শিরোনাম
শনি. জানু ৩, ২০২৬

রোহিঙ্গা সমস্যায় কী করবে বাংলাদেশ

।। মো. তৌহিদ হোসেন ।।

আজ ২৫ আগস্ট মঙ্গলবার মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত রোহিঙ্গা গণহত্যা শুরুর তিন বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০১৭ সালের ২৫ ও ২৬ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও পুলিশ নিরস্ত্র বেসামরিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নিষ্ঠুর এ নির্যাতন–নিপীড়ন শুরু করে। মিয়ানমার সরকার আরোপিত বিবিধ নিষেধাজ্ঞা এবং অসহযোগিতার কারণে চরম নির্যাতিতের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন। তবে বিভিন্ন জরিপ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, এ গণহত্যায় মিয়ানমারের সেনা, পুলিশ ও স্থানীয় বৌদ্ধ চরমপন্থীদের হাতে অন্তত ২৪ হাজার অসামরিক রোহিঙ্গা নিহত হয় এবং ১৮ হাজার রোহিঙ্গা নারী বা বালিকা ধর্ষণের শিকার হয়। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের মুখে প্রাণ বাঁচাতে আট লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এ গণহত্যা শুরুর আগেই পর্যায়ক্রমে তিন লক্ষাধিক নির্যাতিত রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছিল বাংলাদেশে। সাকল্যে ১১ লাখ বাস্তুহারা রোহিঙ্গা কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত শরণার্থী শিবিরগুলোতে এবং তার আশপাশে গাদাগাদি করে অবস্থান করছে। উচ্চ জন্মহারের কারণে এ সংখ্যা এখন ১২ লাখ পেরিয়ে গেছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী দাবি করে আসছে যে ২৫ আগস্ট ২০১৭ তারিখে পুলিশ ও সামরিক চৌকিতে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) নামের একটি সশস্ত্র সংগঠনের আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতেই উত্তর রাখাইনের এই ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালানো হয়েছিল, আর তাতে ভয় পেয়ে অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তবে তাদের এ দাবি ধোপে টেকে না। সুস্পষ্ট তথ্য আছে যে অপারেশনের অন্তত তিন সপ্তাহ আগে থেকে সেনাবাহিনীর এই ইউনিটগুলোকে উত্তর মিয়ানমারে জড়ো করা হয়। সেনাবাহিনী কি তাহলে জানত যে ঠিক এই দিনে আরসা তাদের আক্রমণ চালাবে?

এ ঘটনার আগে–পরে কখনোই এই কথিত সংগঠনের এ রকম কোনো কার্যকলাপের নজির পাওয়া যায় না। তাই যাঁরা মনে করেন যে সংগঠনটি আসলে অস্তিত্বহীন এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের কৃত অপরাধের পক্ষে অজুহাত সৃষ্টির জন্য এই তথাকথিত আক্রমণের নাটক সাজিয়েছিল, তাদের বক্তব্যকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মিয়ানমারের মুষ্টিমেয় অন্ধ সমর্থক ছাড়া সবার কাছেই এটি স্পষ্ট যে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের উদ্দেশ্যেই সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর এ হত্যাযজ্ঞ এবং নির্যাতন চালিয়েছিল।

রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান নিরাপত্তা এবং অধিকারসহ তাদের নিজ বাসভূমে ফিরে যেতে দেওয়া—এ বিষয়ে দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর বক্তৃতায় এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু গত তিন বছরে আলাপ–আলোচনা, চুক্তি সই, তালিকা বিনিময় ইত্যাদির ফলে এ ক্ষেত্রে সামান্যতমও কোনো অগ্রগতি হয়নি।

গত বছরে দুটো ইতিবাচক কাজ হয়েছে এ ক্ষেত্রে, তা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধে জড়িত মিয়ানমারের ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার মামলা। তবে আইনি প্রক্রিয়া একটি দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এমনকি মিয়ানমার যদি গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ও, সঙ্গে সঙ্গে বিতাড়িত রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফেরত যেতে পারবে, বিষয়টি তেমন সরল নয়। এ সংকট সমাধানে বাংলাদেশ তাহলে কী করতে পারে?

যদিও কোনো ফল দেবে না, তারপরও আমাদের দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়াটি চালু রাখতে হবে, যাতে বাংলাদেশ সহযোগিতা করছে না—এ মিথ্যা অভিযোগের সপক্ষে মিয়ানমার কোনো রসদ না পায়। কোভিড মহামারিতে থমকে যাওয়া দ্বিপক্ষীয় আলোচনা আবার কীভাবে শুরু করা যায়, তা ভেবে দেখা যেতে পারে। একটি বিষয় এড়িয়ে যেতে হবে অবশ্যই, সেটা হচ্ছে দু–পাঁচ শ পরিবারের টোকেন প্রত্যাবর্তন।

প্রথমত, যাদের ফেরতের তালিকায় রাখা হবে তারা স্বেচ্ছায় যেতে চাইবে না। কারণ, তারা জানে সেখানে তাদের জন্য কোনো নিরাপদ পুনর্বাসন অপেক্ষা করছে না। দ্বিতীয়ত, এটা শুধু মিয়ানমারকে একটা প্রচার সুবিধা দেবে, প্রকৃত সমস্যার কোনো সমাধান দেবে না। মূল বিষয় হবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি, যাতে সব শরণার্থী নিরাপত্তার সঙ্গে ফেরত যেতে পারে। সে দেশের সরকার বা সেনাবাহিনীর তা করার ইচ্ছা আছে, এমন কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

কূটনৈতিক পর্যায়ে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে মহামারি এবং মহামারি–উত্তর অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত পৃথিবী যেন রোহিঙ্গাদের ভুলে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। সামনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন আছে। প্রধানমন্ত্রীর (বা বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল প্রধানের) বক্তব্যে তো বটেই, উদ্ভূত প্রতিটি সুযোগেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের দুরবস্থা এবং তাদের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের প্রতিকারের বিষয়টিকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে।

ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের সাম্প্রতিক সফরকালে আমাদের পররাষ্ট্রসচিব বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে তুলতে অনুরোধ করেছেন এবং ভারতের পররাষ্ট্রসচিব তা করার আশ্বাস দিয়েছেন। ভারত আগামী দুই বছরের জন্য পরিষদের অস্থায়ী সদস্য। চীন ও রাশিয়ার অবস্থানের কারণে নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে না, তা আমরা জানি। তবে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বানসংবলিত একটি প্রস্তাব যদি পাস করানো যায়, সেটাও ছোটখাটো সাফল্য বলে বিবেচিত হতে পারে।

পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে পশ্চিমের দেশগুলোকে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করার। আর সেই সঙ্গে চেষ্টা করতে হবে চীন ও রাশিয়ার অবস্থানকে নমনীয় করার, নিদেনপক্ষে তারা যেন মিয়ানমারের প্রতি তাদের নিরঙ্কুশ সমর্থনের পরিবর্তে সমস্যা সমাধানে খানিকটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

২০১৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ত্বরান্বিত করতে রাখাইন রাজ্যে তাদের জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চল (সেফ জোন) সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক ‘এথনিক ক্লিঞ্জিং’ সংঘটনের আগে উত্তর রাখাইনের মংডু জেলা এবং সিতউয়ে জেলার রাথিডং মহকুমায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের সূত্র ধরে এ স্থানগুলোকে নিয়ে একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিস্তারিত প্রস্তাব বাংলাদেশ উত্থাপন করতে পারে এবং এ প্রস্তাবের সপক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে পারে।

মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যেহেতু তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, তাই আসিয়ান দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল মাঠে থাকতে পারে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। মিয়ানমার ও তার সমর্থকেরা অবশ্যই এ প্রস্তাবে রাজি হবে না, তারপরও বিষয়টিকে টেবিলে দৃশ্যমান রাখলে কৌশলগত সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

উল্লিখিত কোনো উদ্যোগই সাততাড়াতাড়ি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নিয়ে আসবে না। সংকট হবে দীর্ঘস্থায়ী এবং যতই দিন যাবে, গণহত্যাকারী মিয়ানমার সেনাবাহিনী মাঠপর্যায়ে বাস্তবতাকে ততই পরিবর্তন করতে থাকবে। বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গাদের জন্য তাই তথ্য–উপাত্ত সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করবে। পালিয়ে আসা প্রতিটি মানুষ যা কিছু দেখেছে, যা কিছু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ ভিডিও, অডিও এবং লিখিত মাধ্যমে রেকর্ড ও সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতিটি মানুষের বিতাড়ন–পূর্ব বাসস্থানের ঠিকানা, বিবরণ সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করতে হবে। সেই সঙ্গে ওই সব স্থানের অপারেশনের আগেকার এবং পরের উপগ্রহভিত্তিক ছবিসহ রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা গ্রামগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে সেখানে অন্যান্য স্থাপনা গড়ে তুলছে, যাতে একসময় মাঠপর্যায়ে এই জায়গাগুলোকে খুঁজে পাওয়া না যায়।

তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহে সরকার নিজে ছাড়াও দেশি–বিদেশি এনজিও এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাহায্য নিতে পারে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০১৮ সালের তথ্যমতে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী অন্তত ৫৫টি রোহিঙ্গা গ্রাম সম্পূর্ণ মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, এরূপ কোনো কোনো স্থানে সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগে শিল্পকারখানা স্থাপনের কথাও শোনা যাচ্ছে। সঠিক তথ্য থাকলে জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণের মাধ্যমে খালি করা স্থানে শিল্প স্থাপনে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করা সম্ভব হতে পারে।

সবশেষে সমস্যা সমাধানে দীর্ঘসূত্রতায় আশাহত হলে চলবে না। আমাদের মেনে নিতে হবে যে এ সংকট নিরসনে ১০, ১৫ বা ২০ বছর লেগে যেতে পারে আর সে জন্য মানসিক এবং বাস্তব প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের দেখতে হবে যে শরণার্থীরা যেন একটা সহনীয় জীবন যাপন করতে পারে, সেই সঙ্গে এই এলাকার স্থানীয় মানুষের সমস্যা সমাধানে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে তাদের মধ্যে ইতিমধ্যে সৃষ্ট অসন্তোষ ও বিরূপ মনোভাব নিরসন করা যায়।

বাংলাদেশ এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে তা করতে হলে অপর পক্ষকেও তাই চাইতে হবে এবং সে চাওয়াটা আমাদের হাতে নয়। যেকোনো পরিস্থিতির জন্য আমাদের প্রস্তুতি থাকতে হবে এবং আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে।

লেখক: মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *