শিরোনাম
বুধ. মার্চ ১৮, ২০২৬

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: মিয়ানমারের উদ্যোগের উদ্দেশ্য বুঝতে চায় বাংলাদেশ

রাহীদ এজাজ, ঢাকা: রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চার বছর পেরোলেও নিজেদের এই সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। দেশটি গত মাসে প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছে। বছরখানেকের বিরতি দিয়ে দেশটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের স্বীকৃতির জন্য হঠাৎ এ উদ্যোগ নিয়েছে কি না, বুঝতে চাইছে বাংলাদেশ। কারণ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) চলমান শুনানিতে মিয়ানমারের প্রতিনিধি চীনের উদ্যোগে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগে অগ্রগতি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন।

গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে মিয়ানমারে ক্ষমতায় বসেন সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং। সামরিক সরকারের ক্ষমতা দখলের এক বছর পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেশটির নতুন কর্তৃপক্ষকে স্বীকৃতি দেয়নি; বরং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশ ও জোট মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার কলেবর বাড়াচ্ছে। সামরিক সরকারের ক্ষমতা দখলের এক বছর পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের নতুন কর্তৃপক্ষকে স্বীকৃতি দেয়নি।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে আইসিজেতে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। এর আগের মাসে প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই নিয়ে মিয়ানমার বৈঠকে বসেছে। প্রত্যাবাসন বিষয়ে চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় যে উদ্যোগ রয়েছে, সেখানে গত বছরের জানুয়ারির পর তিন দেশ আর একসঙ্গে আলোচনায় বসেনি। তবে চীন আলাদাভাবে দুই দেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এ নিয়ে কথা বলছে।

আইসিজেতে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানিতে গত সোমবার মিয়ানমার প্রতিনিধিদলের নেতা কো কো হ্লাইং বলেন, চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি হচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের (আইডিপি/ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড পিপল) শিবির থেকে সরিয়ে আদিনিবাসে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রকল্পে কাজ এগিয়ে চলছে।

মিয়ানমারের প্রতিনিধি অনেকটা অপ্রাসঙ্গিকভাবে আদালতে প্রত্যাবাসনের প্রসঙ্গটি টানেন। তা ছাড়া তিনি প্রত্যাবাসনে অগ্রগতির দাবি করলেও বাস্তবে ২০২১ সালের ১৯ জানুয়ারির পর উচ্চপর্যায়ের কোনো বৈঠক হয়নি।

আইসিজেতে মিয়ানমারের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, আইডিপি সরানোর বিষয়টি মিয়ানমারের নিজস্ব ব্যাপার। তবে বাংলাদেশ সব সময় বলে আসছে, আইডিপি থেকে রোহিঙ্গাদের আদিনিবাসে ফেরত পাঠানো হলে এ দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারাও ফিরতে উৎসাহিত হবে। এখন আইসিজের শুনানি মাথায় রেখে এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ তারা নিচ্ছে কি না, সেটা দেখার আছে। সেই সঙ্গে এসব পদক্ষেপ সত্যিকার অর্থেই তারা বাস্তবায়ন করতে চায় নাকি অন্য উদ্দেশ্যে, সেটা দেখতে হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নৃশংসভাবে রাখাইন থেকে বিতাড়নের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের ওপর বিরক্ত। ফলে প্রত্যাবাসনের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে তারা অতীতের প্রক্রিয়া সংশোধন করছে, এমন একটি বার্তা দিয়ে নিজেদের পাপমোচনের একটা চেষ্টা মিয়ানমার করতে পারে।

আইসিজের শুনানিতে মিয়ানমার ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের কথা বলেছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার প্রত্যাবাসন চুক্তির অনুসরণে চীন প্রত্যাবাসনে দুই দেশকে সহযোগিতা করতে চায়। গত বছরের জানুয়ারির পর থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রিপক্ষীয় কোনো বৈঠক হয়নি। চীন দুই দেশের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত আছে। এখন দুই পক্ষের সঙ্গে চীনের এই যুক্ত থাকার বিষয়টিকে মিয়ানমার হয়তো ত্রিপক্ষীয় বলতে চাইছে। তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের সামরিক সরকারের এখন পর্যন্ত কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। মিয়ানমার মনে করেছে, তারা প্রত্যাবাসনের জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছে—এটা দেখাতে পারলে অনেকে বিষয়টিকে হয়তো ভালোভাবে নেবে।

পররাষ্ট্রসচিব জানান, বাংলাদেশ শুরু থেকে সব সময় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনই এ সমস্যার একমাত্র সমাধান বলে মনে করে। তা ছাড়া রোহিঙ্গারা যেহেতু মিয়ানমারের নাগরিক, সমাধানটা হতে হবে সেখানেই।
চার–সাড়ে চার বছরে দুই দফা তারিখ দিয়েও প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি; এরপরও কি বাংলাদেশ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আশাবাদী কি না জানতে চাইলে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, প্রত্যাবাসনে যুক্ত পক্ষগুলো একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করতে চায়। শুরুতে সংখ্যাটা ৮০০ থেকে ১ হাজার হতে পারে। নিরাপত্তা, সুরক্ষা, জীবিকাসহ রোহিঙ্গাদের সব কটি বিষয় নিশ্চিত করে যাতে ভালোভাবে শুরু করা যায়, সেটিও জরুরি। আবার এক দফায় পাঠানো হলো, এরপর আর কাউকে পাঠানো গেল না; এটি যাতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, রাখাইনে অনুকূল পরিস্থিতি না হলে গায়ের জোরে রোহিঙ্গাদের পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই। তাদের পাঠানো ঠিকও হবে না। এখানে চীন চাইলেও কিছু করার নেই।

প্রত্যাবাসন বিষয়ে চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় যে উদ্যোগ রয়েছে, সেখানে গত বছরের জানুয়ারির পর তিন দেশ আর একসঙ্গে আলোচনায় বসেনি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয়ভাবে একবার এবং চীনের মধ্যস্থতায় একবার ত্রিপক্ষীয়ভাবে তারিখ চূড়ান্ত করেও রোহিঙ্গাদের রাখাইনে পাঠানোর কাজটি শুরু করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, রাখাইনে ২০১৭ সালের আগস্টে যে পরিবেশ রোহিঙ্গারা দেখে এসেছে, পরিস্থিতি তার চেয়ে খারাপ হয়েছে। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। উপরন্তু রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছিল, সেটির মেয়াদ দুই বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। ইউএনএইচসিআর বারবার তাগিদ দিলেও মিয়ানমার এখন পর্যন্ত ওই এমওইউ নবায়ন করেনি। ফলে আদৌ প্রত্যাবাসন শুরু করা যাবে কি না, কিংবা এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন কতটা বাস্তবসম্মত, সেটি বড় প্রশ্ন।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *