখান থেকে সরে যেতে বলেন। এক পর্যায়ে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা করলে বিএনপির নেতা-কর্মীরা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ছুড়লে অনেকে আহত হন। আহতদের মধ্যে জেলা যুবদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক সুজন চৌধুরী, নেত্রকোনা সরকারি কলেজ শাখার ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান, পৌর ছাত্রদলের সহসভাপতি বাপ্পী, প্রান্ত পাঠান, যুবদল নেতা ফারুক আবদুল খালেকসহ বিএনপির ২০ নেতা-কর্মী। আহত ব্যক্তিদের নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে।
নেত্রকোনা জেলা বিএনপির যুগ্ম–আহ্বায়ক এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ এসে লাঠিপেটা করে আমাদের ওপর হামলা চালায়। পরে রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এতে আমাদের ২০ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।

